কম্বোডিয়ার বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে উদ্ধার আরও ৫২ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। সোমবার (১৫ জুন) দুপুর থাই এয়ারওয়েজের (TG-321) একটা ফ্লাইটে তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন। এ নিয়ে গত তিন দিনে সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে ১৪৩ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরলেন। এ ঘটনায় তাদের একজন সোমবার বিমানবন্দর থানায় একটি মামলাও করেছেন।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম জানিয়েছে, আগের দুদিনের মতো সোমবার ফেরত আসা সবাইকেও বিমানবন্দরে সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটির সাথে মিলে জরুরী সহায়তা ও বাড়িতে পৌঁছানোর জন্য অর্থ সহায়তা করেছে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম। এছাড়া
বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ছাড়পত্র দিয়ে তাদের সবাইকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর বাংলাদেশি দালাল চক্রের মাধ্যমে তাদেরকে অর্থের বিনিময়ে চীনা নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সাইবার স্কাম কম্পাউন্ডে হস্তান্তর করা হয়।
সোমবার ফেরত আসা ভুক্তভোগীদের একজন জানান, শারীরিক নির্যাতন করে স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করতে তাদের বাধ্য করা হতো। কাজ করতে না চাইলে তাদের টর্চার সেলে নিয়ে ইলেক্ট্রনিক শক দেওয়া হতো। কম্বোডিয়ার আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সম্প্রতি স্ক্যাম সেন্টার বিরোধী অভিযান পরিচালনা করলে চাইনিজরা পালিয়ে যায়। এরপর সেখান থেকে তারা মুক্তি পান।
আরেজন ভুক্তভোগী জানান, সেদেশে থাকা বাংলাদেশি দালাল আব্দুল আল মামুন অপু সেখানে বিয়ে করে দীর্ঘ সময় ধরে কম্বোডিয়াতে থাকেন। কোম্পানিতে চাকুরী কথা বলে তিনি একাই কয়েক হাজার বাংলাদেশিকে স্কাম সেন্টারে বিক্রি করেছেন।
ভুক্তভোগীরা জানান, এসব কম্পাউন্ডে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে বাধ্য করা হতো। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের নাগরিকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত সাইবার স্কাম কার্যক্রমে অংশ নিতে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হতো। নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো।
এর আগে গত ১২ জুন কম্বোডিয়া থেকে ৩৭ জন ১৩ জুন ৫৪ ভুক্তভোগী দেশে ফেরত আসেন। একইভাবে এ বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আটজন এবং ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফিরেন। তাদেরও ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে থাইল্যান্ডের সীমান্ত এলাকা মায়েসট হয়ে জোরপূর্বক মিয়ানমারে প্রবেশ করানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর পরই তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বিদেশের মাটিতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। ভয়াবহ নির্যাতন করে নানা ধরনের সাইবার জালিয়াতির কাজ করানো হতো।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগি পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ফলে কয়েকটি স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে এসব বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তিনদিন মিলে ১৪৩ জন বাংলাদেশির ফেরত আসা প্রমাণ করে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি এভাবে প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার। মঙ্গলবারও আরেকদলের আসার কথা রয়েছে।
শরিফুল হাসান জানান, সাইবার স্ক্যাম মানবপাচারের ভয়াবহ একটা ধরন। ফেরত আসা এক ভুক্তভোগী মানব পাচার ও অভিবাসন চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে একটি মামলা করেছেন। যেহেতু মামলা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করা। বিশেষ করে কোন প্রক্রিয়ায় তাদের কম্বোডিয়া পাঠানো হলে সেই চক্রকে চিহ্নিত করা জরুরী।
ব্র্যাক জানিয়েছে, কম্পিউটার, কলসেন্টার অপারেটরসহ বিভিন্ন পদে আকর্ষণীয় বেতনের প্রলোভন দিয়ে নিয়োগের লক্ষ্যে বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে (ভুয়া ওয়েবসাইট, ইমেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ইত্যাদি) প্রচার চলে। এরপর তাদের সুকৌশলে স্ক্যাম সেন্টারের ভেতরে নিয়ে গিয়ে অস্ত্রের মুখে জোরপূর্বক জিম্মি করে স্ক্যামের কাজে নিয়োজিত করা হয়। এ কারণেই সরকার এবং ব্র্যাকের পক্ষ থেকে একাধিকবার থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় যাওয়ার বিষয়ে সচেতন হতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।