রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় চলমান সড়ক খনন ও সংস্কারকাজ মহানগরবাসীর জন্য কতটা ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ জুন দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ফটো অ্যালবামে ছাপাকৃত ছবিগুলোই এর সাক্ষ্য দিচ্ছে। প্রকাশিত ছবিগুলো প্রকটভাবে তুলে ধরেছে জনবিড়ম্বনা-জীবনঝুঁকি-পরিবেশগত ক্ষতিসহ নানামাত্রিক প্রশ্ন। ওয়াসা, গ্যাস-বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা কিংবা ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নের কাজ যেন ফুরাতেই চায় না। এমন নজিরও আছে, একই স্থানে একাধিকবার দায়িত্বশীলদের ভুলের কারণে খোঁড়াখুঁড়ি হয়। অভিযোগ আছে, বর্ষাকালে এমনটি আরও বেশি পরিলক্ষিত হয়। এ ক্ষেত্রে ভুল পরিকল্পনা, সমন্বয়ের অভাব, নিয়মনীতি অমান্যের বিষয়গুলোও ইতিপূর্বে সংবাদমাধ্যমেই আমরা জেনেছি। রাজধানীর বহু গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সংস্কার কিংবা উন্নয়ন যজ্ঞের নামে খোঁড়াখুঁড়ির মহোৎসব শুধু যে জনবিড়ম্বনা-জীবনঝুঁকি-পরিবেশগত ক্ষতির চিত্রই স্ফীত করছে তাই নয়, অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও ক্রমেই বাড়াচ্ছে।
সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কে পানি থইথই করে, রাস্তা সংকুচিত হওয়ায় যানবাহন চলাচলে ধীরগতির পাশাপাশি সৃষ্টি হয় যানজট-জলজটের এবং এর ফলে ঘটে দুর্ঘটনাও, এমন নজিরও তো কম নেই। আমরা উন্নয়ন চাই, কিন্তু প্রশ্ন তুলতে বাধ্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্বশীলদের দায়িত্বজ্ঞান নিয়ে। গত বছরের মে মাসে ডিএমপির এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছিল, রাজধানীতে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির আগে এখন থেকে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও ঠিকাদারদের ঢাকা মহানগর পুলিশের অনুমতি নিতে হবে। এই শর্ত ভেঙে ঢাকা মহানগর এলাকায় যানবাহন চলাচলে বিঘœ ঘটালে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানায় পুলিশ। কিন্তু এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব আমরা দেখছি না। আমরা জানি, সেবা সংস্থাগুলোর উন্নয়ন কাজ পরিচালনার কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। কিন্তু এসবের যেকোনো তোয়াক্কা কেউ করছেন না বিদ্যমান বাস্তবতা এরই সাক্ষ্যবহ। ঢাকার অনেক সড়ক এখন খোঁড়াখুঁড়ির কবলে। কিছু সড়ক খুঁড়ে পাইপ বা ক্যাবল বসানোর কাজ শেষ করার পর এখন অরক্ষিত অবস্থায়। কিছু গর্ত উঁচু করে পাকা করার কারণে চলাচলে দুর্ঘটনা ঘটছে। কিছু সংযোগ সড়ক বন্ধ হয়ে গেছে। এক সেবা সংস্থার অসতর্ক খোঁড়াখুঁড়ির কারণে অপর সংস্থার পাইপলাইন ফুটো হয়ে অচল হয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে এক সংস্থার সঙ্গে অপর সংস্থার বিরোধও বাধছে।
আমরা জানতে চাই, খোঁড়াখুঁড়ির শেষ কোথায়? খোঁড়াখুঁড়ির পূর্বশর্ত হলো প্রতিদিনের খনন করা অংশ বালু দিয়ে ভরাট করা, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকা, আড়াআড়ি খননের ক্ষেত্রে স্টিলের পাত দিয়ে গর্ত ঢেকে রাখা, সাইনবোর্ড টাঙিয়ে খননের উদ্দেশ্য, কাজ শুরু ও সমাপ্তির তারিখ প্রদর্শন করা। অনিবার্য না হলে খননকাজ শুধু রাতেই করতে হবে এবং সকাল হওয়ার আগে খনন করা মাটি বা পরিত্যক্ত নির্মাণসামগ্রী (রাবিশ) সরিয়ে নিতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব মানা হয় না। নিয়মনীতি যদি মানা না হয় কিংবা উপেক্ষিত থেকে যায়, তাহলে কাগজে-কলমে এই নীতিমালারই বা প্রয়োজন কী?
আমরা আরও প্রশ্ন রাখি, এসব দেখাশোনার দায়দায়িত্ব যাদের তারাই বা নির্বিকার কেন? উন্নত দেশ তো বটেই, বহু উন্নয়নশীল অন্য দেশেও বারবার সড়ক কাটে না। একটা এলাকার মানুষের চাহিদা কী হতে পারে, তা আগেই তারা ঠিক করে। কিন্তু ঢাকা বা অন্যান্য নগরে-শহরে সিংহভাগ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি বা হয় না। যেহেতু সমস্যা সৃষ্টি হয়ে গেছে, এখন দায়িত্ব নিয়ে শর্তগুলো পালন করলে ভোগান্তি কিছুটা কমে। প্রয়োজন হলে মানুষের ভোগান্তি নিরসনে প্রতিটি প্রকল্পে বাড়তি বরাদ্দ দিয়ে হলেও জনদুর্ভোগের নিরসন করতে হবে। একই সঙ্গে নীতিমালা মানতে বাধ্য করতে হবে এবং যারা নীতিমালা লঙ্ঘন করবে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইন প্রয়োগ ও সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।