পেরিমেনোপজ নারীর জীবনের স্বাভাবিক অধ্যায়

ডা. শামসুন নাহার

সহযোগী অধ্যাপক গাইনি বিভাগ ডেলটা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

চেম্বার : আলোক হেলথকেয়ার

নারীর জীবনে কৈশোর, মাতৃত্বের মতোই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো মেনোপজ। তবে মেনোপজের আগে কয়েক বছর ধরে শরীরে যে পরিবর্তনগুলো শুরু হয়, সেই সময়কে বলে পেরিমেনোপজ (Perimenopause)। অনেক নারী এই সময়ের নানা শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন, কারণ তারা বুঝতে পারেন না আসলে কী ঘটছে। অথচ এটি কোনো রোগ নয়, বরং নারীর প্রজননক্ষমতা ধীরে ধীরে শেষ হওয়ার স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া।

পেরিমেনোপজ নারীর জীবনে স্বাভাবিক এবং অনিবার্য অধ্যায়। এটি কোনো অসুস্থতা নয়, বরং শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তনের অংশ। সঠিক তথ্য, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে এই সময়টিকে সহজ ও স্বস্তিদায়ক করা সম্ভব। তাই পেরিমেনোপজ নিয়ে লজ্জা বা ভয় নয়, প্রয়োজন সচেতনতা, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি যতœশীল মনোভাব। সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে পেরিমেনোপজ শুরু হয়, কারও ক্ষেত্রে আরও আগে বা পরে হতে পারে। এ সময়ে ডিম্বাশয়ে ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন হরমোনের উৎপাদন ওঠানামা করতে থাকে, ফলে বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়।

লক্ষণ

সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো মাসিকের অনিয়ম। কারও মাসিক নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে হয়, কারও রক্তক্ষরণ বেশি বা কম হতে পারে। অনেক সময় কয়েক মাস মাসিক বন্ধ থাকার পর আবার শুরু হতে পারে।

এ ছাড়া আরও যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে হঠাৎ শরীরে গরম অনুভব করা বা হট ফ্ল্যাশ, রাতের বেলা অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, ঘুমের সমস্যা, মেজাজের পরিবর্তন, খিটখিটে ভাব বা উদ্বেগ, বিষণœতা বা মন খারাপ অনুভব করা, স্মৃতিশক্তি বা মনোযোগে সাময়িক সমস্যা, ক্লান্তি ও অবসাদ, মাথাব্যথা, যৌন আগ্রহ কমে যাওয়া, যোনিপথে শুষ্কতা, ওজন বৃদ্ধি, পেটের চারপাশে চর্বি জমা, জয়েন্ট বা মাংসপেশিতে ব্যথা, সব নারীর ক্ষেত্রে একই ধরনের লক্ষণ দেখা যায় না। কারও উপসর্গ খুবই হালকা, আবার কারও দৈনন্দিন জীবনে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে।

সচেতনতা জরুরি

নারীরা পেরিমেনোপজ নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে সংকোচবোধ করেন। অনেকেই উপসর্গগুলোকে রোগ ভেবে দুশ্চিন্তায় ভোগেন। আবার কেউ কেউ চিকিৎসার প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও সাহায্য নেন না। পেরিমেনোপজ সম্পর্কে সচেতন থাকলে একজন নারী বুঝতে পারেন যে, এটি বয়সজনিত স্বাভাবিক পরিবর্তন। একই সঙ্গে কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও সহজ হয়।

যা করবেন

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন। খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফলমূল, পূর্ণ শস্য, মাছ, ডাল ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা। ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নিয়মিত ব্যায়াম

নিয়মিত হাঁটা, সাইক্লিং, সাঁতার, যোগব্যায়াম বা হালকা শরীরচর্চা ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং মানসিক চাপ কমায়। পাশাপাশি হৃদরোগ ও অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকিও কমে।

পর্যাপ্ত ঘুম

ঘুমের সমস্যা পেরিমেনোপজের সাধারণ উপসর্গ। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া, ক্যাফেইন কম খাওয়া এবং ঘুমানোর আগে মোবাইল বা স্ক্রিন ব্যবহার সীমিত রাখলে উপকার পাওয়া যায়।

মানসিক স্বাস্থ্যের যতœ

হরমোনের পরিবর্তনের কারণে অনেক নারী বিষণœতায় ভোগেন। পরিবারের সদস্যদের সমর্থন, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা, মেডিটেশন এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন

পেরিমেনোপজ স্বাভাবিক হলেও কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অত্যধিক রক্তক্ষরণ, দীর্ঘদিন মাসিক বন্ধ থাকার পর আবার অস্বাভাবিক রক্তপাত, তীব্র বিষণœতা বা মানসিক অস্থিরতা ঘুমের গুরুতর সমস্যা, দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করে এমন উপসর্গ, প্রয়োজনে চিকিৎসক হরমোন থেরাপি বা অন্যান্য চিকিৎসার পরামর্শ দিতে পারেন।

নারীর প্রস্তুতি

পেরিমেনোপজ কেবল মেনোপজের পূর্ববর্তী সময় নয়; এটি ভবিষ্যৎ সুস্থতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করারও একটি সুযোগ। এই সময় থেকে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষা এবং হৃদ্স্বাস্থ্যের প্রতি যতœশীল হওয়া প্রয়োজন।