কী গাছ লাগাবেন কীভাবে লাগাবেন

বৃক্ষ প্রকৃতির এক অমূল্য সম্পদ। দৈনন্দিন জীবনে বৃক্ষের গুরুত্ব অপরিসীম। গাছ আমাদের জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন সরবরাহ এবং ক্ষতিকারক কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে পরিবেশকে নির্মল রাখতে সাহায্য করে থাকে।

পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, কোনো দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য তার মোট ভূখ-ের অন্তত শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা দরকার। কিন্তু বাংলাদেশে মোট বনভূমির পরিমাণ শতকরা ১৮ ভাগ মাত্র। দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে ব্যাপকহারে গাছপালা কাটা হচ্ছে। কিন্তু সেই হারে বৃক্ষরোপণ ও তার রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না। ফলে গাছপালার ঘাটতির কারণে একদিকে যেমন আমাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় গাছপালাজাত দ্রব্যের অভাব ঘটছে, অপরদিকে প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে। বৃক্ষ সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি ও নির্মল পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতি বছর দেশে জাতীয়ভাবে বৃক্ষরোপণ ও সংরক্ষণের কর্মসূচি নেওয়া হয়।

বৃক্ষরোপণের সময়

সারা বছরই বৃক্ষরোপণ করা যায়। তবে বর্ষাকাল বৃক্ষের চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। আপনার নিজের সম্পদ এবং জাতীয় সম্পদ বাড়ানোর জন্য বসতবাড়ির আশপাশের পতিত জায়গায়, পুকুর পাড়ে, রাস্তার পাশে, খাল বা নদীর ধারে, রেললাইন ও বাঁধের পাশে, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, অফিস-আদালত, কল-কারখানা, ঈদগাহ, গোরস্তান, শ্মশান  ও মন্দিরের খালি জায়গায় ব্যাপকহারে গাছ লাগানো উচিত।

কী গাছ লাগাবেন

আসবাবপত্র ও গৃহনির্মাণের জন্য সেগুন, মেহগনি, শিলকড়ই, গজারি, জারুল এবং জ¦ালানি কাঠের জন্য কড়ই, ইপিল-ইপিল, রেইন্ট্রি, তেঁতুল, বাবলা ইত্যাদি এবং সুস্বাস্থ্যের জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ ফল যেমন আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, সফেদা, জামরুল, আমড়া, বেল, লেবু, কামরাঙা, নারিকেল ইত্যাদির উন্নত চারা/কলম সংগ্রহ করে লাগাতে হবে। এ ছাড়া নানা রোগের চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য নিম, অর্জুন, হরীতকী, বাসক, আমলকী, তুলসী, বহেরা, মহুয়া এসব ঔষধি গুণসম্পন্ন বৃক্ষের চারা রোপণ করা উচিত।

বৃক্ষের চারা রোপণের নিয়মাবলি

বনজ বৃক্ষের চারা রোপণের উত্তম দূরত্ব হলো ২ ী ২ মিটার বা ২.৫ী২.৫ মিটার। জ¦ালানির জন্য যদি ইপিল-ইপিল লাগানো হয়, তবে ১ী১ মিটার দূরত্বে লাগানো যেতে পারে। বনজ বৃক্ষের চারা রোপণের জন্য ৪৫ সে.মি. লম্বা, ৪৫ সে.মি. চওড়া ও ৪৫ সে.মি. গভীর করে গর্ত করে গর্তের মাটি ১০-১২ দিন রোদে শুকিয়ে নিতে হয়। প্রতিটি গর্তের ওপরের স্তরের মাটির সঙ্গে পচা গোবর বা আবর্জনা সার ৬ কেজি, ইউরিয়া ১২৫ গ্রাম, টিএসপি ১০০ গ্রাম ও ১২৫ গ্রাম এমওপি সার ভালোভাবে মিশিয়ে গর্তটি পুনরায় ভরাট করতে হবে। গর্তের ভরাট মাটি জমির সাধারণ সমতল হতে ৫ সে.মি. (২ ইঞ্চি) পরিমাণে উঁচু রাখতে হবে।

সার মেশানো মাটি দিয়ে গর্ত ভরাট করে ১০-১২ দিন পর গর্তের ঠিক মাঝখানে চারা বসিয়ে চারপাশের মাটি হাত দিয়ে হালকাভাবে চেপে বসিয়ে দিতে হবে। ঝড়ে বা বাতাসে যাতে চারা হেলে বা পড়ে না যায় সেজন্য গোড়া থেকে ১০-১৫ সে.মি. দূরে একটি শক্ত খুঁটি পুঁতে তার সঙ্গে চারা বেঁধে দিতে হয়। গরু-ছাগলের উপদ্রব থেকে রক্ষার জন্য চারা গাছের চারদিক মজবুত ঘের-বেড়া দিতে হবে। সাধারণত বাঁশ দিয়ে বেড়া নির্মাণ করা হয়। প্রতিটি চারার জন্য ২৫০ সে.মি. উঁচু খাঁচি দ্বারা বেড়া দেওয়া যেতে পারে। চারা ঠিক মাঝখানে রেখে খাঁচি বসিয়ে খাঁচির দুই পার্শ্বে ২টি খুঁটি পুঁতে শক্ত করে বেঁধে দিতে হবে।

রোপিত চারার সুষ্ঠু পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আমাদের দেশে প্রতি বছর অনেক চারা নষ্ট হয়ে যায়। তাই রোপিত বৃক্ষের চারা যতœ, পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে চারা গাছকে বড় গাছে পরিণত করতে হবে।

লেখক : উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা (অব.), উপজেলা কৃষি অফিস, রূপসা, খুলনা