বাজেট প্রতিক্রিয়া

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অবাস্তব পরিকল্পনা

নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর গতকাল অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন, যা আগামী ৩০ জুন পাস হবে। সরকার ব্যয় মেটাতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এতে বাজেটে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি থাকবে, যা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ঋণগ্রহণের মাধ্যমে মেটানো হবে।

সরকারের বাজেট প্রস্তাব ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটি মস্তবড় বাজেট ঘোষণা করলেই হবে না, এর বাস্তবায়নকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে যত পরিকল্পনাই করা হোক, ব্যর্থ হতে হবে। বিশেষ করে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্য তা অবাস্তব পরিকল্পনা। পাশাপাশি ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক নির্ভরতা মূল্যস্ফীতি ও সুদ হারকে উৎসাহিত করবে। বিদেশি ঋণের যে আশা করা হচ্ছে, সেখান থেকে ৮০ বা ৯০ হাজার কোটি টাকাও যদি পাওয়া যায়, তাহলে বলতে হবে সরকার ভালো করেছে।

অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তব্যে বলেছেন, ‘ঋণ ব্যবস্থাপনা সংস্কার, উচ্চ রিটার্ন সমৃদ্ধ খাতে সরকারি বিনিয়োগ এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কাঠামো আধুনিকায়ন করছি। এর মাধ্যমে বিনিয়োগের গুণগত মান নিশ্চিত হবে, অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধি পাবে এবং এর মাল্টিপ্লায়ার প্রভাবে অর্থনৈতিক কর্মকা- অধিকতর গতিশীল হবে।’

ড. জাহিদ হোসেনের মতে, সাধারণত সরকার গতানুগতিক অগ্রাধিকারের খাত নির্ধারণ করে থাকে। নতুন সরকার অবশ্য কিছু পরিবর্তন আনার কথা বলছে। যদি তেমন কিছু হয় তবে ভালো। তবে বাজেটের যে আকার তাতে মনে হচ্ছে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সক্ষমতার অভাব রয়েছে। বিশাল বাজেট দেশের বর্তমান সংকটময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বিশাল বাজেট যে বার্তা দিচ্ছে, সেটি হলো সরকার নির্বাচনে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা খাত, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নের কথা বলেছে। যেহেতু এটা তাদের প্রথম বাজেট, সে জন্য বড় আকারের বাজেট নির্ধারণ করে প্রতিশ্রুতি পালনের দিকে হাঁটা শুরু করেছে। প্রশ্নটা হলো এত বড় আকার বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য হবে কি না? এটার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন, সেই অর্থ পাওয়া যাবে কি না? আর সেটা যদি না করতে পারে, তাহলে প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন বাজেটে থাকলেও বাস্তবে কিন্তু দেখা যাবে না।’

বর্তমানে দেশের অন্যতম সমস্যা হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব আহরণ। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতির এ বিশ্লেষক বলেছেন, দেশের মানুষ গত চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতির চাপে ভুগছে। উচ্চ সুদের হার চালু রেখে কিছুটা মূল্যস্ফীতি কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তা খুব একটা কাজে লাগেনি। আবারও মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে দুশ্চিন্তা তৈরি করছে। অন্যদিকে আসন্ন বাজেটে সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে, এনবিআর ও নন-এনবিআরের মাধ্যমে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা। দেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত কখনো সাড়ে চার লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয়নি। তাই এক বছরের মধ্যে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অসম্ভব।