কণ্ঠশিল্পী ফাতিমা তুয যাহরা ঐশী। সংগীতজগতে এক দশক পার করে ইতিমধ্যেই নিজের স্বকীয় অবস্থান তৈরি করেছেন। ‘মায়া : দ্য লস্ট মাদার’ চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়ে জয় করেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও। সম্প্রতি তার কণ্ঠে ‘নোয়াখাইল্লা মাইয়া’ গানটি শ্রোতামহলে দারুণ সাড়া ফেলেছে। নতুন গান, ক্যারিয়ার এবং সমসাময়িক নানা প্রসঙ্গে কথা হয় ঐশীর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তারেক আনন্দ
‘নোয়াখাইল্লা মাইয়া’ গানটির পেছনের মূল অনুপ্রেরণা কী ছিল? হঠাৎ নোয়াখালীর আঞ্চলিক আবহ নিয়ে গান করার কথা কেন ভাবলেন? অনুপ্রেরণাটা অনেক জায়গা থেকে এসেছে। আমরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গান নিয়মিতই শুনি। চট্টগ্রামের গান, সিলেটের গান কিংবা ভাওয়াইয়া। তখন মনে হলো, আমি নিজে নোয়াখালীর মেয়ে, অথচ আমাদের অঞ্চলের ভাষা নিয়ে তেমন কাজ হচ্ছে না। কেন আমরা নোয়াখালীর ভাষা নিয়ে কিছু করছি না? তা ছাড়া আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশেও দেখা যায়, তারা তাদের আঞ্চলিক ভাষাগুলোকে একদম বর্তমান সময়ের উপযোগী করে দারুণভাবে রিপ্রেজেন্ট করছে। মূলত নিজের অঞ্চলের ভাষাকে আধুনিক আবহে তুলে ধরার তাড়না ও ইচ্ছা থেকেই গানটির ভাবনা মাথায় আসে। গানটির কথা ও সুরের এমন কী বৈশিষ্ট্য ছিল, যা শোনার পর আপনার মনে হয়েছে এটি শ্রোতাদের ভালো লাগবেই? আমি যেহেতু নিজে নোয়াখালীর মেয়ে, তাই ‘নোয়াখাইল্লা মাইয়া’ ভাবনাটি থেকে প্রথমে গানটি লেখা এবং পরে সুর করা হয়। যখন আমরা পুরো গানটিকে মিউজিকের সঙ্গে বসিয়ে একটা চূড়ান্ত কাঠামো তৈরি করলাম, তখন দেখলাম আমরা নিজেরা স্টুডিওতেই দারুণ ‘ভাইব’ করছি। পুরো প্রক্রিয়াটি আমরা ভীষণ উপভোগ করেছি। গানটি শুনলেই ভেতর থেকে স্বতঃস্ফূর্ত একটা দোলা লাগে। ঠিক তখনই মনে হয়েছিল, এটি শ্রোতাদেরও একইভাবে ছুঁয়ে যাবে এবং তাদের ভালো লাগবেই। বাংলাদেশের একেক অঞ্চলের শ্রোতাদের গান নিয়ে এক ধরনের আবেগ থাকে। গানটি প্রকাশের পর কেমন সাড়া পাচ্ছেন? আমার নিজ জেলার মানুষের কাছ থেকে তো অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছিই। তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, শুধু নোয়াখালী নয়, আশপাশের জেলা কিংবা পুরো দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা যেসব মানুষ এই ভাষাটি একেবারেই বোঝেন না, তাদের কাছ থেকেও দারুণ রেসপন্স আসছে। অনেকেই বলছেন, গানটির মিউজিক ভিডিও আন্তর্জাতিক মানের হয়েছে। এই ভালোবাসা ও সাড়াটুকু আমাকে আগামীতে এ ধরনের আরও কাজ করার জন্য ভীষণ মোটিভেট