সেন্ট মার্টিনে জীবন-জীবিকার সংকট

বিপন্নদের জন্য চাই আপৎকালীন ব্যবস্থা

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ১১:১৩ পিএম

দেশের তো বটেই, বিদেশি পর্যটকদের কাছেও এই প্রবাল দ্বীপটির আকর্ষণ  তুলনারহিত। বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত উত্তর-দক্ষিণে লম্বা প্রায় ৮ বর্গকিলোমিটারের দ্বীপটি নারিকেল জিঞ্জিরা, নারকেল জিঞ্জিরা, জিঞ্জিরা, জাজিরা, দেরদিউসা দ্বীপ নামেও পরিচিত। এ দ্বীপের তিন দিকের ভিত শিলা যা জোয়ারের সময় তলিয়ে যায় এবং ভাটার সময় জেগে ওঠে এগুলো ধরলে এর আয়তন হবে প্রায় ১০-১৫ বর্গকিলোমিটার। আমরা জানি, সেন্ট মার্টিন দ্বীপে প্রায় ৬৬ প্রজাতির প্রবাল, ১৮৭ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ১৫৩ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ১৫৭ প্রজাতির গুপ্তজীবী উদ্ভিদ, ২৪০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, ৪ প্রজাতির উভচর ও ১২০ প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়। এত বৈচিত্র্যের সমাহার যেখানে তা পর্যটনের জন্য আকর্ষণীয় হবে এটাই স্বাভাবিক।

১৫ জুন দেশ রূপান্তরে ‘সৌন্দর্যের আড়ালে হাহাকার ১০ হাজার মানুষের’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সেন্ট মার্টিনের যে চিত্র উঠে এসেছে তা সেখানকার অধিবাসীদের জীবন-জীবিকার মর্মস্পর্শী উপাখ্যান। পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের ৯ মাসের দীর্ঘমেয়াদি পর্যটন নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে। সাগরে মাছ ধরার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলেও পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারের আরাকান আর্মির হাতে অপহরণ ভয়ে সাগরে মাছ ধরতে  যাচ্ছেন না জেলেরা, ওই প্রতিবেদনে এও বলা হয়েছে। এর ফলে  প্রায় ১০ হাজার মানুষের আয়ের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়েছে । সেখানকার মানুষের মাছ ধরা ছাড়া বিকল্প কর্মসংস্থানের অবকাশ খুব ক্ষীণ। যেহেতু পর্যটন নিষেধাজ্ঞা বিদ্যমান সেহেতু পর্যটনকেন্দ্রিক আয় রোজগারের পথও বন্ধ। পর্যটন স্থবিরতা ও আয়ের উৎস বন্ধ হওয়ায় দ্বীপবাসীর মধ্যে হাহাকার তৈরি হয়েছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে একদিকে শ্রমজীবীদের জীবিকায় অন্যদিকে দুই শতাধিক হোটেল, মোটেল, কটেজ ও রেস্তোরাঁ ব্যাবসায়। হোটেল, মোটেল, কটেজ ও রেস্তোরাঁর সঙ্গেও যুক্ত অনেক কর্মজীবী মানুষ। এগুলো এখন তালাবদ্ধ থাকায় এবং মাছ ধরার পথ কণ্টকাকীর্ণ হওয়ায় দ্বীপজুড়ে জীবিকা নির্বাহ কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়েছে। সেখানে বসবাসকারী প্রায় ১০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার যুদ্ধ বড় বেশি অমানবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হোটেল কর্মচারী, ট্যুর গাইড, ডাব বিক্রেতা, নৌযান শ্রমিক, ভ্যানচালক, ক্ষুদ্র বা হোটেল, মোটেল, কটেজ ও রেস্তোরাঁ ব্যাবসায়ীদের আগে পর্যটন মৌসুমে ৬ মাস পর্যটক আসায় যে আয় হতো তা দিয়ে বছরের বাকি সময় তাদের সংসার চলে যেত, যা এখন যেন শুধু গল্পের মতো। আমরা জানি, সেন্টমার্টিনের স্থানীয় অর্থনীতির মূল শক্তি পর্যটন। আমরা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার বিষয়টিকে নিশ্চয় গুরুত্ব দিই কিন্তু একই সঙ্গে এ প্রশ্নও রাখি, যেহেতু সেখানকার অধিবাসীদের জীবন-জীবিকার বিষয়টি একেবারে সুনির্দিষ্ট সেহেতু সরকারের তরফে তাদের জীবিকার বিকল্প যথেষ্টভাবে নিশ্চিত করা হয়নি কেন? যোগাযোগব্যবস্থার কারণে জিনিসপত্রের দামও সেখানে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। কেন সেন্ট মার্টিনবাসীর জন্য সরকারি বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার ব্যাপারে যথাযথ আগাম পরিকল্পনা করা হয়নি?

সেন্ট মার্টিনের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেশ রূপান্তর-এর প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন, সেন্টমার্টিনে পর্যটন সীমিত করার ফলে তৈরি হওয়া বেকারত্ব দূর করতে স্থানীয়দের জন্য  মাশরুম, সবজি চাষ, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন এবং নারীদের জন্য সেলাই ও হস্তশিল্পের মতো বিকল্প আয়ের প্রশিক্ষণ ও সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। দূরবর্তী পরিকল্পনা দিয়ে কি ক্ষুধা নিবারণ নিরসন করা সম্ভব? আমরা মনে করি, বিপন্ন-বিপর্যস্ত কর্মহীন সেন্ট মার্টিনবাসীর জন্য আপৎকালীন  সংকট বা দুর্যোগ মোকাবিলায় গৃহীত তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া বাঞ্ছনীয়। পেশা ও অবস্থানগত দিকগুলো নির্ণয় করে তাদের বিকল্প ব্যবস্থা  নিশ্চিত করা সরকারের দায় ও দায়িত্ব। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যর সুরক্ষা তো মানুষকে অনাহারী বা উপবাসী রেখে হতে পারে না। সেন্ট মার্টিনের অবস্থান মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এবং সাগরবক্ষে হলেও সেখানকার নাগরিকরা দেশের সব নাগরিকের মতো পূর্ণ অধিকার ভোগ করে জীবনযাপন করবেন তাতে কারোর কোনো ভিন্নমত প্রকাশের অবকাশ নেই। দ্রুত এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে। এও মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, সেখান থেকে সিংহভাগ মানুষের পক্ষেই উখিয়া কিংবা কক্সবাজারে গিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব নয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত