সর্বাঙ্গে বিষ পিঁপড়ার কামড়

চিকিৎসকরা বলেন, বিষ পিঁপড়ার কামড়ে শরীরে ফরমিক অ্যাসিড ও বিষাক্ত প্রোটিন প্রবেশ করায় তীব্র জ্বালাপোড়া, চুলকানি ও লালচে ফুসকুড়ি হয়। পুরো শরীরে কামড় দিলে ত্বকে অস্বস্তি বোধ হয় ও বিষের প্রভাব স্বাস্থ্যর জন্য কখনো কখনো চরম বিরূপ প্রভাবও ফেলে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের অবস্থা যেন হয়ে দাঁড়িয়েছে তা-ই। ১৪ জুন ‘তহবিলে ধস বেতনে উৎসব’ শিরোনামে দেশ রূপান্তর-এর শীর্ষ প্রতিবেদনে ফের বিমানের ভেতরকার বিবর্ণ চিত্র উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিমান সংবাদমাধ্যমে নেতিবাচক অর্থে শিরোনাম হয়ে আসছে। দেশ রূপান্তর-এর ওই প্রতিবেদনে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটির ভেতরের যে চিত্র  তুলে ধরা হয়েছে তাতে প্রতীয়মান হয় বিমান যেন ‘সোনার ডিমপাড়া হাঁস’।  

‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ হলো ঈশপের বিখ্যাত একটি নীতিমূলক গল্প। আমরা জানি, ঈশপ ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন কিংবদন্তি গল্পকার ও ক্রীতদাস। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে তিনি পশুপাখি ও কাল্পনিক চরিত্রের মাধ্যমে ছোট ছোট শিক্ষণীয় গল্প বা উপকথা প্রচার করেন, যা বিশ্বজুড়ে ‘ঈশপের গল্প’ নামে পরিচিত। এক লোভী কৃষকের একটি হাঁস ছিল যা প্রতিদিন একটি করে সোনার ডিম পাড়ত। কিন্তু একসঙ্গে সব ডিম পাওয়ার লোভে সে হাঁসটিকে মেরে ফেলে। এর ফলে সে তার আয়ের স্থায়ী উৎস হারিয়ে ফেলে এবং অনুশোচনায় ভোগে। গল্পের মূল শিক্ষা গল্পটির মাধ্যমে  লোভ সংবরণ করা। একসঙ্গে সব পাওয়ার অদূরদর্শী লোভের কারণে মানুষ যা অর্জন করে, তাও হারাতে পারে। এই প্রবাদের ব্যবহার বাস্তব জীবনে কোনো লাভজনক উৎস বা স্থায়ী আয়ের পথ রাতারাতি ধ্বংস করাকে ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস মেরে ফেলা’ প্রবাদের সাহায্যে রূপক অর্থে বোঝানো হয়।

দেশ রূপান্তর-এর ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস লিমিটেড বিভিন্ন সময় মুনাফা করার কথা বললেও তাদের বিপুল দেনার কথা উল্লেখ করে না। কার্যত লোকসানি এই প্রতিষ্ঠান ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি দেনা রেখে ৯৩৭ কোটি টাকার মুনাফা ঘোষণা করে। এদিকে আয় না বাড়লেও নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যেই হঠাৎ গত মাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা হয় প্রায় ১৮৫ শতাংশ। এমনকি চেয়ারম্যান, প্রধান নির্বাহীসহ কয়েকজন বড় কর্তার বেতন কয়েকগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে বছরে ১০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়বে সংস্থাটির। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার বিমানকে লাভজনক করতে না পারলেও প্রায় ৩ হাজার ৬শ কোটি টাকার ফান্ড রেখে যায়। গত চার মাসে সেই ফান্ড ১২শ কোটিতে নেমেছে।’ এখানেই শেষ নয়। ক্রমাগত বিমানের ফান্ড নিম্নমুখী হওয়া, বেতন বৃদ্ধির প্রক্রিয়া, শীর্ষ কর্তাদের বেতন কাঠামো, ঊর্ধ্বতনদের বেতন নিয়ে ক্ষোভ, ৬শ কোটি টাকার রাজস্ব হাতছাড়া, ১৪টি নতুন বোয়িং কেনার চুক্তি ইত্যাদি উপশিরোনামে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে সেগুলোর মর্মার্থ প্রীতিকর নয়।

