সীমান্তে প্রতিবেশীর নীতিবহির্ভূত আচরণ

দেশের অনেক মানুষ মেতে আছে বিশ্বকাপ ফুটবলকে নিয়ে, বস্তুত বিশকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না থাকলেও ফুটবলপ্রেমীদের উত্তেজনা দেশের আনাচে-কানাচে দৃশ্যমান। বাজেট, ক্রিকেট আর ইসলামী ব্যাংক নিয়ে মেতে আছে আরেক দল মানুষ। এমন এক প্রেক্ষাপটে অনেকটা নীরবে নিভৃতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ভারত-বাংলাদেশ ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন, যে সম্মেলন সীমান্তে নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, অভিন্ন নদী অববাহিকার পরিবেশ এমনকি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাও বহুলাংশে নির্ভর করে। বিশেষত ভারতের সঙ্গে সীমান্ত ভাগাভাগি করা এদেশের মোট ৬৪ জেলার প্রায় অর্ধেক জেলায় বসবাসকারী কোটি কোটি মানুষের স্বার্থ এই সীমান্তে নিরাপত্তা ও সুস্থ ব্যবস্থাপনার ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল।

বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ’ (বিজিবি) ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ‘বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স’ (বিএসএফ) প্রধানদের নেতৃত্বে চার দিন ধরে চলা ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন ১১ জুন ২০২৬ ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শেষ হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ৫৫ বছরের ইতিহাসে এবারের সম্মেলন নানা কারণে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিশেষত বাংলাদেশে বিএনপির নেতৃত্বে সরকার ক্ষমতায়ন এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের ক্ষমতা চর্চাকে রুখে দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারে আধিপত্য বিস্তার করা ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিজয় এবং বিজয়-পরবর্তী সময় পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যকার সীমান্তে নানা বিষয়ে সৃষ্ট উত্তেজনার কারণে এই সম্মেলনের দিকে নজর ছিল সচেতন মহলের। তবে কাকতালীয় হলেও অবাক করা বিষয় হলো, ১২ তারিখে যখন এই লেখা লিখছি তখন টেলিভিশনে অন্যান্য খবরের পাশে দৃশ্যমান হচ্ছিল তিনটি খবর। প্রথমত : বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনারের আগমন। দ্বিতীয়ত : সীমান্তে অব্যাহত রয়েছে ভারতের পক্ষ থেকে পুশইন এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তা প্রতিহত করার প্রচেষ্টা। তৃতীয়ত : বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া সীমান্তে মুজিব আলী (২০) নামের একজন বাংলাদেশি তরুণ নিহত হওয়ার খবর, যার মৃতদেহও নিয়ে গেছে বিএসএফ। সেখানে আরও কয়েকজন আহত হয়েছে তা কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমের দাবি।

অন্যদিকে ১১ জুন সীমান্ত বৈঠক শেষ হওয়ার পর বরাবরের মতো একটি যৌথ আলোচনার দলিল স্বাক্ষরিত হয়। তবে ঐতিহ্য মেনে এবারই প্রথম যৌথ সংবাদ সম্মেলন পরিহার করা হয়েছে, যা বেশ ইঙ্গিতবহ মর্মে সমালোচিত হচ্ছে। উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে স্বনামে বা নাম গোপন রাখার শর্তে ৪টি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে মর্মে নিশ্চিত করেছেন। প্রথমত, বাংলাদেশ সীমান্তে অনাকাক্সিক্ষত প্রাণহানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক সময়ে উত্তেজনা ছড়ানো অবৈধ অনুপ্রবেশ ও পুশইন বিষয়ে বাংলাদেশ তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। আর ভারত উদ্বেগ জানিয়েছে অবৈধ অভিবাসন ও সীমান্ত অতিক্রম নিয়ে। তৃতীয়ত, সীমান্ত অপরাধ তথা মানব পাচার ও চোরাচালান রোধ এবং কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের ক্ষেত্রে জটিলতা নিরসনে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা ও সম্মতি হয়েছে। কেউ কেউ আবার যৌথভাবে টহল বা অভিযান পরিচালনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও ইঙ্গিত করেন। চতুর্থত, উভয় দেশ সীমান্তে নিরাপত্তা বৃদ্ধি ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার বিষয়েও একমত হয়েছে। এমন বহু বিষয়ে আগেও বহুবার আলোচনা ও সমঝোতা হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগের হার ছিল হতাশাব্যঞ্জক।

