বৃষ্টি থেমেছে একটু আগে। তবে বাতাস এখনো বইছে শোঁ শোঁ, যেন শয়ে শয়ে বুনো গাছ ফিসফিসিয়ে কথা কইছে। একটা ভেজা ভেজা নরম সুবাস চারধারে। বৃষ্টি আসবার আগেই ঝড়ের হাওয়া এসে জানিয়েছিল সবাইকে, ‘ও আসছে। ভিজবে সবাই।
সরো। পালাও!’
বনের এদিকটায় গাছগাছালি কম কম। সরবার মতো জন্তুও তাই নেই তেমন। দু-চারটে পিপলী পাখি, ডিম পাড়েনি এখনো, হুস করে উড়ে গেল। তাদের দেখাদেখি কাঠবিড়ালিটাও কোথায় পালাল। ইঁদুরটা একবার নিজের গর্তে ঢুকে পরক্ষণেই আবার কী ভেবে গাঁয়ের দিকে ছুটল। কেবল গাছগুলোর কোথাও যাওয়ার উপায় নেই বলে শেকড়গুলোকে আরও একটু গভীরে চালান করে আঁকড়ে ধরল মাটিকে। তবু তাদের শুকনো ডাল আর পাতারা কোথাও যাওয়ার তাড়ায় উড়েছিল একটু। বেশিদূর যেতে পারেনি। আর একজন যে এখানে থেকে গিয়েছিল সেই পিতু ঝড়বৃষ্টি শেষে ঝরা শালপাতা আর শুকনো ডালপালার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। কুঁই কুঁই করে মাকে একবার ডেকে নিল। সাড়া মিলল না।
পিতুরা চার ভাইবোন। ইতু-মিতু-রিতু-পিতু। কুকুর সমাজে এমন নাম রাখবার চল নেই। ওদের নাম হয় কা, কি, কু, কে, কৈ, কো, কৌ, কং, কা এরকম। তবু ওদের মা ওদের জন্য এই নামগুলোই ঠিক করে রেখেছিল ওদের জন্মেরও আগে। ক’মাস আগেও ওদের মা বনের পাশের এক গেরস্থবাড়িতে থাকত। সেই বাড়িতে ছোট্ট ছোট্ট তিনটি মেয়ে ছিল ইতু-মিতু-রিতু। সেই তিনটি মেয়ে এত লক্ষ্মী আর ভালো ছিল যে, পিতুর মা ঠিক করেছিল, তার যখন ছেলেমেয়ে হবে তখন এমন নাম রাখবে। কিন্তু পিতুরা জন্মাল চারজন। তখন ওর মা তিনটি নামের সঙ্গে মিলিয়ে ওর নাম রাখল ‘পিতু’।
ওদের মায়েরও জন্ম হয়েছিল গেরস্থবাড়িতে। আজীবন সে সেখানে মানুষ। কিন্তু যখন পিতুদের জন্ম হবে তখন মায়ের খুব খিদে পেত। কিন্তু ওরা বেশি খাবার দিত না। ইতু-মিতু-রিতুই কেবল বাবা-মায়ের চোখ এড়িয়ে নিজেদের খাবার থেকে তাকে ভাগ দিত। এক রাতে সে বাড়িতে চোর এসেছিল। ওর মা অচেনা লোক দেখে ঘেউ ঘেউ করেছিল বটে, কিন্তু চোরেরা তাকে অনেক খাবার দিল। ওর মা সব ভুলে গোগ্রাসে খেতে লাগল। তার ফলও পেয়েছিল। পরেরি দন বাড়ির কর্তা খুব পিটিয়েছিল তাকে। খেতে দেয়নি দুদিন। ‘নিমকহারাম’ বলেছিল। সেই দুঃখে পিতুর মা বনবাসে চলে এলো। মনে মনে বলেছিল, আমরা জানোয়ার, জানোয়ারদের সঙ্গে থাকাই ভালো।
পিতুরা মায়ের কাছে গল্প শুনেছে, মানুষও একসময়ে বুনো জন্তু ছিল। তারা বনের ফলমূল আর প্রাণী শিকার করে খেত। একসময়ে মানুষ দেখল ফলের বীজ মাটিতে ফেললে গাছ হয়। এভাবে তারা ফসল ফলাতে শিখল। ধরে আনা প্রাণীদের ডিম-দুধ-বাচ্চা পেয়ে তাদেরও পোষ মানাতে শিখল। জঙ্গলে মানুষের প্রথম বন্ধু হয়েছিল কুকুর। শিকার ধরতে আর নিরাপদে থাকতে কুকুর তাকে অনেক সাহায্য করেছে। বন ছেড়ে এসে মানুষ প্রথমে গ্রাম বানাল, তারপর শহর। বন্ধু কুকুরকে সে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল। তারপর যত দিন গেছে মানুষের কাছে কুকুরের প্রয়োজন তত কমেছে। এখন আর সে বন্ধুত্বের কথা মানুষের মনেই নেই।
