দাম কমবে

আপডেট : ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৩৬ এএম

নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, মোবাইল ফোন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফ্রিজ-এসিসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যে শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে। ফলে এসব খাতের পণ্য ও সেবার দাম কমতে পারে বলে জানা গেছে। পাশপাশি কিছু উচ্চাভিলাষী পণ্যের দাম বাড়ানোর জন্যও করহার বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। গতকাল জাতীয় সংসদে এই বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কর ও শুল্ক কাঠামো এমনভাবে সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, চিকিৎসা সামগ্রী, প্রযুক্তিপণ্য ও পরিবেশবান্ধব পণ্য ও সেবা খাতে খরচ কমে। কারণ সরকারের উদ্দেশ্য হলো মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো এবং বিনিয়োগে উৎসাহিত করা। ব্যাপক ছাড়ের মধ্যে আবার এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে।

স্কিন কেয়ার ও বিউটি পণ্যের দাম কমবে : স্থানীয় স্কিন কেয়ার ও  বিউটি প্রোডাক্টস উৎপাদনকারীদের উৎসাহ প্রদানের জন্য এই শিল্পের দুটি কাঁচামাল আমদানিতে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কাঁচামাল দুটিতে বিদ্যমান ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক কমিয়ে ১০ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। এতে করে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত স্কিন কেয়ার ও বিউটি পণ্যের দাম কমতে পারে।

দাম কমবে মোবাইল এসি ফ্রিজের : মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন, সিসিটিভি ক্যামেরা ও কম্পিউটার উৎপাদনে কর অব্যাহতি সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। আমদানিনির্ভর এসব প্রযুক্তি পণ্য যাতে ভোক্তারা সাশ্রয়ী মূল্যে কিনতে পারেন সেজন্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদনকারীদের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক ও কর অব্যাহতির সুবিধা ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

জনগণকে স্বস্তি দিতে স্বাস্থ্য সরঞ্জামে করছাড় : স্বাস্থ্য খাতে করছাড়ের অংশ হিসেবে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর মওকুফ করা হচ্ছে। এতে করে ডায়ালাইসিসের রোগীরা সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। শারিরিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহারের জন্য আমদানি করা ১৫টি পণ্যের অগ্রিম আয়করের হার ২ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নামিয়ে আনা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য খাতে একাধিক করছাড়ের প্রস্তাবে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমতে পারে। কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে অগ্রিম কর প্রত্যাহার করা হলে প্রতিটি ডায়ালাইসিসে প্রায় ৬০০ টাকা পর্যন্ত খরচ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি ওষুধ উৎপাদনের ৬৮টি কাঁচামালে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার, ক্যানসারের ওষুধের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালে কর রেয়াত এবং হার্টের রিং ও চোখের লেন্সের ওপর ১০ শতাংশ ভ্যাট তুলে দেওয়ার প্রস্তাব চিকিৎসাসেবাকে আরও সাশ্রয়ী করতে পারে। এছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহৃত ১৫টি পণ্যের অগ্রিম আয়করও ২ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ করা হচ্ছে।

জুয়েলারি খাতে ছাড় : বাজেটে বড় ছাড় দেওয়া হচ্ছে জুয়েলারি খাতে। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, উৎসে করের উচ্চহারের কারণে স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের সরবরাহ এখনো অনানুষ্ঠানিক পর্যায়ে রয়েছে। যে কারণে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। এখান থেকে রাজস্ব বাড়ানোর জন্য স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার সরবরাহে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে জুয়েলারি সেবার বিপরীতে ৫ শতাংশ ভ্যাটের পরিবর্তে প্রতি ভরি হিসাবে ২,৫০০ টাকা সুনির্দিষ্ট ভ্যাট নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়। বর্তমানে স্বর্ণের দাম বেশি হওয়ার ফলে এই সিদ্ধান্ত দাম কমাতে ভূমিকা রাখবে। ফলে কম খরচে জুয়েলারি পণ্য কিনতে পারবেন ভোক্তারা। 

ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক আমদানিতে ছাড় : পরিবেশবান্ধব যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক এবং চার্জিং স্টেশন আমদানিতে করছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ইলেকট্রিক বাস, ট্রাক, চার্জিং স্টেশন, ই-বাইক, ব্যাটারি এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ উৎপাদনেও ব্যাপক কর রেয়াত দেওয়া হচ্ছে। ইলেকট্রিক উৎপাদন ও ব্যবহারকে উৎসাহিত করতেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

