অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন কঠিন

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় বাজেট পেশ করেছেন। বাজেটে মোট ব্যয় ধার্য করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। সার্বিকভাবে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৬.৫%। তবে মোট বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ২৬%, যা অনেক বেশি মনে হওয়া স্বাভাবিক। বাজেটের আকার এবং ঘাটতির পরিমাণ অস্বাভাবিক মনে হলেও, সরকারের বিশাল বাজেট হাতে নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। এবারের বাজেটের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। প্রথমত, সরকারকে ক্ষমতা গ্রহণের চার মাসের মধ্যে একটি বাজেট জাতির সামনে পেশ করতে হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। দ্বিতীয়ত, প্রায় দুই যুগ পরে এসে বিএনপি বাজেট প্রণয়ন করেছে। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে অর্থনীতির আকার ও কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। তৃতীয়ত, এবারের বাজেট অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতা রাখার বাজেট ছিল না, বরং অন্তর্র্বর্তী সরকারের আমলে তছনছ হওয়া অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের বাজেট এটি। অতীতে নতুন সরকার সবসময় অন্তর্র্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছ থেকে ধারাবাহিকতার বাজেট পেয়েছে। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেখানে রেখে গেছে, সেখান থেকে নির্বাচিত সরকার শুরু করেছে। এবারই ব্যতিক্রম। অন্তর্র্বর্তী সরকার দেশের অর্থনীতির বারোটা বাজিয়ে নির্বাচিত সরকার বিএনপির ওপর দায়িত্ব দিয়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই সরকার ঘাটতি বাজেট জাতির সামনে পেশ করেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের দেশে সবসময় ঘাটতি বাজেটই প্রণীত হয়ে আসছে। আসলে অর্থনীতির বাস্তবতায়, ঘাটতি বাজেটই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পন্থা। কেননা, উদ্বৃত্ত বাজেট বা ব্যাল্যান্স বাজেট কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে আছে বলে মনে হয় না। বাজেটে আয় এবং ব্যয় সমান হবে, সেই বাস্তবতা নেই বললেই চলে। আয় বেশি করে, ব্যয় কম করবে, যা মূলত উদ্বৃত্ত বাজেট, সেই বাস্তবতা নেই। শুধু আমাদের দেশ কেন, বিশ্বের অধিকাংশ দেশই ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করে। সেই দিক থেকে সরকার সঠিক পথেই আছে। ঘাটতি বাজেটের সমস্যা অন্যত্র এবং তা বাজেটের মাধ্যমে অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে জড়িত। বাজেটে লক্ষ্য কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সেই লক্ষ্য কীভাবে অর্জিত হবে, তার ওপর ঘাটতি বাজেটের সার্থকতা নির্ভর করে। ঘাটতি বাজেট নেওয়া সত্ত্বেও যদি কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়, তখনই সেই ঘাটতি বাজেট অর্থনীতির জন্য ভালো ফল বয়ে আনে। যেমন ঘাটতি বাজেট নিয়েও যদি ব্যাপকভিত্তিক বিনিয়োগ উৎসাহিত করা যায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ বৃদ্ধি পায়, জিডিপি বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়, মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়, মূল্যস্ফীতি হ্রাস করা সম্ভব হয়, সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পায় এবং এ রকম আরও অনেক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হলে, সেই ঘাটতি বাজেট দেশ ও অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে ভালো পদক্ষেপ। এই ঘাটতি বাজেটের সফলতা নিয়ে উন্নত দেশ, এমনকি অনেক উন্নয়নশীল দেশও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে ।

পক্ষান্তরে ঘাটতি বাজেটে যদি সেরকম অর্থনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা না হয় বা লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও, যদি তা অর্জন করা সম্ভব না হয় তাহলে সেই ঘাটতি বাজেটে ভালোর থেকে খারাপই বেশি হয়। এ ধরনের ঘাটতি বাজেটের দুষ্টচক্রে আটকে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে এবং একবার সেই ফাঁদে আটকে গেলে আর সেখান থেকে বেড় হওয়া সম্ভব হয় না। অনেক উন্নয়নশীল দেশ যে বছরের পর বছর ঘাটতি বাজেট গ্রহণ করেও সেরকম উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করতে পারেনি, তার অন্যতম কারণ হচ্ছে সেই ঘাটতি বাজেটে সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়নি বা করলেও সেই লক্ষ্য অর্জন করা হয়নি। আমাদের দেশের ঘাটতি বাজেটের ক্ষেত্রেও বিষয়টি কিছুটা সেরকমই। বিষয়টা কিছুটা ঋণ করে দৈনন্দিন খরচ মেটানো এবং ঋণের অর্থ বিনিয়োগ করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ অর্জনে ব্যয় করার মতো বিষয়।

