একসময় দৌলতপুর বাজারের বান্দা ঘাটে ‘কালিমাতা বস্ত্রালয়’ নামে একটি কাপড়ের দোকান ছিল। সেই দোকানটি এখন আর নেই। শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রি-পিস ও বিভিন্ন রেডিমেড পোশাকের জন্য সুপরিচিত এই দোকানটি ভৈরব নদ গ্রাস করে নিয়েছে অনেক বছর আগেই। শুধু কালিমাতা বস্ত্রালয়ই নয়, বান্দা ঘাটের বিসমিল্লাহ হলুদের মিলটিও চার বছর আগে মিশে গেছে নদের সঙ্গে। পেঁয়াজ ঘাটের মালেক মিয়ার চা দোকানের সেই জমজমাট আড্ডাও আজ আর নেই। দুই বছর আগে ভৈরব ভেঙে নিয়ে গেছে সেই চায়ের আড্ডার জায়গাটিও।
এভাবে রাক্ষুসে ভৈরব নদগর্ভে একে একে বিলীন হয়েছে মালেকের মুদি দোকান, করিমের আড়ত এবং মান্নান ও আজিজুলের তেলের আড়তসহ আরও দশটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ভৈরবের ক্রমাগত ভাঙনে দৌলতপুর বাজারের এই ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাকেন্দ্রগুলো আজ কেবলই স্মৃতি। নদভাঙনের শিকার হয়ে অনেক ব্যবসায়ী হারিয়েছেন তাদের জীবিকা, নিঃস্ব হয়েছেন অনেকেই। এক সময়ের ব্যস্ত ও মুখরিত ঘাটগুলো এখন নদগর্ভে বিলীন হয়ে জনশূন্য খাঁ খাঁ প্রান্তরে পরিণত হয়েছে।
ভৈরবের অব্যাহত ভাঙনে খুলনার অন্যতম প্রধান ও ঐতিহ্যবাহী দৌলতপুর বাজারের মসলাপট্টি, ঝালপট্টি, চুড়িপট্টি ও কাপড়পট্টির অন্তত ১০০ দোকান ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই নদের তীব্র স্রোতে বাজারের বিস্তীর্ণ এলাকা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আতঙ্কে দিন পার করছেন নদী তীরবর্তী শত শত ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দা। তারা দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও ভাঙনরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, দৌলতপুর বাজারের ঘাটসংলগ্ন এলাকার একাধিক আড়ত, গুদাম ও দোকানপাটের ভিত্তিমূল দুর্বল হয়ে পড়েছে। ভৈরবের প্রবল স্রোত সরাসরি তীরের স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানছে। অনেক ব্যবসায়ী নিজ উদ্যোগে দোকানের মালামাল অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। ভৈরব নদের পানিবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তীরের মাটি ধসে পড়তে শুরু করেছে। দৌলতপুর বাজারের বান্দা ঘাটে ছোট একটি দোকান ভাড়া নিয়ে মাছের খাবার বিক্রি করেন রেজাউল ইসলাম। আক্ষেপের সঙ্গে রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘যেভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে তাতে আর কতদিন এখানে থাকতে পারব জানি না, ছোটবেলায় দেখেছি এই জায়গায় কালিমাতা বস্ত্রালয়ের বিশাল দোতলা দোকান ছিল। এখন আমার দোকানটিও ভাঙনের মুখে পড়েছে।’
পেঁয়াজ ঘাটের দত্ত হার্ডওয়্যারের মালিক শুভজিৎ দত্ত বলেন, আমার দোকানটি ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পেছনের রুমটি বাঁশের খুঁটি দিয়ে কোনোমতে টিকিয়ে রাখছি। জোয়ার এলে ভয় লাগে। যে কোনো সময় আমার দোকান ভেসে যেতে পারে। আমার পাশে আবুলের হোটেল ও নাসির স্টোরেও জোয়ারের জল আসে। আমরা আপনাদের সহযোগিতা চাই। এ কে ইদ্রিস ট্রেডার্সের শ্যামল দাস বলেন, বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের জল দোকানের ভেতরে চলে আসে। রাতে মাঝে মধ্যে ডিউটি করতে হয়। আমরা খুবই সংকটে আছে। শুনেছি শহররক্ষা বাঁধ হবে। তবে তা কবে হবে জানি না।
ভৈরব নদ তীরবর্তী তিনতলা বাড়িতে বসবাস করেন দৌলতপুর বাজার বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুল হামিদ। ভৈরবের তীব্র স্রোতে তার বাড়িটি এক দিকে হেলে পড়েছে। চার বছর আগে তার দুটি দোকান জোয়ারে ভেসে গেছে। তিনি বলেন, এখন সমবায় সমিতির অফিসটিও ঝুঁকিতে রয়েছে। দৌলতপুর বাজার রক্ষায় প্রশাসন তৎপর না হলে অচিরেই আমার বাড়িও ভেঙে যাবে।
দৌলতপুর থানা জুয়েলারি সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিশিষ্ট স্বর্ণ ব্যবসায়ী অশোক কুমার কর বলেন, দীর্ঘদিন পরিকল্পনা চলছে জার্মান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (কেএফডব্লিউ) অর্থায়নে খুলনা সিটি করপোরেশনের অধীনে দৌলতপুর ও মহেশ^রপাশা এলাকায় নদভাঙন প্রতিরোধ ও আকস্মিক বন্যা থেকে শহরকে রক্ষার জন্য টেকসই বাঁধ ও রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ করা হবে। বাঁধের ওপর মানুষের চলাচলের জন্য ওয়াকওয়ে তৈরি করা হবে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ দেওয়ার আগেই দৌলতপুর বাজারের অনেক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।
দৌলতপুর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি শেখ আসলাম বলেন, ভৈরবের ভাঙনে দৌলতপুর বাজার ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই বাজার রক্ষায় খুলনা সিটি করপোরেশন ইতিমধ্যে সার্ভে পরিচালনা করেছে। এটা খুব তাড়াতাড়ি টেন্ডারের আওতায় আসবে। পাঁচ নম্বর ঘাটের আলোকে টেকসই বাঁধ ও রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ করা হবে। সেই সঙ্গে দৌলতপুর খেয়াঘাটের সম্প্রসারণ করা হবে।
খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, দৌলতপুর বাজারের নদভাঙনের সমস্যা দীর্ঘদিনের। আমি এই জায়গা পরিদর্শন করেছি। আমরা নাগরিকদের পরিষেবা ও জীবনমান উন্নয়নে সব সময় কাজ করছি। জার্মান সরকারের অর্থায়নে খুলনা সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে দৌলতপুর ও মহেশ^রপাশা এলাকায় শহররক্ষা বাঁধের পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।