২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর ‘বিমানের কেবিন ক্রু নিয়োগে অনিয়ম, বেশি পদ সৃষ্টি’ শিরোনামে একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকের প্রতিবেদনে যে তথ্য মেলে তাতেও দেখা যায় কদাচারের থোক থোক ছাপ। ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিজ্ঞপ্তিতে প্রথমে ৫০ জনের কথা বলা হলেও পরে সেটি সংশোধন করে ১০০ জন করা হয় এবং  চূড়ান্তভাবে আরও একজন বাড়িয়ে মোট ১০১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। শারীরিক মাপদণ্ড পূরণ না হওয়া প্রার্থী যেমন নিয়োগ পেয়েছেন, তেমনি অবিবাহিত হওয়ার শর্ত থাকলেও বিবাহিত প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। ওই অনিয়মের তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির দীর্ঘ প্রতিবেদনের এক অংশে বলা হয়, ‘মৌখিক পরীক্ষার ঠিক আগমুহূর্তে কমিটির সভাপতি আবদুর রফিককে বাদ দিয়ে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সাফিকুর রহমান নিজেই মৌখিক পরীক্ষা কমিটির সভাপতি হন। এতে দেখা যায়, এমডি নিজে প্রার্থী সুপারিশকারী, আবার নিজেই প্রার্থী অনুমোদনকারী। সদস্য সচিবকেও অন্যত্র বদলি করা হয়।’ অতীতে বিমানে নিয়োগের অনেক ক্ষেত্রেই অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে। পাইলট, কেবিন ক্রু, এমনকি চালক নিয়োগেও অনিয়ম হয়েছে সংস্থাটিতে এমন অভিযোগও আছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না হওয়ার কারণে বারবার এ ধরনের অনিয়ম হচ্ছে এবং সংস্থাটির সুনাম ক্ষুণœ হচ্ছে।

 ২০১৯ সালের ৩ এপ্রিল অর্থ তছরুপ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে রাষ্ট্রায়ত্ত আকাশ পরিবহন সংস্থা বিমানের উপ-মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) শফিকুল ইসলাম এবং ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (মার্কেটিং ও সেলস) আশরাফুল আলমকে ওএসডি করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ১৫ মে সাবেক এমডিসহ ১৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মিসর থেকে বোয়িংয়ের দুই উড়োজাহাজ লিজ গ্রহণ ও রি-ডেলিভারি পর্যন্ত ১ হাজার ১৬৪ কোটি টাকার ক্ষতিসাধন করার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তাদের বিরুদ্ধে এ চার্জশিট দাখিল করা হয়েছিল। মনে করি এই বিষয়গুলো অনেকেরই স্মৃতি হরণের কবলে পড়েনি। ২০২৫ সালের অক্টোবরে আরেকটি দৈনিকে ‘বিমানে বদলি-পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ’ প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে ‘প্রশ্নবিদ্ধ পদোন্নতিপ্রাপ্ত’ সুবিধাভোগীরা গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে বদলি ও পদায়ন নিলেও পদোন্নতি বঞ্চিতদের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না, এমন অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে ৯৪ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। অথচ, যোগ্য অনেককে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। অনেকে ৮ থেকে ১২ বছর একই স্থানে চাকরি করলেও বদলি করা হচ্ছে না। এ ছাড়া, চলতি বছরের জানুয়ারিতে জব স্পেসিফিকেশন ম্যানুয়ালের শর্ত লঙ্ঘন করে আরও ৪৩ জনের পদোন্নতির অনিয়ম পেয়ে আপত্তি দেয় বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর। এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বিমান। কিন্তু, এই পদোন্নতিপ্রাপ্তদেরই বিভিন্ন স্থানে পদায়ন করা হচ্ছে।’