এবারের বাজেট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা এবং ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। অথচ এই বিশাল আকৃতির বাজেট এবং ব্যাপক ঘাটতির মধ্যে সে রকম উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক লক্ষ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন। যেমন সরকারি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জিডিপি বৃদ্ধির মতো বিষয় সুস্পষ্ট করে সেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে মনে হয় না। অবশ্য উপস্থাপনা বা বাজেট বক্তৃতার মধ্যে কিছু গতানুগতিক ধারার লক্ষ্য অর্জনের কথা বলা আছে। কিন্তু বাজেট হচ্ছে সংখ্যার খেলা। এখানে বিশ্লেষণ বা আলোচনা করার মতো কোনো বিষয় সেভাবে গুরুত্ব পায় না। অর্থনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয় সুনির্দিষ্টভাবে; যেমন ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি বাজেটের কারণে সরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে ৫০ লাখ কোটি টাকা এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে দুই কোটি ৫০ লাখ কোটি টাকা। একইভাবে উল্লেখ থাকতে পারে যে, এই ঘাটতি বাজেটের মাধ্যমে দেশে আগামী এক বছরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে প্রায় এক কোটির মতো এবং জিডিপি বৃদ্ধি পাবে ২.৫%। এ রকম আরও কিছু অর্থনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে।

প্রস্তাবিত বাজেটে এ রকম সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এমন তথ্য দৃষ্টিতে আসেনি। এমনকি বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার মতো সেরকম প্রণোদনাও চোখে পড়ল না। যেমন এই মর্মে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত যে, সব ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান আগামী অর্থবছরে পাঁচশ কোটি টাকা বা তার বেশি বিনিয়োগ করবে সেসব প্রতিষ্ঠানকে কিছু কর সুবিধা দেওয়া হবে এবং সেই সঙ্গে স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণের সুযোগ দেওয়া হবে। কেননা বাজেটের অন্যতম লক্ষ্যমাত্রা হওয়া উচিত বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। অর্থনীতির এই দুই উপাদানের মধ্যে আবার নিবিড় সম্পর্ক আছে। বিনিয়োগ বাড়লেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পক্ষান্তরে বিনিয়োগ হ্রাস পেলে বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়। এ কারণেই বাজেটের আসল উদ্দেশ্যই থাকে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা এবং এই উদ্দেশ্যে কর সুবিধাসহ কিছু প্রণোদনা দেওয়া হয়ে থাকে। আমাদের দেশে কর সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হচ্ছে করদাতা ব্যবসায়ীর সংখ্যা খুবই সীমিত। সরকারের রাজস্ব আয়ের পরিমাণ খুবই কম। ফলে চাইলেও সরকার এই খাতে খুব বেশি কিছু করতে পারে না। তবে ভবিষ্যতে কর বৃদ্ধির স্বার্থে বর্তমানে সরকারি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি করে হলেও বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে কিছু কর সুবিধা সরকার দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে।

বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭.৫০-এ নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতি শুধু ফিসক্যাল এবং মনিটারি পলিসি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কেননা আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে যত না অর্থনৈতিক উপাদান থাকে, তার চেয়ে বেশি থাকে অর্থনীতিবহির্ভূত উপাদান, যেমন বিশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থা, আধুনিক গুদামজাত প্রক্রিয়ার অভাব, আধুনিক সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থার অভাব প্রভৃতি। তাই বাজেটে বা মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি কমানোর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়, তা মূলত কাগজ-কলমের বিষয় ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই আমাদের দেশে বাজেটের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি হ্রাসের লক্ষ্য কতটা অর্জিত হবে, তা নিয়ে সংশয় আছে। অতীতে এ রকম লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে এমন নজির খুব একটা আছে বলে মনে হয় না। এবারের বাজেটে এ রকম কিছু একটা হয় কিনা সেটাই দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে।

যে বিশাল অংকের বাজেট পেশ করা হয়েছে, সেটা ঠিকই আছে। বাজেটে বিশাল ঘাটতি আছে, সেটাও ঠিক। কিন্তু যেটা প্রয়োজন তা হচ্ছে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে কিছু পদক্ষেপ বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা। বাজেট পেশ করা হয়েছে মাত্র। এই বাজেটের ওপর সংসদের ভেতরে এবং বাইরে ব্যাপক আলোচনা হবে এবং কিছু ভালো সুপারিশও বেড় হয়ে আসবে। বাজেট চূড়ান্তভাবে গৃহীত হওয়ার আগে অর্থনীতির কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, বিশেষ করে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে প্রস্তাবিত বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। শুধু তাই নয়, বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে কিছু প্রণোদনামূলক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন আছে। এ রকম কিছু ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত বাজেটে গৃহীত না হলে বাজেটের মাধ্যমে অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের কাজটি কঠিন হবে।

লেখক : কানাডাপ্রবাসী অর্থনীতি ও ব্যাংক খাত বিশ্লেষক

Nironjankumar_roy@yahoo.com