রক্ত আমার জীবন সবার

মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রক্ত। রক্তের বিকল্প রক্তই। অতি প্রয়োজনীয় এই জিনিস কলকারখানায় তৈরি হয় না। মানুষের রক্তের প্রয়োজনে মানুষকেই রক্ত দিতে হয়। বিশ্বে প্রতি বছর এমসিপি ১০৮ কোটি ব্যাগ রক্ত সংগৃহীত হচ্ছে। এর মধ্যে ৩১ শতাংশ স্বেচ্ছা রক্তদাতা আর ৫৯ শতাংশ রক্তদাতা আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধব। বিশ্বের প্রায় ৬০ দেশে শতভাগ স্বেচ্ছা রক্তদানের মাধ্যমে রক্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। উন্নত বিশ্বে স্বেচ্ছা রক্তদাতার হার প্রতি ১ হাজারে ৪০ আর উন্নয়নশীল বিশ্বে ৪ জনের কম। দেশে বছরে ৫ থেকে ৭ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন যার ৩১ ভাগ পাওয়া যায় স্বেচ্ছা রক্তদাতার মাধ্যমে। বাকি রক্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রে পেশাদার রক্তদাতা এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হচ্ছে।

মানবদেহে রক্ত অপরিহার্য। দেহের কোষে কোষে অক্সিজেন ও পুষ্টি উপাদান পৌঁছে দেওয়া, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য বর্জ্য ফিরিয়ে আনা, হরমোন, লবণ ও ভিটামিন পরিবহন, রোগপ্রতিরোধ, দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ সবকিছুতে রক্তের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তাই কারও দেহে রক্তের অভাব হলে, তা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে অন্যের রক্ত রোগীর দেহে প্রবেশ করানো তথা রক্ত পরিসঞ্চালনই অন্যতম উপায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে আজ পর্যন্ত রক্তের বিকল্প আবিষ্কার হয়নি। রক্তের অভাবে যখন কোনো মানুষ মৃত্যুর মুখোমুখি হয়, তখন অন্য একজন মানুষের দান করা রক্তই তার জীবন বাঁচাতে পারে। ফলে এর চেয়ে মহৎ কাজ আর কী হতে পারে? অগণিত মুমূর্ষু রোগীকে স্বেচ্ছায় রক্তদান করে যারা জীবন বাঁচাতে সাহায্য করেন তাদের মূল্যায়ন, স্বীকৃতি ও উদ্বুদ্ধকরণের জন্য বিশ্বজুড়ে আজকের রক্তদাতা দিবস পালন করা হচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য, জনগণকে রক্তদান ও নিরাপদ রক্ত ব্যবহারে উৎসাহিত, স্বেচ্ছায় রক্তদানে সচেতন এবং নতুন রক্তদাতা তৈরি করা। এবারের প্রতিপাদ্য ‘মানবতার এক ফোঁটা রক্ত দিন, জীবন বাঁচান।’ রক্তের বিভিন্ন গ্রুপের আবিষ্কারক ও ট্রান্সফিউশন মেডিসিনের জনক কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার ডাক্তার হয়েও চিকিৎসাসেবার পথে না গিয়ে, গবেষণার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। লক্ষ্য করেন, বিভিন্ন রোগবালাই ও দুর্ঘটনার ফলে রক্তের ঘাটতি অহরহ লেগে আছে। জটিল প্রক্রিয়া শেষে রক্ত দেওয়া গেলেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগী মারা যেত। চিকিৎসকরা কোনোভাবেই কূলকিনারা পাচ্ছিলেন না। রোগীকে যে কারও রক্ত দেওয়া যায় না, এ চিন্তা থেকে তিনি ১৯০০ সালে বিভিন্ন টাইপের ব্লাড গ্রুপ আবিষ্কার করেন। এই আবিষ্কার উন্মোচন করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিশাল অধ্যায়। ১৯৪৬ সালের ২৬ জুন মারা যান মহান বিজ্ঞানী গবেষক। জন্মদিনে তাকে স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানাতে ১৪ জুন পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব রক্তদাতা দিবস’।

