কিডনি ক্যানসার নীরব ঘাতক

আপডেট : ১৪ জুন ২০২৬, ০৭:১৯ এএম

ডা. এম এ সামাদ

অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান নেফ্রোলজি বিভাগ আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল

কলেজ হাসপাতাল

প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় বৃহস্পতিবার পালিত হয় বিশ্ব কিডনি ক্যানসার দিবস। এ বছর দিবসটি পালিত হবে ১৮ জুন। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে  ‘করফহবু ঈধহপবৎ ধহফ ঊসড়ঃরড়হধষ ডবষষনবরহম’ বা ‘কিডনি ক্যানসার ও মানসিক সুস্থতা’। এবারের প্রতিপাদ্যের বার্তা হলো কিডনি ক্যানসার শুধু শরীরকেই নয়, রোগীর মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক সম্পর্ক এবং জীবনযাত্রাকেও প্রভাবিত করে। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক সহায়তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো উপসর্গ সৃষ্টি করে না। ফলে অনেক রোগী তখনই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, যখন ক্যানসারটি অনেক দূর এগিয়ে যায়। চিকিৎসকরা কিডনি ক্যানসারকে ‘নীরব ঘাতক’ বলে অভিহিত করেন।

কিডনি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

কিডনি প্রস্রাবের মাধ্যমে এসব বিষাক্ত পদার্থ বের করে দিয়ে রক্ত পরিশোধন করে। কিডনি রক্তের লোহিত রক্ত কণিকা তৈরি করতে সাহায্য করে, হাড় মজবুত রাখে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে, শরীরে পানির সমতা রক্ষা করে। আমাদের শরীরে অনেক ধরনের রাসায়নিক উপাদান যেমন সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, লোহা, পিতল, দস্তা ইত্যাদি নির্দিষ্ট মাত্রায় থাকে। এদের যেকোনো একটির ভারসাম্য নষ্ট হলে আমাদের মৃত্যু হতে পারে। এসব উপাদানের ভারসাম্য রক্ষা করে কিডনি। তাই কিডনি বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি এক বিস্ময়কর অঙ্গ।

কিডনি ক্যানসার কী

কিডনি শরীরের বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে রক্ত পরিশোধন এবং শরীরের তরল ও খনিজের ভারসাম্য ঠিক রাখে। কিডনির কোষগুলো যখন অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বিভাজিত হয়, তখন কিডনি ক্যানসার তৈরি হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায় রেনাল সেল কার্সিনোমা (জবহধষ ঈবষষ ঈধৎপরহড়সধ বা জঈঈ), যা মোট কিডনি ক্যানসারের প্রায় ৮৫-৯০ শতাংশ।

কেন হয়

ধূমপান, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ কিডনির ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বংশগত কারণ বিশেষ করে পরিবারে কিডনি ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি কিছুটা বেড়ে যায়।  জেনেটিক রোগও এর সঙ্গে সম্পর্কিত। যাদের দীর্ঘদিন কিডনি রোগ রয়েছে বা ডায়ালাইসিস নিতে হয়, তাদের মধ্যে কিডনি ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি। রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ থাকলেও এ রকম হতে পারে।

কাদের বেশি হয়

কিডনি ক্যানসার সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। পুরুষদের আক্রান্ত হওয়ার হার নারীদের তুলনায় বেশি। ধূমপায়ী, স্থূলকায় ব্যক্তি, উচ্চ রক্তচাপের রোগী এবং দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা ঝুঁকিতে থাকেন।

কী লক্ষণ

প্রাথমিক পর্যায়ে অধিকাংশ রোগীর কোনো উপসর্গ থাকে না। অনেক সময় অন্য কারণে আলট্রাসনোগ্রাম বা সিটি স্ক্যান করতে গিয়ে কিডনিতে টিউমার ধরা পড়ে। রোগ হলে যে লক্ষণ দেখা দেয়। প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, কোমর বা পিঠের এক পাশে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, পেটের পাশে গুটি বা ফোলা অনুভব হওয়া, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘদিন জ¦র থাকা, ক্লান্তি ও দুর্বলতা, ক্ষুধামান্দ্য, রক্তস্বল্পতা, তবে এসব লক্ষণ অন্য রোগেও হতে পারে। উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

রোগ নির্ণয়

কিডনি ক্যানসার শনাক্ত করতে আলট্রাসনোগ্রাম, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা, প্রয়োজনে বায়োপসি। রোগটি কতটা ছড়িয়েছে নির্ধারণের জন্য অতিরিক্ত পরীক্ষাও করা হতে পারে।

চিকিৎসা

কিডনি ক্যানসারের চিকিৎসা রোগের ধরন, অবস্থান এবং ছড়িয়ে পড়ার মাত্রার ওপর নির্ভর করে।

অস্ত্রোপচার : প্রাথমিক পর্যায়ের কার্যকর চিকিৎসা হলো অস্ত্রোপচার। টিউমার ছোট হলে শুধু আক্রান্ত অংশ অপসারণ করা হয় । বড় টিউমারের ক্ষেত্রে কিডনি অপসারণের প্রয়োজন হতে পারে।

টার্গেটেড থেরাপি : ক্যানসার কোষের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যকে লক্ষ্য করে ওষুধ বর্তমানে কিডনি ক্যানসার চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ইমিউনোথেরাপি : রোগীর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই করার আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি।

রেডিওথেরাপি : সব ক্ষেত্রে ব্যবহার না হলেও ক্যানসার ছড়িয়ে পড়লে বা উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রেডিওথেরাপি দেওয়া হতে পারে।

প্রতিরোধে যা করবেন

ধূমপান ত্যাগ করা। নিয়মিত শরীরচর্চা করা। স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা। রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা। পর্যাপ্ত পানি পান করা ফল, শাকসবজি ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার বেশি খাওয়া। অপ্রয়োজনীয় ব্যথানাশক ওষুধ দীর্ঘদিন ব্যবহার থেকে বিরত থাকা। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো।

প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা না পেলে কিডনি নষ্ট হয়ে যেতে পারে, তখন যদি ডায়ালাইসিস বা কিডনি সংযোজন না করা হয়, তা হলে মৃত্যু অবধারিত। সামান্য মাত্রায়ও যদি ঈকউ থাকে, তবে হৃদরোগের হার সাধারণ মানুষের চেয়ে দশ থেকে শতগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে, তেমনি ব্রেন স্ট্রোকের হারও বেড়ে যায়। এজন্য কিডনি রোগকে বলা হয় ডিজিজ-মাল্টিপ্লায়ার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত