জেলে যেতে পারতেন হয়ে গেলেন আইভরি কোস্টের নায়ক

আপডেট : ১৬ জুন ২০২৬, ০৭:০৮ এএম

পশ্চিম আফ্রিকা থেকে প্রতি বছর গড়ে ১৫ হাজার তরুণকে ফুটবলার বানানোর স্বপ্ন দেখিয়ে পাচার করা হয় ইউরোপে। এর মধ্যে অনেক তরুণ ইউরোপে গ্রেপ্তার হয়ে আবার ফেরত আসতে বাধ্য হন নিজ দেশে, এমনকি কারাগারে দীর্ঘ সময় যন্ত্রণাও পোহাতে হয় কাউকে। আমাদ দিয়ালো হতে পারতেন তাদের মতো একজন। কে জানত, সেই দিয়ালোই ২০২৬ বিশ্বকাপে আইভরি কোস্টের হয়ে অন্তিম সময়ে ইকুয়েডরের বিপক্ষে করবেন জয়সূচক গোল!

‘ই’ গ্রুপের ইকুয়েডর-আইভরিকোস্টের ম্যাচটা ইনজুরি টাইমের দিকে এগোচ্ছিল। স্কোরবোর্ডে তখনো শূন্য-শূন্য। ঠিক তখনই বলটা এলো আমাদ দিয়ালোর পায়ে। বক্সের ভেতর থেকে দারুণ এক মাপা শটে বল জড়িয়ে দেন জালে। আইভরি কোস্ট ম্যাচ জিতে নেয় ১-০ গোলে। দিয়ালোর বেড়ে ওঠা কোনো ইউরোপীয় ফুটবল একাডেমিতে নয়। তার শৈশব কেটেছে আবিদজানের আজিদাম এলাকায়। এই আজিদামকে অনেকেই আবিদজানের সবচেয়ে ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি বলে থাকেন। লাখো মানুষের ভিড়, বিশাল বাজার আর জীবিকার জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই। সেখানেই বড় হয়েছেন আমাদ।

স্থানীয় কোচ হামেদ মামাদু ত্রাওরে প্রথম দেখেছিলেন তার প্রতিভা। তখন আমাদের বয়স মাত্র আট বা নয় বছর। স্কুলের ছুটির সময় আয়োজিত একটি প্রশিক্ষণ সেশনে অন্যদের চেয়ে আলাদা লেগেছিল ছেলেটিকে। শুধু পায়ের জাদুর জন্য নয়, খেলার বুদ্ধির জন্যও। ত্রাওরের ক্লাব ‘লিডার ফুট’-এ যোগ দেওয়ার পর দ্রুতই সবার নজর কেড়ে নেন আমাদ। আইভরি কোস্টের হাজারো প্রতিভাবান কিশোরের মতো তার সামনেও ছিল ইউরোপের হাতছানি। ২০১৫ সালে ইতালিতে চলেও যান দিয়ালো। কিন্তু পাঁচ বছর পর তাকে নিয়ে একটি অভিযোগ ওঠে।

২০২০ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপীয় ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত মানব পাচার-সংক্রান্ত ঘটনাগুলোর একটির কেন্দ্রে চলে হামেদ মামাদু ত্রাওরের নাম। ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের (এফআইজিসি) অভিযোগ তিনি জাল কাগজপত্র তৈরি করে সিরি ‘আ’র দুই ফুটবলারকে অবৈধভাবে ইতালিতে ঢোকার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

সেই দুই খেলোয়াড়ের একজন আমাদ দিয়ালো, অন্যজন হামেদ জুনিয়র ত্রাওরে। এফআইজিসির শুনানির সময় আমাদ দিয়ালো আতালান্তায় নিজের প্রতিভার ঝলক দেখাতে শুরু করেছেন মাত্র। অন্যদিকে নিজেকে আমাদের ভাই বলে পরিচয় দেওয়া হামেদ জুনিয়র ত্রাওরে ইতিমধ্যে এম্পোলি ও সাসসুয়োলোর হয়ে সিরি ‘আ’তে প্রতিষ্ঠিত মিডফিল্ডার।