একটি বিশাল ভূখণ্ড হিসেবে ভারতের সীমান্ত রয়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, চীন, নেপাল, মিয়ানমার, ভুটান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে। এর মধ্যে সীমান্তে নিরীহ গ্রামবাসী এমনকি নারী ও শিশু হত্যার ঘটনা কেবল বাংলাদেশের সীমান্তেই ঘটে, যা দুর্ভাগ্য ও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের প্রায় চারদিকেই ভারতীয় সীমান্ত। এসব সীমান্ত সমতলভূমি, পাহাড়, বন-জঙ্গল, নদী ও সাগরের জলরাশি বিস্তৃত। ফলে সমতল ভূমি ছাড়া অন্যান্য স্থানে দুই দেশের সীমানা সুনির্দিষ্ট করা প্রায় অসম্ভব। এমন বহু জনপদ আছে যেখানে একটি বাড়ির বসতভিটা সীমান্তের একদিকে আর রান্নাঘর অপরদিকে। গাছের গোড়া এক দেশে আর পাকা ফল ঝরে পড়ে অন্য দেশে। পাহাড় ও বন এলাকায় সীমান্ত পিলার জঙ্গলে ঢেকে যায়। এসব ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সীমারেখা মেনে চলা বাস্তবসম্মত নয়। বলা চলে পাহাড়, নদী, সাগর ও জঙ্গলে তা মেনে চলা দুঃসাধ্য। তবে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সমঝোতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনাও সম্ভব। বাংলাদেশ একটি জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে তেমনটাই প্রত্যাশা করে তার গণতান্ত্রিক প্রতিবেশী ভারতের কাছে ।

ভারত ও বাংলাদেশের সামনে এখন বড় বিষয় হয়ে আসবে চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাওয়া গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা। একই সঙ্গে তিস্তা, ফেনী, গোমতিসহ সব অভিন্ন নদীর পানি প্রবাহের সঠিক হিসাব নির্ধারণ করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। নানা রকম ইস্যু কেন্দ্র করে উত্তেজনা বজায় রেখে পানিসংক্রান্ত আলোচনায় বসা অতঃপর সীমান্ত সমস্যার ক্ষেত্রে সাময়িক ছাড় এবং তার বিনিময়ে অভিন্ন নদীর পানির বণ্টনের ক্ষেত্রে অনড় থাকার বিষয়টি সামনে চলে আসাও বিচিত্র নয়। তাই বাংলাদেশকে দ্রুত এই বিষয়ে পাল্টা পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে এবং সেই মোতাবেক সীমান্ত নিরাপত্তার কৌশলও সাজাতে হবে। বাংলাদেশ বরাবরই তথ্য-উপাত্ত ও প্রামাণ্য দলিল উত্থাপনের ক্ষেত্রে দুর্বলতা দেখিয়েছে বলে একাধিক আন্তর্জাতিক সমঝোতায় প্রাপ্য হিসাব বা সুবিধা আদায় করতে পারেনি। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের এই যুগেও এমন দুর্বলতার পুনরাবৃত্তি হবে অগ্রহণযোগ্য।

