বাজেটের আকার নয় সমস্যা বাস্তবায়নে

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বছরজুড়ে ব্যয়ের এ আকারকে সমস্যা হিসেবে দেখছেন না অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। তবে বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তারা। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘বাজেট এমন হওয়া প্রয়োজন, যা একদিকে অর্থনীতির বর্তমান চাপ মোকাবিলা করবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে।’

বাজেটের আকার ও বাস্তবায়ন নিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, ‘মনে হয় না, বাজেট খুব বড়। সমস্যা আকারে নয়, বরং সমস্যা হচ্ছে এর বাস্তবায়নের সক্ষমতায়। সম্পদ বা রাজস্ব আহরণের সক্ষমতায়। কারণ ব্যয়ের বিপরীতে আয় কম হলে সরকার চাপে থাকবে এবং আয় বৃদ্ধি না হলে ঋণের ঝুঁকি বাড়বে। ফলে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে কর আহরণ বাড়াতে হবে। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা খুব গুরুত্বপূর্ণ।’

বাজেটে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও ব্যাংক খাতের দুর্বলতার মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি অপচয় ও দুর্নীতি কমানোর কার্যকর উদ্যোগ থাকা জরুরি। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতির এই বিশ্লেষক।

ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা প্রসঙ্গে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাজেটে আমরা আর্থিক খাতের সংস্কারের কিছুটা ইঙ্গিত পাচ্ছি। কিন্তু পুরোটাই নির্ভর করবে বাজেট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপর। যেমন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা। আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’ ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলার বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাত মন্দ ঋণে তলিয়ে আছে। খেলাপি ঋণ যেন নতুন করে সৃষ্টি না হয়,  তার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ বিগত সময়ে ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দেখেছি, যা অনাকাক্সিক্ষত এবং এটা ব্যাংকগুলোকে দুর্বল করে দিয়েছে, মূলত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে এগুলো বেড়েছে, এটা যাতে আর না হয়, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।

দেশীয় শিল্প সুরক্ষা ও বিনিয়োগ উৎসাহ প্রসঙ্গে সিপিডির এই সম্মাননীয় ফেলো বলেন, বাজেটে সরকার স্থানীয় শিল্প সুরক্ষায় বেশকিছু সুবিধার কথা ঘোষণা করেছে। এটি ভালো উদ্যোগ। উদ্যোক্তাদের জন্য সরকার কর-সুবিধা, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, হয়রানি হ্রাস, সিঙ্গেল উইন্ডো সেবা ও আধুনিক লজিস্টিকস ব্যবস্থার মতো উদ্যোগ বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে পারে। যতটুকু বোঝা যাচ্ছে, সরকার নতুন অর্থবছরে নানা খাতে ছাড় দিয়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধির চেষ্টা করবে। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্য সহায়ক শুল্ক নীতির সঠিক বাস্তবায়নটাও জরুরি।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের পুঞ্জীভূত অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ আছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো বিনিয়োগ স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। মূল্যস্ফীতির কারণে গত কয়েক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অস্থিরতা। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের কারণে জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে এবং দেশে সাধারণ মানুষ যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে আছে, তখনই জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হয়েছে।’ তার মতে, এখন বিএনপি সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, তারা যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, সেগুলোর সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশার সংযোগ স্থাপন করা।