২০০৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহান্সবার্গে প্রথম পালিত হয় আন্তর্জাতিক রক্তদাতা দিবস। ২০০৫ থেকে প্রতি বছর বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেয়। যেকোনো কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে, সাধারণত সম্পূর্ণ রক্ত দেওয়া হয় যেমন দুর্ঘটনা, রক্তবমি, পায়খানার সঙ্গে রক্তপাত, প্রস্রাবকালীন রক্তক্ষরণ ইত্যাদি। এ ছাড়া জটিল বা বড় ধরনের অপারেশনে সম্পূর্ণ রক্তের প্রয়োজন। বিভিন্ন রকমের অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতায় সাধারণত লোহিত কণিকা দেওয়া হয়। হেমোরেজিক ডেঙ্গুজ¦রে প্রয়োজন অণুচক্রিকা, রক্তরস দেওয়া হয় হিমোফিলিয়া ও অন্যান্য কোয়াগুলেশন ডিজঅর্ডার এবং আগুনে পোড়া রোগীকে। রক্তবাহিত রোগের সংক্রমণ একটি প্রধান সমস্যা। হেপাটাইটিস বি, সি, এইডসসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী জীবাণু রক্তের মাধ্যমে রক্তগ্রহীতার দেহে প্রবেশ করতে পারে। এ পরিস্থিতির মূল কারণ-রক্ত পরিসঞ্চালনের আগে রক্তটি জীবাণুমুক্ত কিনা, তা যথাযথভাবে পরীক্ষা না করা। অনুমোদনবিহীন ব্লাডব্যাংকগুলোতে এসব রক্ত বিক্রি করা হচ্ছে। আর তা আসে মূলত নেশাসক্ত পেশাদার রক্তদানকারী থেকে। এ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ রক্ত বা ভেজাল রক্তও বিভিন্ন ব্লাডব্যাংক থেকে আসে। ভুলক্রমে এক গ্রুপের রক্ত, অন্য গ্রুপের রোগীকে দিলে রক্ত হয়ে উঠতে পারে প্রাণঘাতী।

এসব ক্ষেত্রে রক্ত সংগ্রহকারী ও পরীক্ষাকারী ব্লাডব্যাংক, চিকিৎসক অথবা নার্স যে কারও ভুল বা অসতর্কতা মারাত্মক দায়ী। তখন শুরু হতে পারে রোগীর বুক, পিঠ ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট। অবশ্য চিকিৎসক দ্রুত ব্যবস্থা নিলে, পরবর্তী জটিলতা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। পাড়ায় পাড়ায় ব্যাঙের ছাতার মতো অবৈধ ব্লাডব্যাংক গড়ে উঠলেও, নিরাপদ রক্ত দুর্লভ। বিশেষ করে জরুরি মুহূর্তে রক্ত প্রয়োজন হলে, তা হয় সোনার হরিণ। রক্ত যে কারও, যেকোনো সময় প্রয়োজন হতে পারে। এ কথা মনে রেখে, আমরা যদি প্রস্তুতি নিয়ে রাখি তবে রক্ত পরিসঞ্চালন সমস্যা থেকে বাঁচা সম্ভব। কিন্তু এজন্য কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। নিজের, আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবের রক্তের গ্রুপ জেনে রাখা, নিকটস্থ ব্লাডব্যাংকের ঠিকানা ও ফোন নম্বর, নিবন্ধনকৃত ব্লাডব্যাংকে রক্তদান ও গ্রহণ, পেশাদার রক্তদাতার রক্ত না কেনা এবং নিয়মিত রক্তদান ও সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তবে রক্ত নেওয়ার আগে রক্তের গ্রুপ এবং ক্রস ম্যাচিং ঠিক আছে কিনা, তা দেখে নিতে হবে এবং অপরিচিত পেশাদার রক্তদাতার রক্ত নেওয়া ঠিক হবে না। মনে রাখা প্রয়োজন, রক্তের অভাব ও অনিরাপদ রক্ত জীবনের জন্য হুমকি।

ভালো কাজ, ভালো চিন্তা, মহৎ উদ্যোগ মানবজাতির কল্যাণ আনে। এমনই কল্যাণকর কাজ ‘রক্তদান।’ স্বেচ্ছায় রক্তদানে অন্য মানুষের মূল্যবান প্রাণরক্ষা পায়, নিজের জীবনও ঝুঁকিমুক্ত থাকে। রক্ত আমার হতে পারে, মনে রাখতে হবে জীবনটা সবার। আসুন, জীবনকে ভালোবাসি।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক , বিএমইউ

abdullahk30b@gmail.com