ইতালির প্রসিকিউটরদের দাবি অনুযায়ী, উত্তর ইতালির রেজ্জিও এমিলিয়া অঞ্চলে এই দুই ফুটবলারকে পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি মিলে নিয়ে এসেছিলেন। হামেদ মামাদু ত্রাওরে নিজেকে তাদের বাবা হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন আর তার স্ত্রী মারিনা এদভিজ তেহের অভিনয় করেছিলেন তাদের মা হিসেবে।

প্রসিকিউটরদের কথা, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত এবং জটিল নেটওয়ার্ক, যেখানে পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য জড়িত ছিলেন। সব মিলিয়ে আমাদের জন্য পরিস্থিতিটা ছিল এমন, যেখান থেকে অনেক তরুণের পেশাদার ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদ দমে যাননি। বোকা বারকো হয়ে আতালান্তার একাডেমি, সেখান থেকে ২০১৯ সালে সিরি ‘আ’তে অভিষেক। কয়েক মিনিট খেলেই গোল। ইতালিয়ান ফুটবলে নতুন এক বিস্ময়ের আবির্ভাব ঘটে।

এরপর পড়েন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের নজরে।২০২১ সালে প্রায় ৩৭ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে তাকে দলে ভিড়িয়েছিল ইংলিশ ক্লাবটি। তখন অনেকেই ভাবছিলেন, হয়তো আরেকজন ‘ওয়ান্ডারকিড’-এর গল্প শুরু হলো। কিন্তু বাস্তবতা ছিল কঠিন। ম্যানচেস্টারে এসে নিয়মিত খেলার সুযোগ পাননি। রেঞ্জার্সে ধারে গেছেন, পরে সান্ডারল্যান্ডেও।

অনেক তরুণ খেলোয়াড়ের মতো তার ক্যারিয়ারও যেন মাঝপথে আটকে যেতে বসেছিল। কিন্তু এ সময়টাই তাকে বদলে দেয়। তিনি বুঝতে শেখেন প্রতিভা আর সাফল্য এক জিনিস নয়। শেষ পর্যন্ত ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে তিনি আবার সুযোগ পান। আইভরি কোস্টের হয়ে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্নও পূরণ হয়। আর বিশ্বকাপে আইভরি কোস্টের প্রথম ম্যাচে কী করেছেন, সে গল্পটা তো জানা হয়ে গেছে সবার।

ইকুয়েডরকে হারানোর পর আমাদ দিয়ালো বলেন, ‘আমরা জানতাম ম্যাচটি অনেক কঠিন হবে কারণ ইকুয়েডরের খেলোয়াড়রা শারীরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। আমরা তাদের ফাঁদে পা দিতে চাইনি, বরং আমাদের নিজেদের খেলাটাই খেলতে চেয়েছিলাম। তারা আমাদের কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিল, তবে আমরা শেষ পর্যন্ত ফোকাস ধরে রেখেছিলাম।’

ইকুয়েডরের ডিফেন্ডারদের কড়া ট্যাকল ও ম্যাচ জয়ের মানসিকতা নিয়ে দিয়ালো আরও যোগ করেন, ‘এই ৩ পয়েন্ট আমাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। ম্যাচ শেষ হওয়ার বাঁশি বাজার আগপর্যন্ত আমাদের বিশ্বাস ছিল যে একটা সুযোগ আমরা পাবই। এখন আমাদের পরবর্তী দুই ম্যাচের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।’

গ্রুপ ‘ই’-তে জার্মানির বিপক্ষে নিজেদের পরবর্তী কঠিন ম্যাচের আগে এই জয় আইভরি কোস্টকে মানসিকভাবে অনেক এগিয়ে রাখবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত