যুদ্ধের প্রভাব: বিশ্বকাপ নিয়ে চরম দোটানায় ইরানি-আমেরিকান ভক্তরা

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই গ্যালারি জুড়ে রঙের মেলা আর বাঁধভাঙা উল্লাস। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাসকারী ইরানি-আমেরিকান প্রবাসীদের জন্য এবারের বিশ্বকাপ একেবারেই ভিন্ন এক প্রেক্ষাপট নিয়ে হাজির হয়েছে। আগামী সপ্তাহে যখন ইরানের জাতীয় ফুটবল দল ‘টিম মেল্লি’ মাঠে নামবে, তখন গ্যালারিতে বসে প্রিয় দেশের জন্য গলা ফাটানোর সুযোগ পাবেন প্রবাসীরা। কিন্তু মাঠের সেই চেনা আনন্দকে এবার গ্রাস করেছে যুদ্ধের কালো মেঘ।

ইরানের সঙ্গে চলমান আমেরিকা ও ইসরায়েলের যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রবাসী ইরানিদের এক চরম মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একদিকে বিশ্বমঞ্চে নিজের দেশের খেলার আনন্দ, অন্যদিকে তেহরান সরকারের দমনপীড়ন নীতি এবং ওয়াশিংটনের বোমাবর্ষণ—সব মিলিয়ে আবেগ আর বিবেকের দ্বন্দ্বে ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলাচ্ছে তাদের মানসিকতা। নিজেদের জাতিগত ঐতিহ্য রক্ষা নাকি বর্তমান শাসকদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ—কোনটিকে বেছে নেবেন, তা নিয়ে রীতিমতো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে এই প্রবাসী সমাজ।

লস অ্যাঞ্জেলেসের শহরতলি উডল্যান্ড হিলসের এক শৌখিন ফুটবল ক্লাবের খেলোয়াড় ও ব্যবসায়ী এহসান শাফি রয়টার্সকে বলেন, "বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন সব ফুটবলারেরই থাকে। বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, নিজের দেশের খেলা মাঠে বসে দেখার জন্য আমরা অত্যন্ত উন্মুখ হয়ে আছি। তবে বর্তমান পরিস্থিতি সত্যিই বড় জটিল। নিজের মাতৃভূমির ওপর এভাবে বোমাবর্ষণ হচ্ছে—এটা দেখা যেকোনো মানুষের জন্যই ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক।"

যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে বিপুলসংখ্যক ইরানি প্রবাসীর বসবাস, যা স্থানীয়ভাবে ‘তেহরান অ্যাঞ্জেলেস’ নামেও পরিচিত। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিপীড়নের মুখে দেশ ছেড়ে আসা এই মানুষগুলোর কাছে জাতীয় ফুটবল দল ছিল নাড়ির টানের মতো। এবারের বিশ্বকাপে ইরান তাদের গ্রুপ পর্বের প্রথম দুটি ম্যাচ খেলবে এই লস অ্যাঞ্জেলেসেই—১৫ জুন নিউজিল্যান্ড এবং ২১ জুন বেলজিয়ামের বিপক্ষে। এরপর ২৬ জুন সিয়াটলে তারা মুখোমুখি হবে মিশরের।

তবে এই ম্যাচ নিয়ে শাফির মতো সবাই কিন্তু উচ্ছ্বসিত নন। তাঁরই এক সতীর্থ, ৫৯ বছর বয়সী রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী শন রেজাই নিয়েছেন সম্পূর্ণ বিপরীত এক সিদ্ধান্ত। জার্মানি, ব্রাজিল, রাশিয়া ও কাতারের বিশ্বকাপ গ্যালারিতে গিয়ে খেলা দেখা এই অন্ধ ফুটবল ভক্ত এবার স্টেডিয়াম থেকে দূরে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। রেজাই বলেন, "আমি ফুটবলের একনিষ্ঠ ভক্ত। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এবার আমি বিশ্বকাপ বয়কট করছি। এই দল এখন আর সাধারণ ইরানি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছে না, বরং তারা বর্তমান সরকারের প্রচারণার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।"

নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন প্রবাসী ভক্ত জানান, আমেরিকার মাটিতে বসে তেহরান সরকারের সমালোচনা করলে দেশে থাকা তাদের আত্মীয়-স্বজনরা বিপদে পড়তে পারেন। আবার মার্কিন নীতি নিয়ে মুখ খুললেও প্রবাসে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হবে। তাছাড়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের ম্যাচগুলো যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের মূল কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে বলেও তরুণ ভক্তদের মনে বড় ধরনের শঙ্কা রয়েছে।

ভক্তদের এই মনস্তাত্ত্বিক চাপ যে ফুটবলারদেরও ছুঁয়ে যায়, তার প্রমাণ মিলেছিল ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে। সেবার নিজেদের প্রথম ম্যাচে ইরানের খেলোয়াড়রা জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় নীরব থেকে দেশে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রতি এক অভূতপূর্ব মৌন সমর্থন জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে গোল উদযাপনেও ছিল তাদের চেনা উদাসীনতা। যার কারণে দেশে ফিরে খেলোয়াড় ও তাদের পরিবারকে তীব্র জবাবদিহিতার মুখে পড়তে হয়েছিল বলে গুঞ্জন রয়েছে।

খেলা দেখতে টিকিট কাটা এক প্রবাসী ভক্তের কথায় যেন পুরো সম্প্রদায়ের নীরব অসহায়ত্বই ফুটে উঠল, আমি নিজে যখন দেশে থাকা আমার পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে জনসমক্ষে মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছি, তখন মাঠের ওই তরুণ খেলোয়াড়রা কী করল বা না করল—তা নিয়ে সমালোচনা করার অধিকার আমার কোথায়?"

সব মিলিয়ে, মাঠের ফুটবলীয় লড়াই শুরুর আগেই গ্যালারির আবেগ, প্রতিবাদ আর কান্নার কানাকানিতে এক অন্যরকম উত্তেজনার কেন্দ্রে রূপ নিয়েছে লস অ্যাঞ্জেলেস।