এমন কু-নজির আছে আরও অনেক। ফিরে ফিরে অপরাজনীতির নখরাঘাতে রাষ্ট্রীয় আকাশ সংস্থাটির অবস্থা ক্রমেই হয়েছে দুর্বল, তার আকাশপথ হয়েছে সংকুচিত, কেনাকাটায় অসাধুদের উদোর পূর্তি হয়েছে, কোনো কোনো রাজনৈতিক সরকার ‘নিজেদের’ লোক বসানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা চালিয়েছে, আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়েছে, হিসাবনিকাশে গরমিল দেখা গেছে অর্থাৎ অনাচার-দুরাচারের খতিয়ান দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবিধান করে বিমানকে সত্যিকার অর্থেই শান্তির নীড় গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে বহুবার কিন্তু বিমান বিষ পিঁপড়ার কামড়মুক্ত হতে পারেনি। একদিকে আর্থিক সংকটে ধুঁকছে সংস্থাটি অন্যদিকে চলছে অসাধুদের নানা রকম ফন্দিফিকির! লোকসানি সংস্থা বিমান কর্র্তৃপক্ষের তরফে মুনাফা জানানো হয় কিন্তু সংস্থাটির পাহাড়সম দেনার হিসাব প্রকাশে তাদের বড়ই অনীহা! বিস্ময়কর হলো, বিমানের যাত্রী খরা চললেও বিদেশি বিমান সংস্থাগুলো দাপিয়ে বাণিজ্য করছে। দুর্মুখেরা বলেন, বিমান বাণিজ্য বুঝেন না, এমন ব্যক্তিরাও সংস্থাটির শীর্ষ পদে বসেছেন।

টিকিট বিক্রিতে অনিয়ম, উড়োজাহাজ ভাড়ায় দুর্নীতি, কার্গো শাখায় দুর্নীতি এবং লাগেজ চুরির মতো অনভিপ্রেত ঘটনাগুলো সংবাদ শিরোনাম হওয়ায় রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইনসের অব্যবস্থাপনা নির্দেশ করে। ফ্লাইট শিডিউল বিপর্যয়সহ ক্ষতচিহ্ন তো আরও কতই আছে। বিমানে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনেক আগে থেকেই আলোচিত বিষয়। কিন্তু প্রতিবিধানহীনতার অপসংস্কৃতির কারণে এসব বন্ধ হচ্ছে না। সংবাদমাধ্যমে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে অভিযোগ উত্থাপিত হলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং তদন্তে অনিয়ম-অপরাধ প্রমাণিত হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দায়ী ব্যক্তিদের উদাহরণযোগ্য প্রতিবিধান হয় না, এমন অভিযোগও কম নয়। অপরাধ প্রমাণের পরও কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সেই অপরাধের দায় বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের এড়ানোর অবকাশ থাকে কি?

২০২০ সালে টিকিট বিক্রিতে অনিয়ম ও গুরুতর আর্থিক দুর্নীতির দায়ে বিমানের ৪৩ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল, হয়তো অনেকেই এই বিষয়টিও ভুলে যাননি। এরপর বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব নিয়েই আবু সালেহ মোস্তফা কামাল অনিয়ম ও দুর্নীতির জন্য তাদের ভর্ৎসনা করে তাদের  চাকরিতে পুনর্বহাল করেন। এই ঘটনার পরবর্তী অধ্যায় জানা নেই। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন আবু সালেহ মোস্তফা কামাল। নীতিমালার ফাঁক গলেও বিমানে অনিয়ম কম হয়নি। টিকিটের অসম বণ্টন, ফ্লাইট কমিয়ে ও টিকিট ব্লক করে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি, গ্রুপে কিনে ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর উচ্চমূল্যে বিক্রি এবং দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতির কারণে আকাশপথের যাত্রীদের বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে এসবও পুরনো অভিযোগ নয়।  

নারীকর্মীদের হয়রানিসহ বিভিন্ন সময় কোনো কোনো বিমানকর্মীর বিরুদ্ধে সোনা চোরাচালানে যুক্ত হওয়া, নির্দিষ্ট এজেন্টদের সুবিধা দিতে টিকিট বুকিংয়ে কারসাজি, বিভিন্ন কেনাকাটাসহ নানা ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নিরীক্ষায়ও এমন অনেক অনিয়মের তথ্য এসেছে। কিন্তু সে অনুযায়ী দায়ী ব্যক্তিদের কজনকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে এ প্রশ্নের উত্তর দেবেন কে বা কারা? বিমানকে রাজনৈতিক ছায়া ও বিষ পিঁপড়ামুক্ত না করে দৃশ্যত ‘ঢেলে সাজিয়ে’ সুফলের আশা দুরাশারই নামান্তর। বিমানকে যারা বহুমুখী ফাঁদে ফেলেছেন তাদের সন্ধানও সমভাবেই জরুরি।

লেখক : সাংবাদিক, বিশ্লেষক ও কবি

deba_bishnu@yahoo.com