মানবিক সমাজ নির্মাণের পূর্বশর্ত

জার্মান বংশোদ্ভূত মার্কিন বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের বিখ্যাত একটি উক্তি স্মরণযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, ‘এই পৃথিবী বসবাসের জন্য একটি বিপজ্জনক জায়গা; যারা খারাপ কাজ করে তাদের জন্য নয়, বরং যারা খারাপ কাজের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয় না তাদের জন্য’। অনেক সময় নিজেরা আক্রান্ত না হলে, ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হলে কিংবা বিপদ আমাদের দরজায় এসে না দাঁড়ালে আমরা অন্যের কষ্ট, নিপীড়ন বা বঞ্চনার গভীরতা উপলব্ধি করতে পারি না। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি এক ধরনের আত্মকেন্দ্রিক অনুভূতিশূন্যতা, যেখানে ব্যক্তি নিজের নিরাপত্তা, সুবিধা ও স্বার্থের গণ্ডির বাইরে দেখতে শেখে না। ফলে সমাজের অন্য কারও ওপর নির্যাতন নেমে এলে সেটিকে সে নিজের সমস্যা বলে মনে করে না। এই প্রবণতা ধীরে ধীরে নাগরিক চেতনাকে দুর্বল করে দেয় এবং মানুষকে এমন এক মানসিক অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়, বরং নীরবতাই নিরাপদ কৌশল হিসেবে বিবেচিত হয়। এই নীরবতা কখনোই নিরপেক্ষ নয়।

সমাজবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, যখন একটি সমাজে মানুষ বারবার অন্যায় প্রত্যক্ষ করেও প্রতিক্রিয়া জানায় না, তখন সেই সমাজে অন্যায় একটি ‘স্বাভাবিক সামাজিক বাস্তবতা’ হিসেবে জায়গা করে নেয়। ধর্ষণ, হত্যা, রাহাজানি, চাঁদাবাজি, জবরদখল, ঘুষ বা দুর্নীতির মতো অপরাধগুলো তখন বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকে না; বরং এগুলো ধীরে ধীরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে রূপ নেয়। ভাষাতাত্ত্বিকভাবেও লক্ষ করা যায়, দীর্ঘদিন ধরে কোনো অনৈতিক আচরণ চলতে থাকলে মানুষ সেটিকে আর ‘অপরাধ’ মনে করে না, বরং ‘এটাই বাস্তবতা’, ‘এভাবেই চলে’, ‘এটাই নিয়ম’ কিংবা ‘কিছু করার নেই’ এ ধরনের অভিব্যক্তিতে তাকে বৈধতা দিতে শুরু করে। অর্থাৎ অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি শুধু রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই নয়, মানুষের ভাষা, চিন্তা ও নৈতিক বোধকেও দূষিত করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো সমাজ একদিনে অমানবিক হয়ে ওঠে না। অন্যায়কারীর শক্তি যতটা ভয়ংকর, তার চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে সাধারণ মানুষের দীর্ঘস্থায়ী নীরবতা। জার্মান দার্শনিক হান্না আরেন্ট তার ‘খারাপের স্বাভাবিকতা’  ধারণায় দেখিয়েছিলেন, ভয়াবহ অন্যায় অনেক সময় কেবল নিষ্ঠুর ব্যক্তিদের কারণে নয়, বরং সাধারণ মানুষের অভ্যস্ত উদাসীনতার কারণেও বিস্তার লাভ করে। মানুষ যখন অন্যায়ের দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন বিবেক ধীরে ধীরে অসাড় হয়ে পড়ে। ফলে সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নৈতিক সাহস হারিয়ে যায়, আর নীরবতা একসময় সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা মানে অনেক সময় প্রত্যক্ষভাবে নয়, কিন্তু পরোক্ষভাবে অন্যায়ের পক্ষেই অবস্থান নেওয়া। কারণ অপরাধ তখনই বিস্তার লাভ করে, যখন তা প্রতিরোধহীন পরিবেশ পায়। সমাজবিজ্ঞানে এটিকে ‘বিচ্যুতির স্বাভাবিকীকরণ’ বলা হয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অনিয়ম ও অপরাধকে সহ্য করতে করতে মানুষ সেটিকে স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিতে শুরু করে। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের একার দায়িত্ব নয়; এটি সমাজের সামগ্রিক নৈতিক সুস্থতা ও মানবিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য একটি সম্মিলিত সামাজিক কর্তব্য। ন্যায়বিচার কেবল আদালতের রায়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না; এটি প্রতিষ্ঠিত হয় মানুষের বিবেক, সামাজিক সংহতি, পারস্পরিক দায়বদ্ধতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে। সত্য ও ন্যায়ের ধারণা তখনই জীবন্ত থাকে, যখন একটি সমাজের মানুষ সম্মিলিতভাবে তা ধারণ করে, লালন করে এবং প্রয়োজনে তা রক্ষার জন্য সাহসিকতার সঙ্গে দাঁড়ায়। ইতিহাস ও সামাজিক বাস্তবতা বারবার প্রমাণ করেছে, অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা কখনোই দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। বরং বিচারহীনতা যখন সমাজে প্রতিষ্ঠা পায়, তখন তা ক্রমে সবার জীবনেই অনিশ্চয়তা তৈরি করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো, যে সমাজে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে দাঁড়ায় না, সেখানে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অপরাধ ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়।

সামষ্টিক কল্যাণ, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে এখানেই সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তির গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। সমালোচনামূলক চিন্তা মানুষকে কেবল তথ্য গ্রহণ করতে শেখায় না; বরং তথ্যকে যাচাই করতে, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে, প্রচলিত অন্যায়কে বিশ্লেষণ করতে এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয় করতে শেখায়। এই চিন্তাশক্তিই মানুষকে শেখায় কীভাবে অন্যায়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ক্ষমতার কাঠামোকে চিহ্নিত করতে হয়, কীভাবে প্রভাবিত জনমতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সত্য উচ্চারণ করতে হয়, এবং কীভাবে যুক্তি, নৈতিকতা ও মানবিকতার ভিত্তিতে সামাজিক অবস্থান গড়ে তুলতে হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও দর্শনের আলোচনায় বারবার বলা হয়েছে, গণতন্ত্র কেবল অংশগ্রহণমূলক ভোটের ব্যবস্থার নাম নয়; এটি মূলত সচেতন, সমালোচনামূলক ও দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া। যে সমাজে মানুষ প্রশ্ন করতে ভয় পায়, সেখানে ধীরে ধীরে অন্ধ আনুগত্য, গুজবনির্ভর আবেগ, দলীয় বিভাজন এবং ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তখন সত্যকে বিকৃত করা সহজ হয়, অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া সহজ হয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারও স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়। সমালোচনামূলক বোধ মানুষকে শুধু প্রতিবাদী করে না; বরং তার বুদ্ধি ও উপলব্ধিকে শাণিত করে, তাকে দায়িত্বশীল, সচেতন ও মানবিক নাগরিক হিসেবেও গড়ে তোলে। এই বোধই মানুষকে শেখায় যে ন্যায়বিচার কেবল নিজের জন্য দাবি করার বিষয় নয়; বরং অন্যের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নেও দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার নাম। যে সমাজে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে শেখে, সেই সমাজই শেষ পর্যন্ত ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ ও মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণে সক্ষম হয়। তাই ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কল্যাণমুখী রাষ্ট্রবির্নিমাণই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।

mahruf.shohel@yahoo.co.uk