একই বৃন্তের দুই ফুল : ফ্রান্স-সেনেগাল দ্বৈরথ

ফুটবল মানচিত্রের দুই প্রান্তের দুই দেশ, কিন্তু তাদের ফুটবলীয় নাড়ির টান এক সুতোয় গাঁথা। সেনেগাল একসময় ফ্রান্সের উপনিবেশ থাকায় দুই দেশের ভাষা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন দীর্ঘদিনের। ফুটবলের সবুজ গালিচায় এই সম্পর্ক আরও গভীর ও জটিল; কারণ বর্তমান সেনেগাল দলের অনেক তারকার জন্ম ও ফুটবলে হাতেখড়ি হয়েছে ফ্রান্সে, আবার ফরাসি ড্রেসিংরুমের অনেকের শেকড় পোঁতা আছে সেনেগালের তপ্ত মাটিতে। প্যাট্রিক ভিয়েরার মতো কিংবদন্তি সেনেগালে জন্মেও ফ্রান্সের জার্সি গায়ে মাঠ কাঁপিয়েছেন, যা প্রমাণ করে ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও তাদের ফুটবলীয় নাড়ির টান কতটা প্রগাঢ়। প্রতি বিশ্বকাপের আগে অনেক ফুটবলারকেই এক কঠিন দোলাচলে পড়তে হয় পরাক্রমশালী ফ্রান্স নাকি পূর্বপুরুষের দেশ সেনেগাল? এই অমীমাংসিত আবেগ আর রক্তের সম্পর্কের কারণেই যখন এই দুই দেশ মুখোমুখি হয়, তখন তা শুধু দুটি দলের লড়াই থাকে না, হয়ে ওঠে এক অবিচ্ছেদ্য ফুটবলীয় ইতিহাসের পুনর্মিলন।

আজ মঙ্গলবার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম যখন ফ্রান্স ও সেনেগালের লড়াইয়ে কেঁপে উঠবে, তখন শুধু বলের দখল নিয়ে যুদ্ধ হবে না; বরং সবুজ গালিচায় ফিরে আসবে ২৪ বছর আগের এক অমীমাংসিত রোমাঞ্চের স্মৃতি। ২০০২ বিশ্বকাপের সেই উদ্বোধনী ম্যাচ, যেখানে তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে পাপা বুবা ডিওপের এক গোলে ধসিয়ে দিয়েছিল সেনেগাল, সেই ক্ষত আজও ফরাসিদের মনে দাহ তৈরি করে। তাই এবার লড়াইটা শুধু গ্রুপ পর্বের পয়েন্টের নয়, বরং শ্রেষ্ঠত্ব আর প্রতিশোধের।

সেনেগাল এখন আর সেই নবাগত দল নেই, বরং সাদিও মানের নেতৃত্বে তারা এখন আফ্রিকার অপ্রতিরোধ্য শক্তি। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে রেফারিং বিতর্কে তাদের মহাদেশীয় শিরোপা নিয়ে আইনি লড়াই চলছে, কিন্তু মাঠের ফুটবলে তারা এক নিটোল ‘গোল্ডেন জেনারেশন’। সাদিও মানেদের ক্ষিপ্রতা আর শারীরিক ফুটবলের সামনে ফরাসি রক্ষণভাগের পরীক্ষাটা যে মোটেও সহজ হবে না, তা টের পাচ্ছে গোটা ফুটবল বিশ্ব। অন্যদিকে, দিদিয়ের দেশমের অধীনে গত দেড় দশক ধরে ফ্রান্স এক স্থিতিশীল ও বিধ্বংসী শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

তবে এই দ্বৈরথের সমস্ত আলো কেড়ে নিয়েছেন ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। বিশ্বকাপে মাত্র দুই আসরেই ১২ গোল নিয়ে তিনি কিংবদন্তি মিরোসøাভ ক্লোসাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু এবার এমবাপ্পে শুধু গোল করার নেশায় বুঁদ নন, দলের প্রয়োজনে তিনি নিজের স্বভাবজাত খেলার ধরন বদলাতেও পিছপা হচ্ছেন না। নিজের রক্ষণাত্মক অবদান নিয়ে ওঠা সমালোচনাগুলোকে এবার তিনি অনুপ্রেরণায় বদলে ফেলেছেন। নিজের ভাই ইথান এমবাপ্পের সঙ্গে এক আলাপে এই ফরাসি ফরোয়ার্ড সোজাসাপ্টা ভাষায় তার লক্ষ্য জানিয়ে দিয়েছেন।

নিজের খেলার ধরন পরিবর্তন ও ডিফেন্সে সাহায্য করার গুরুত্ব তুলে ধরে এমবাপ্পে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দলের বৃহত্তর স্বার্থে তিনি নিজের ব্যক্তিগত ইমেজের চেয়ে কঠোর পরিশ্রমকেই এগিয়ে রাখছেন। তিনি মনে করেন, বড় টুর্নামেন্ট জিততে হলে ফরোয়ার্ডদেরও রক্ষণে অবদান রাখা জরুরি। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দলের স্বার্থে রক্ষণাত্মক কাজে সাহায্য করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আমার মনে হয় এটিই এখন আমার করা উচিত। আমি যা-ই করি না কেন, তা কেবল দলের জয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই করব।’ মূলত বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটি যেকোনো মূল্যে নিজের করে নিতেই এমবাপ্পে এই নতুন রূপের অঙ্গীকার করেছেন।

ফুটবল পণ্ডিতরা মনে করছেন, রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ক্লাব ফুটবলে কিছুটা মলিন সময় কাটালেও বিশ্বকাপে এমবাপ্পে হবেন সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র। আর্সেন ওয়েঙ্গারের মতো ব্যক্তিত্বরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, এমবাপ্পে এখন শারীরিকভাবে দারুণ সতেজ। এই সতেজতা আর সেনেগালের লড়াকু মানসিকতার সংঘর্ষে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যে এক মহাকাব্যিক লড়াই হতে যাচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।