বাংলাদেশের তিন দিকে তিনটি রাজ্য তথা পূর্বে ত্রিপুরা, উত্তরে আসাম ও পশ্চিমে পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) রাজ্য সরকার গঠন করেছ। কেন্দ্রেও আছে বিজেপি সরকার। এখন আর কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের মধ্যে অমিলের অজুহাতে সীমান্তের উত্তেজনা ও অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য প্রবাহ আটকানোর সুযোগ নেই। আশার কথা, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ১২ জুন, বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্ত সড়ক দিয়ে হেঁটে বাংলাদেশের মাটিতে প্রবেশ করেছেন। তিনি মোটামুটি বাংলায় কথা বলতে পারেন। বাংলাদেশে দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের রেলমন্ত্রী ছিলেন এবং বর্তমানে ক্ষমতাশীল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) একজন শীর্ষ নেতা হিসেবে সুনাম আছে তার। বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে প্রথামাফিক পেশাগত কূটনীতিবিদদের পরিবর্তে একজন ঝানু রাজনীতিবিদকে নিয়োগ নানা মহলে ব্যাপক আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। অপ্রিয় শোনালেও কঠিন বাস্তবতা হলো, বর্তমানে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত অন্যতম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থেকে তৃণমূল পর্যায়ের বহু নেতাকর্মী ভারতে অবস্থান করছেন। এসব নেতাকর্মী শর্তসাপেক্ষে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন বলেও আলোচনায় এসেছে। এই আলোচনার সূত্র ধরেই বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে আবারও আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়। ১২ জুন সীমান্ত অতিক্রমের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে তাৎক্ষণিক কথাবার্তায় তিনি উভয় দেশের ‘একই আকাশ, একই বাতাস, একই যন্ত্রণা’র কথা বলেছেন, যা আশা জাগানিয়া। তিনি আরও বলেছেন, ভারতের ১৪০ কোটি আর বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষ মিলে ১৬০ কোটি মানুষের একটি বড় অর্থনৈতিক শক্তি হতে পারে। উল্লেখ্য, আশির দশকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নিয়ে ‘সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কো-অপারেশন’ (সার্ক) গঠনের সময় বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি এসব দেশগুলোর সব জনসংখ্যার কথা উল্লেখ করে আরও বড় অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু ভারতের অসহযোগিতায় তা এগিয়ে যেতে পারেনি বলে কূটনৈতিক মহলে গুঞ্জন আছে ।

সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান ও আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য পুত্র তারেক রহমান বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারপ্রধান। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বৈদেশিক সফর হিসেবে চীনে যাওয়ার ঠিক দুই সপ্তাহ আগে ঝানু রাজনীতিবিদ ও বর্তমানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলেছেন মর্মে গুঞ্জন উঠেছে। তিনি দুই দেশের মোট ১৬০ কোটি মানুষের মঙ্গলের জন্য সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দুই দেশের গণতন্ত্রের প্রতি ইঙ্গিত করে উভয় দেশের গণতন্ত্র মিলে বিশ্বের বুকে বড় শক্তি গড়ার আভাসও দিয়েছেন। তবে তার এসব কথা মøান করে দিয়েছে ঠিক একই সময়ে কুলাউড়া সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা ও বিএসএফের লাশ নিয়ে যাওয়ার ঘটনা। তাই বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বিশেষত সীমান্ত সুরক্ষা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপের এখনই সময়।

ভুলে গেলে চলবে না, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সীমান্ত হত্যা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছিল। তারপরও গুলিবিদ্ধ হয়ে সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলে থাকা নিহত কিশোরী ফেলানীর ঢাকার কূটনৈতিকপাড়ায় একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে, যে সড়ক দিয়েই নতুন হাইকমিশনারকে অফিসে যেতে হবে। তাই কেবল আশার বাণী নয়, ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক বিশেষত্ব নিরাপদ ও সুরক্ষিত সীমান্ত নিশ্চিত করা তথা সীমান্ত নিরাপত্তাহীনতা নিরসনের ক্ষেত্রে দীনেশ ত্রিদেবী তৃতীয়মাত্রা যোগ করবেন, এমনটাই প্রত্যাশা।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত মেজর ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

directoradmin2007@gmail.com