টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কালিয়ান উচ্চ বিদ্যালয়ের আঙিনায় মঙ্গলবার (১৬ জুন) ছিল এক আবেগঘন বিকেল। দীর্ঘ ৩৬ বছরের শিক্ষকতা জীবনের সমাপ্তিতে সহকারী শিক্ষক আব্দুল হালিম মিয়াকে বিদায় জানাতে একত্রিত হন সহকর্মী, প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং এলাকার অসংখ্য মানুষ। বিদায়ের ক্ষণে অনেকের চোখেই ছিল অশ্রু, কণ্ঠে ছিল কৃতজ্ঞতার কথা।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আয়োজনে ফুলে সাজানো ছাদখোলা জিপে করে এবং মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার মাধ্যমে তাকে নিজ বাড়ি উপজেলার শালগ্রামপুর গ্রামে পৌঁছে দেওয়া হয়। শিক্ষককে ঘিরে এমন ব্যতিক্রমী সম্মান ও ভালোবাসার দৃশ্য এলাকাজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, আব্দুল হালিম মিয়া ১৯৮৯ সালে কালিয়ান উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ ৩৬ বছর একই প্রতিষ্ঠানে নিষ্ঠা, সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে শিক্ষকতা করার পর গত ৩১ মে তার চাকরিজীবনের শেষ কর্মদিবস ছিল। ঈদুল আজহার ছুটির কারণে মঙ্গলবার তাকে আনুষ্ঠানিক বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
বিদায় অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বক্তারা বলেন, আব্দুল হালিম মিয়া শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন শিক্ষার্থীদের অভিভাবক, পথপ্রদর্শক এবং নৈতিক শিক্ষার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুস সামাদ মিয়া বলেন, ‘আব্দুল হালিম স্যার এই বিদ্যালয়ের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি বিজ্ঞানের মতো জটিল বিষয়ও সহজ ও আনন্দময় করে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করতেন। তার কর্মনিষ্ঠা, সততা ও মানবিকতা আগামী প্রজন্মের শিক্ষকদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।’
প্রাক্তন শিক্ষার্থী শফিকুল ইসলাম স্মৃতিচারণ করে বলেন, স্যার আমাদের জীববিজ্ঞান পড়াতেন। তার ক্লাস মানেই ছিল নতুন কিছু শেখার আনন্দ। তিনি শুধু পাঠ্যবই পড়াননি, মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দিয়েছেন। আজকের বিদায় আমাদের জন্য সত্যিই কষ্টের।
বিদ্যালয়ের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি ফজলুল হক। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি কামরুজ্জামান, কাউলজানি নওশেরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছানোয়ার হোসেন, সাবেক শিক্ষক ওমর আলী, মোতাহের আলী ভূঁইয়া, বর্তমান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম, বিদায়ী শিক্ষকের ভাই হায়দার আলীসহ অনেকে।
অনুষ্ঠান শেষে ফুলে ফুলে সজ্জিত ছাদখোলা জিপে উঠিয়ে দেওয়া হয় আব্দুল হালিম মিয়াকে। সামনে ও পেছনে ছিল মোটরসাইকেলের দীর্ঘ বহর। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে অনেকেই হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান প্রিয় শিক্ষককে। এমন দৃশ্য দেখে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি উপস্থিত অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক।
বিদায়ী শিক্ষক আব্দুল হালিম মিয়া বলেন, জীবনের ৩৬টি বছর আমি শিক্ষার্থীদের মাঝে কাটিয়েছি। আজ যে সম্মান, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পেয়েছি, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। একজন শিক্ষক হিসেবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছু হতে পারে না। আমি সবসময় চেষ্টা করেছি আমার শিক্ষার্থীদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। তারা যেন দেশ ও সমাজের কল্যাণে কাজ করে, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
তিনি আরও বলেন, ‘আজকের এই ভালোবাসা, এই সম্মান আমি সারাজীবন হৃদয়ে লালন করব। কালিয়ান উচ্চ বিদ্যালয় আমার কাছে শুধু একটি কর্মস্থল নয়, এটি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।’
একজন শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও সমাজের এমন অকৃত্রিম ভালোবাসা যেন আবারও প্রমাণ করল—প্রকৃত শিক্ষক কখনও অবসরে যান না; তিনি বেঁচে থাকেন তার শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে, তাদের অর্জনে এবং অসংখ্য স্মৃতির পাতায়।