পারিবারিক আদালত

ভুক্তভোগীদের বিড়ম্বনা লাঘব করুন

আমরা জানি, আইন একটি রাষ্ট্র বা সমাজের ভিত্তি, যা মানুষকে নিয়ম ও দায়িত্বের বোধ শেখায়। এটি শুধু শাস্তি বা বিধিনিষেধের বিষয় নয় আইন হচ্ছে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার একটি শক্তিশালী উপায়। বাংলাদেশে ১৯৮৫ সালে পারিবারিক আদালত গঠিত হয় ‘পারিবারিক আদালত অর্ডিন্যান্স’-এর মাধ্যমে। পরে পুরনো সেই অধ্যাদেশটি বাতিল করে ‘পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩’-এর অধীনে পারিবারিক আদালত পরিচালিত হচ্ছে। পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির আইনি ভিত্তি হলো পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩। এই আইনের অধীনে দেশের সব সহকারী জজ আদালত পারিবারিক আদালত হিসেবে গণ্য হয়। তবে এই আদালত গঠনের উদ্দেশ্য যে সফল হয়নি এর সাক্ষ্য বহন করছে ১৪ জুন দেশ রূপান্তরে ‘মামলা মানেই ভোগান্তি’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি।

ওই প্রতিবেদনের গর্ভে যা উঠে এসেছে তা যেন শুধুই বিড়ম্বনা আর বিচার প্রক্রিয়ার মর্মন্তুদ দীর্ঘ উপাখ্যান। একদিকে মামলার স্তূপ, অন্যদিকে ভুক্তভোগীদের হতাশা আর বিচার অনিষ্পন্নের নেতিবাচক প্রভাবের চাপে বহুমুখী বৈরী পরিস্থিতির গাঢ় ছায়া। ওই  প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে আদালত বাড়ানো হয়েছে। তারপরও বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির অবসানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। পারিবারিক বিষয়াদি নিষ্পত্তির জন্য পাঁচটি আপিল আদালতও রয়েছে। বিচারকরা ছুটিতে থাকায় বা পদ শূন্য থাকার কারণে প্রায়ই মামলা বিলম্বিত হয়। অন্যদিকে বিবাদীরা বিচারিক কার্যক্রম দীর্ঘায়িত করতে বারবার সময়ের আবেদন করেন, যা বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির কারণ হয়। একটি মামলা শেষ করতে জীবন থেকে হারিয়ে যায় এক-দুই দশক। বিবাদী পক্ষ উচ্চ আদালতের দোহাই দিয়ে সময়ক্ষেপণ করে এও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।

আমরা জানি, ঢাকা মহানগর আদালতে ই-পারিবারিক আদালতের কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে। এই সেবার মাধ্যমে মামলার দীর্ঘসূত্রতা, অতিরিক্ত খরচ, দূরত্বজনিত সমস্যা, কাগজের নথি ব্যবস্থাপনা, সময়ক্ষেপণ এবং ভিড় ও অপেক্ষার মতো আগের সমস্যাগুলোর সমাধান করাই ছিল মুখ্য উদেশ্য। এ ছাড়া দ্রুত অনলাইন প্রক্রিয়া, ন্যূনতম খরচ, ঘরে বসে সেবা গ্রহণ, ডিজিটাল নথি, সপ্তাহের সাত দিন ২৪ ঘণ্টা রেজিস্ট্রেশন এবং অনলাইন শিডিউলিংয়ের সুবিধা পাওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু তাও কাক্সিক্ষত মাত্রায় দৃশ্যমান নয়। পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ অনুযায়ী দেনমোহর, খোরপোশ, বিবাহ বিচ্ছেদ, নাবালকের জিম্মা ও খোরপোশের মতো বিষয়গুলো মীমাংসা করা যায়। কিন্তু এ ব্যাপারে রয়েছে ভিন্ন মতও। বিশেষজ্ঞদের মতে, কাবিননামার বৈধতা বা বিয়ের সঠিকতা নির্ধারণের মতো বিষয়গুলো নিষ্পত্তিতে আইনটি আরও যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটে আমরা স্মরণ করি যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান, বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনকে। তিনি বলেছিলেন, ‘আইন যতই শক্তিশালী হোক, এর প্রয়োগের ন্যায্যতাই সবচেয়ে বড় বিষয়।’ আমরা মনে করি, আইন-আদালত  হলো সেই মাপদণ্ড, যা রাষ্ট্র-সমাজকে শৃঙ্খলা দেয়। একটি ন্যায়পরায়ণ সমাজ গড়ে উঠে তখনই, যখন আইন শুধু কাগজে নয়, বাস্তবেও কার্যকর হয় এবং বিচারপ্রার্থী যত দ্রুততম সময়ে ন্যায়বিচার পান, এর ওপর।  আইনের প্রয়োগ যদি হয় পক্ষপাতদুষ্ট কিংবা বিচার প্রক্রিয়া যদি দীর্ঘসূত্রতার গন্ডিবদ্ধ হয় তাহলে আইন আর ন্যায়বিচারের বাহন থাকে না। একটি সভ্য সমাজে আইনকে শ্রদ্ধা করা মানেই ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং এজন্য প্রয়োজন আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং দ্রুত বিচারের পথ নিষ্কণ্টক করা।

দেশের বিভিন্ন আদালতে মামলা জট কমাতে ইতিমধ্যে কথা কম হয়নি, রাষ্ট্রশক্তির তরফে অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতিও কম ব্যক্ত হয়নি, কিন্তু এর সুফল মিলছে না প্রত্যাশানুযায়ী। পারিবারিক আদালতও এর বাইরে নয়। পারিবারিক আদালতের সিংহভাগ মামলাই জটিল এবং আবেগঘন। পরিবার একটি প্রতিষ্ঠান এবং পরিবারে শুধু নীতিনৈতিকতার চর্চাই নয়, মমত্বের বন্ধনটা গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে যখন জটিলতার সৃষ্টি হয় এবং ভুক্তভোগীকে যেতে হয় আদালত পর্যন্ত এর মর্মবেদনা খুব কঠিন। আমরা আশা করব, সংবেদনশীলতা-অধিকারের ন্যায্যতা-দ্রুত বিচারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতির বৃত্তাবদ্ধ না রেখে এর কার্যকারিতা দৃশ্যমান করা উচিত।