এছাড়া বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) আমদানির ক্ষেত্রে সার্বিক শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাব রয়েছে বাজেটে। বর্তমানে ইভির ক্ষেত্রে কর ভার প্রায় ৯৩ শতাংশ। নতুন প্রস্তাবে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দামের ইভিতে ৬৪ শতাংশ এবং ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত দামের ইভির ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ শুল্ক-কর হারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।  বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন ও ফিটনেস নবায়নের সময় অগ্রিম কর কেটে রাখা হয়। সেটিও কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে ইভি ও এর যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের লক্ষ্যে শুল্ক করে রেয়াতি সুবিধা প্রদান করে একটি প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করা হয়েছে। একইভাবে ই-বাইক উৎপাদনকারী ও সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে পার্টস ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনে নিয়োজিত ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানকে উপকরণ আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কম্পিউটার প্রিন্টার, পোর্টেবল অটোমেটিক ডাটা প্রসেসিং মেশিন, ফ্ল্যাশ মেমোরি এবং কম্পিউটার মনিটর আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর কমিয়ে ২ শতাংশ নামানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

মোবাইল ফোনের কাঁচামাল আমদানিতে ছাড় : মোবাইল ফোনের কাঁচামাল আমদানিতে সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। তার প্রস্তাবনায় স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ২২টি কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম করের হার ৫ ও ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে।

কম্পিউটার ও টেলিযোগাযোগ খাতে স্বস্তি : প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতেও বড় ধরনের স্বস্তি আসতে পারে। স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনের ২২টি কাঁচামালের ওপর অগ্রিম কর কমিয়ে ১ শতাংশ করা হচ্ছে। মোবাইল সিমে ৩০০ টাকার নির্দিষ্ট ভ্যাট বাতিল করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের ফলে নতুন সিমের দাম কমতে পারে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) রেভিনিউ শেয়ার ও লাইসেন্স ফির ওপর ২০ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহার এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবায় উৎসে কর ১২ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামানো হলে টেলিকম খাতের ব্যয় কমবে।

এছাড়া কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্ল্যাশ মেমোরি, মনিটরসহ বিভিন্ন ডিজিটাল পণ্যের আমদানিতে অগ্রিম কর কমানো হচ্ছে।

শিশুখাদ্য ও খেজুর আমদানিতে ছাড় : শিশুখাদ্য প্রস্তুতের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব এসেছে। এছাড়া সব ধরনের মসলা ও খেজুর আমদানির ওপর থাকা ৫ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি প্রত্যাহার করা হলে এসব পণ্যের দামও কমতে পারে। যা ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।

এছাড়া শিল্প খাতেও বড় ধরনের কর রেয়াত দেওয়া হচ্ছে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কের স্তরও কমিয়ে আনা হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং শিল্পপণ্যের মূল্যও কিছুটা কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

কৃষিপণ্যসহ ৬০ পণ্যে কমছে উৎসে কর : প্রস্তাবিত বাজেটে সবচেয়ে বড় স্বস্তি আসতে পারে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে। ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, মাছ, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগিসহ প্রায় ৬০টি কৃষি ও ভোগ্যপণ্যের ওপর উৎসে কর কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব পণ্যের ওপর বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কও প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। ফলে বাজারে এসব পণ্যের সরবরাহ ব্যয় কমে দাম কিছুটা সহনীয় হতে পারে।

এছাড়া কৃষি খাতের কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনের ৬০টি কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট প্রত্যাহার করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

দাম কমবে দেশে উৎপাদিত ভোজ্য তেলের : ভোজ্য তেল খাতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি ছাড়া দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। দেশীয় তৈলবীজ ব্যবহার করে ভোজ্য তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে আগামী ১০ বছর করমুক্ত সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হতে পারে। তবে প্রথম ৫ বছর ভোজ্য তেল উৎপাদন ব্যবসার ওপর পুরোপুরি করমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী তিন বছরে ৫০ শতাংশ এবং শেষ দুই বছরে ২৫ শতাংশ কর অব্যাহতির কথা বলা হয়েছে। এর ফলে সরিষার তেলসহ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভোজ্য তেলের বাজার সম্প্রসারিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

পোলট্রি ফিডের দাম কমতে পারে : পোলট্রি, ডেইরি ও মংস্য খাদ্য উৎপাদনকারী শিল্পের প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতে তিনটি নতুন কাঁচামালের ওপর শূন্য শতাংশ হারে রেয়াতি সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে করে ফিডের দাম কমবে। এছাড়া এ খাতের যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতেও রেয়াতি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ¦ালানির উৎপাদন খরচ কমবে : সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনকে। উৎসাহ দিতে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য শতাংশ করহার এবং ২০৩১ সাল পর্যন্ত যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর অব্যাহতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, সৌরবিদ্যুৎ বিলের ওপর ব্যবহারকারীদেরও ছাড় দেওয়া হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ বিল পরিশোধের বিপরীতে ৫ শতাংশ কর রেয়াত সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেও কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার ওপর উৎসে কর ৪ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশে নামানো হচ্ছে। রিফাইনারি পর্যায়ে জ্বালানি তেল সরবরাহে উৎসে কর ১ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে কমানো হবে। এতে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় কমে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত