ফুটবল ‘জ্বরে’ ভুগছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে বড় মহাযজ্ঞ, ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’খ্যাত ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে এবার বসেছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ। ৪৮ দলের অংশগ্রহণে এবারের আসরে অনুষ্ঠিত হবে রেকর্ড ১০৪ ম্যাচ। এ আয়োজন চলবে ১৯ জুলাই পর্যন্ত। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও চলছে ‘ফুটবল জ্বর’। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেন সেই উন্মাদনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো সেজেছে প্রিয় দলের রঙে। কোথাও উড়ছে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা পতাকা, কোথাও ব্রাজিলের হলুদ-সবুজ। পাশাপাশি স্পেন, জার্মানি, পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশের পতাকাও শোভা পাচ্ছে হলের বারান্দা, করিডর ও ছাদজুড়ে। প্রিয় দলের পতাকা টাঙানো কেন্দ্র করে সমর্থকদের মধ্যে চলছে নীরব প্রতিযোগিতা।

লিওনেল মেসির নেতৃত্বে ২০২২ সালে ৩৬ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিল আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে ২০০২ সালের পর আর শিরোপা না পাওয়া ব্রাজিল সমর্থকদের স্বপ্ন এবার ‘হেক্সা মিশন’ পূরণ করা। তাই আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে তর্কবিতর্ক, খুনসুটি ও ফুটবলীয় বাগ্যুদ্ধ এখন ক্যাম্পাসের নিত্যদিনের দৃশ্য।

ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা যায়, পছন্দের দলকে নিয়ে নানা যুক্তিতর্কে মুখরিত টিএসসি, রাজু ভাস্কর্য, মধুর ক্যান্টিন ও আবাসিক হলগুলোর আড্ডা। বিকেল গড়ালেই প্রিয় দলের জার্সি গায়ে শিক্ষার্থীরা জড়ো হন এসব স্থানে। ফুটবল বিশ্লেষণ, সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন, তারকা খেলোয়াড় কিংবা কোচের কৌশল সব কিছুই আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

হলভিত্তিক ফ্যান ক্লাবগুলোর ব্যানারে শোভা পাচ্ছে মেসি, নেইমার, এমবাপ্পে, রোনালদো, ভিনিসিয়ুস কিংবা ইয়ামালের মতো তারকাদের ছবি। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুটবল আড্ডাও জমে উঠছে আরও বেশি।

বিশ্বকাপ উন্মাদনার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছে টিএসসি ও রাজু ভাস্কর্য এলাকা। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে টিএসসি ও হাজি মুহম্মদ মুহসীন হল মাঠে জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলা দেখানো হয়েছিল, যেখানে একসঙ্গে ১০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী খেলা উপভোগ করেছিলেন। আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উল্লাসের খবর সুদূর আর্জেন্টিনাতেও আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

সেবার নিজের পছন্দের দলকে সমর্থন জানাতে হাজারো শিক্ষার্থী হাজির হয়েছিলেন জায়ান্ট স্ক্রিনের সামনে। খেলা শুরুর আগ পর্যন্ত চলেছে তর্কবিতর্ক, খুনসুটি আর ভবিষ্যদ্বাণী। আর ম্যাচ শুরু হতেই গোল, সেভ কিংবা আক্রমণে মুহূর্তেই ফেটে পড়েছিল দর্শকসারি। এবারও বিশ্বকাপ ঘিরে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) হাজি মুহম্মদ মুহসীন হল মাঠে জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলা দেখানোর আয়োজন করেছে। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে টিএসসির পায়রা চত্বরে খেলা দেখানো হচ্ছে। এ ছাড়া বিশ্বকাপ চলাকালে প্রতিটি আবাসিক হলের টিভিরুম ফুটবলপ্রেমীদের মিলনমেলায় পরিণত হচ্ছে।

বিশ্বকাপ উন্মাদনার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল। হলটির বারান্দা থেকে করিডর কিছুই যেন বাদ যায়নি। কোথাও ঝুলছে প্রিয় খেলোয়াড়ের ছবি, কোথাও উড়ছে বিভিন্ন দেশের পতাকা। আর্জেন্টিনার সমর্থক শিক্ষার্থী হাসান তারিক বলেন, বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আর্জেন্টিনা এবারও অন্যতম ফেভারিট। ব্রাজিল সমর্থক সালমান বলেন, বিশ্বকাপ মানেই ব্রাজিল। গত কয়েক আসরে ভাগ্য সহায় হয়নি, কিন্তু এবার দলটি অনেক পরিণত। পর্তুগাল সমর্থক এক শিক্ষার্থী বলেন, রোনালদো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। তার হাতে একটি বিশ্বকাপ দেখতে চাই। তবে সমর্থকদের আবেগ ও তর্কের বাইরে গিয়ে সবাই একমত একটি বিষয়ে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো একসঙ্গে খেলা উপভোগ করা।

২০২২ সালে বিশ্বকাপের সময় ক্যাম্পাসে থাকা শিক্ষার্থী আশরাফুল ইসলাম বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্বকাপ উপভোগের পরিবেশ দেশের খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়। ২০২২ সালে যে স্মৃতি তৈরি হয়েছিল, তা ভোলার নয়। আশা করি এবারও সবাই মিলে একই আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে পারব। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এএফ রহমান হলের ফটকে টাঙানো হয়েছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনাসহ অন্যান্য দলের পতাকা। হলের দেওয়ালেও আঁকা হয়েছে বিভিন্ন দেশের পতাকা। এ বিষয়ে হল সংসদের ভিপি রফিকুল ইসলাম বলেন, ফুটবল বিশ্বকাপ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি উৎসব। সেই উৎসব ঘিরেই শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগে পতাকা টাঙিয়েছে, দেওয়ালে চিত্রাঙ্কন করেছে। এতে হলে ভিন্ন এক প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।