পিতুর মা বুনো জন্তুদের কাছে অচেনা। তবু তারা পিতুর মাকে খুব আপন করে করে নিয়েছিল। কাঠবিড়ালি মাসি পিতুর মাকে পাকা ফল খেতে শিখিয়েছে। শেয়াল এনে দিয়েছে মাংস-হাঁড়।
বনের পাখি-শিশুদের বাবা-মা দুজন মিলে যত্ন করে। অনেকটা মানুষের মতো। কিন্তু পশুদের তেমন নিয়ম নয়। পশুর সন্তানরা কেবল মায়ের। ওরা বাবাকে চেনেও না। পিতু ভেবে পায় না, মানুষগুলো তো পাখিদের মতো ডিম পাড়ে না, পশুর মতোই বাচ্চা দেয়। তবু পাখির নিয়মটা কেমন করে শিখে নিল! আবার নিজেদের বাড়িকে আজকাল তারা বাসা বলে, পাখির মতনই।
হাতির পায়ের চাপে একটা জায়গায় গর্ত মতন হয়েছে। তাতে জল জমেছে। ঝড়ের পরে পিতু পাতার আবডাল থেকে বেরিয়ে সেখানটায় এলো। তার খিদে পেয়েছে খুব, তেষ্টাও। সে জল খাবার জন্য গর্তটার কাছে গেল। তখনই জলের ওপর চাঁদমামার দেখা মিলল।
চাঁদমামা বলল, পিতু, তোমার মন খারাপ কেন?
পিতু বলল, আমার মা আর ভাইবোনদের হারিয়ে ফেলেছি।
‘কেমন করে?’
‘কাঠবিড়ালির সঙ্গে খেলতে খেলতে মানুষের বসতির কাছে পৌঁছে গিয়েছিলাম, আর একটা মানুষের বাচ্চা আমাকে দেখতে পেয়ে খাবার খেতে দিয়ে আটকে রেখেছিল।’
‘তোমার মা নিশ্চয়ই তোমাকে খুঁজতে গিয়েছে।’ চাঁদমামা বলে।
পিতু বলল, ‘যদি খুঁজে না পায়! আমি তো তাহলে হারিয়ে যাব!’
‘হারাবে কেন! তোমার মা তো এখানেই ফিরে আসবে। মানুষের কাছে গেলে কেন? জানো না ওরা লোভ দেখায়? এমনকি আমাকেও ধান ভানলে কুঁড়ো দেব, মাছ কাটলে মুড়ো দেব বলে খাবারের লোভ দেখিয়ে রোজ রোজ ডাকতে থাকে আমি কি এসব খাই বলো!’
‘আমরা যে মানুষের বন্ধু। কত হাজার বছর আগে থেকে মানুষ আর কুকুর একসঙ্গে থাকছে। একই খাবার খেয়েছে। আজ মানুষ আমাদের ভুলে গেছে বলে কি আমরাও ভুলতে পারি!’
এমন সময়ে পিতু-ইতু-মিতু-রিতুকে আসতে দেখল। কিন্তু কী সর্বনাশ! ওরা যে তিনটে মানুষের বাচ্চার কোলে! ভয়ে পিতু তিন পা পিছিয়ে গেল। এমনি সময়ে ওর মাকেও দেখল খুশি খুশি মুখে এদিকে আসছে। মা বলল, ভয় নেই পিতু, ওরাও ইতু-মিতু-রিতু। কাঠবিড়ালির মুখে খবর পেয়ে তোকে খুঁজতে খুঁজতে ওদের বাড়ির কাছে পৌঁছে গিয়েছিলাম। ওরা আমায় দেখে ছুটে এলো। তারপর জোর করে বাড়িতে নিয়ে গেল। ওদের বাবা-মা বলল, কত খুঁজেছি তোমায়! আবারও ‘নেমকহারাম’ বলল। কিন্তু এবারে আর একটুও দুঃখ হয়নি। এরপর ইতু-মিতু-রিতু বলল, আমরা তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি। তোমাদের মাকে আমরা জন্ম থেকেই নিজেদের একজন বলে জেনেছি। তাকে হারিয়ে কত দুঃখ হয়েছিল আমাদের! বাড়ি চলো পিতু। পিতুর মা বলল, তোমরা এগোও। আমি একটু সবাইকে বলে আসি।
পিতু এদের কখনো দেখেনি। তবু মনে হলো, এদের চেয়ে আপন তার আর কেউ নেই। মানুষ-কুকুরের বন্ধুত্ব আজও ফুরোয়নি। আনন্দে পিতুর চোখে জল চলে এলো। জলভরা চোখেই সে চাঁদমামাকে ‘টা টা’ বলে লেজ নাড়তে নাড়তে ইতু-মিতু-রিতুর পেছন পেছন এগিয়ে চলল।