করছে। গান, চিকিৎসকের ক্যারিয়ার আর ব্যক্তিগত জীবন একসঙ্গে ‘তিন সংসার’ সামলাচ্ছেন কীভাবে? (হাসি) হ্যাঁ, গানের সংসার, ডাক্তারের সংসার আর নিজের আসল সংসার সব মিলিয়ে আমার তিন সংসার ভালোই চলছে। আসলে আমি প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভীষণ উপভোগ করি। আর এই উপভোগ করা ও ভালোবাসার জায়গা থেকেই প্রতিদিনের ব্যস্ততাকে সুন্দরভাবে ব্যালেন্স করার চেষ্টা করি। কোনো কিছুই যেন ব্যাহত না হয়, সেই মেইনটেইনটা করা এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। শিগগির আর কোনো নতুন গানের পরিকল্পনা আছে? নতুন গান দেওয়ার ইচ্ছা তো অবশ্যই আছে। তবে আমি একটু সময় নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসি। যেমন এই গানটির পেছনেও বেশ খানিকটা সময় ও শ্রম দিয়েছি, তারপর রিলিজ করেছি। সময় নিয়ে কাজ করলে সেটির মান ভালো হয়। একটু ভাবছি, শ্রোতাদের জন্য নতুন ও ভালো কিছু উপহার দেওয়ার চেষ্টা সবসময়ই থাকবে। কনসার্টে ঐশী মানেই আগুন পারফরম্যান্স! স্টেজ মাতানোর এই শক্তি পান কোথা থেকে? কনসার্টে আমি আগুন নাকি পানি, সেটা আসলে জানি না! তবে আমি যখন স্টেজে উঠি, তখন মনে করি ওই মুহূর্তে ওই জায়গাটার রাজা আমি নিজেই। আমি আমার পুরো পরিবেশনা মন থেকে উপভোগ করি। আর আমার সামনে যে গানপাগল মানুষগুলো থাকে, ওরাও যখন আমার সঙ্গে মেতে ওঠে, তখন অন্যরকম এক শক্তি তৈরি হয়। এবারের ঈদে বেশ কয়েকটি জায়গায় ট্যুর করেছি, কনসার্ট করেছি। শ্রোতাদের দারুণ রেসপন্স পেয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ।
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়ার পর চলচ্চিত্রের গানে আপনাকে একটু কম পাওয়া যাচ্ছে। প্লেব্যাকে কি কিছুটা উপেক্ষিত মনে হয় নিজেকে? জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়ার পর আমি মনে করি আমার দায়িত্বটা আরও অনেক বেড়ে গেছে। এখন আমার অনেক বুঝেশুনে কাজ করা উচিত। সেই জায়গা থেকে আমি একটু বেছে কাজ করার চেষ্টা করি। আর গানে তো জোয়ার-ভাটা থাকেই, কখনো কম হবে, কখনো বেশি। সংগীতে আলহামদুলিল্লাহ ১১ বছর পার করলাম। এ সময়ে প্রায় ৪২টিরও বেশি সিনেমার গানে কণ্ঠ দিয়েছি। তাহলে এখন চলচ্চিত্রে কাজ কম হওয়ার মূল কারণটি কী? এখন চলচ্চিত্রে কাজ কিছুটা কম, এটা সত্যি। এর পেছনে আসলে অনেক কারণ চলে আসে, আমি কোনো নেতিবাচক কিছু বলতে চাই না। ইতিবাচকভাবে যদি বলি, কখনো কাজ কম থাকবে, কখনো বেশি। এটা আসলে কোনো বড় ইস্যু না। দিন শেষে সংখ্যা নয়, একটা ভালো কাজ উপহার দিতে পারাটাই হচ্ছে আসল চ্যালেঞ্জ। আর সেই ভালো কাজের মাধ্যমে শ্রোতাদের মনে সার্থকভাবে জায়গা করে নেওয়ার মাঝেই একজন শিল্পীর আসল আনন্দ।