রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও সমন্বিত করতে ছয়টি মেট্রোরেল লাইনের সমন্বয়ে একটি আধুনিক নগর পরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে সরকার। একই সঙ্গে মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযুক্ত মনোরেলভিত্তিক ফিডার নেটওয়ার্ক নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, সরবরাহব্যবস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে বাজেটে যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে ১২ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত ছিলেন।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত, যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিকীকরণ ও নগর পরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে ছয়টি মেট্রোরেল লাইনের সমন্বয়ে একটি আধুনিক গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযুক্ত মনোরেলভিত্তিক ফিডার নেটওয়ার্কও নির্মাণ করা হবে। সরকারের এ উদ্যোগ রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত ও আধুনিক রূপ দেওয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাজেট প্রস্তাবে তুলে ধরা হয়েছে।
গতকাল জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে যোগাযোগ খাতে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৪৮ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বরাদ্দে প্রায় ১২ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক, মহাসড়ক, সেতু ও রেলপথসহ যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নে এই অতিরিক্ত বরাদ্দ পণ্য পরিবহন সহজ করবে, লজিস্টিক ব্যয় কমাবে এবং সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা আরও বাড়াবে।
এ ছাড়া নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে মহাসড়ক উন্নয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোর চার লেনে উন্নীতকরণ এবং সমন্বিত যোগাযোগ কাঠামোর মাধ্যমে একটি মাল্টিমোডাল হাব গড়ে তোলা
সড়ক নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে ৯৪টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে সরকার। এর মধ্যে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ‘সেফটি সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ ভিত্তিক বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়েছে। অটোমেটেড ফিটনেস সার্টিফিকেট ব্যবস্থা ও পেশাজীবী চালকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার; প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার জাতীয় এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড গড়ে তুলতে সম্ভাব্য করিডোর চিহ্নিতকরণ; রিং রোড ও রেডিয়াল রোড নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকার যানজট নিরসন; পুরনো বাস পর্যায়ক্রমে ইলেকট্রিক বাস দ্বারা প্রতিস্থাপন; দ্বিতীয় যমুনা সেতু, তৃতীয় মেঘনা সেতু ও ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ; ইলেকট্রনিক টোল ও স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
নৌ-পরিবহন : ব্যয়-সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও দক্ষ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার নৌ-পরিবহন খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দর আধুনিকায়ন ও অভ্যন্তরীণ নৌপথের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে নৌপরিবহন খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ নৌপথের উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার; ড্রেজিং কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং দক্ষতা উন্নয়ন; নদীবন্দর ও লঞ্চঘাট আধুনিকায়ন; মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বাস্তবায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ট্রান্সশিপমেন্ট সক্ষমতা বৃদ্ধি; মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন, জেটি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং কার্গো হ্যান্ডলিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে; চট্টগ্রাম বে-টার্মিনাল, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল ও লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ।
প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই ব্যয় ছিল ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে পরিচালন ব্যয় ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের (৫ লাখ ৬৭ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা) চেয়ে বেশি। দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের গতি সচল রাখতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিসহ (এডিপি) মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হচ্ছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা।