অবসর ও কল্যাণের টাকা : শিক্ষকদের অপেক্ষার অবসান 

বিভিন্ন খাতে অপ্রয়োজনীয় অর্থ খরচ করা হলেও শিক্ষকতার মতো মহান ব্রত শেষে অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের দুর্দশা লাগবে উদাসীন সবাই। তবে সব অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে আগামী ১৫ আগস্ট

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০১:০১ পিএম

দীর্ঘ চাকরি জীবন শেষে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবসরে যাওয়া হাজার হাজার শিক্ষক ও কর্মচারীদের দীর্ঘশ্বাসের নাম অবসরসুবিধা বোর্ড এবং কল্যাণ ট্রাস্ট। অবসর ও কল্যাণের টাকা পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা নানা জায়গায় ধরনা দিয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না অবসরে যাওয়া ব্যক্তিদের। এই শিক্ষক কর্মচারীদের অনেকেই আর্থিক অনটনে চিকিৎসা করাতে না পেরে মারা গেছেন আবার অনেকেই শেষ বয়সে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

দীর্ঘদিন ধরে একটা সমালোচনা চলছে যে, বিভিন্ন খাতে অপ্রয়োজনীয় অর্থ খরচ করা হলেও শিক্ষকতার মতো মহান ব্রত শেষে অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের দুর্দশা লাগবে উদাসীন সবাই। তবে সব অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে আগামী ১৫ আগস্ট। 

বর্তমান সরকার অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের মানবেতর জীবনযাপনের কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে যেসব শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে যেসব আবেদনকারীর কল্যাণের টাকা বকেয়া আছে তাদের আংশিক বকেয়া পরিশোধের। আগামী ১৫ আগস্ট রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই টাকা বিতরণ করা হবে। এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মাধ্যমে ৭৫ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীকে শুধু অবসরের টাকা এবং এরমধ্যে ৪৪ হাজার শিক্ষক কর্মচারী কল্যাণের টাকাও পাবেন। সব মিলিয়ে ১ লাখ ১৯ হাজার শিক্ষক কর্মচারী এই টাকা পাবেন। 

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক উপস্থিত ছিলেন। 

এই সূত্র আরও জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া ২ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ ও অবসর ও কল্যাণ বোর্ডের বিভিন্ন এফডিয়ার থেকে মাসিক জমা হওয়া লভ্যাংশ এবং প্রতি মাসে কল্যাণ সুবিধার জন্য শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন থেকে কেটে নেওয়া টাকা থেকে এই টাকার সংস্থান করা হবে। সাধারণত  অবসরসুবিধার জন্য চাকরিকালীন শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৬ শতাংশ করে টাকা মাসে কেটে রাখা হয়। কল্যাণ সুবিধার জন্য কাটা হয় আরও ৪ শতাংশ। এ ছাড়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে ১০০ টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৭০ টাকা অবসরের জন্য এবং ৩০ টাকা কল্যাণের জন্য। বাকি অর্থ সরকার ও জমা অর্থের সুদ থেকে সমন্বয় করা হয়।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে সফটওয়্যার জটিলতার কারণে অবসরে যাওয়া শিক্ষক কর্মচারীদের তথ্য অ্যানালগ পদ্ধতিতে হালনাগাদ করছিল অবসরসুবিধা বোর্ড এবং কল্যাণ ট্রাস্ট। হঠাৎ করে অল্প সময়ে বড় কর্মযজ্ঞ সম্পাদনের জন্য কারিগরি ও লজিস্টিক সাপোর্ট তাদের নেই। ফলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে আইবাস (সরকারের অর্থ বিভাগের একটি সমন্বিত বাজেট ও হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার) ও ইএফটি ( ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার) এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক কর্মচারীদের হিসাব নম্বরে এই টাকা সরাসরি পাঠানো হবে। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ৫০ জন দক্ষ লোক দিনরাত নিরলস কাজ করছেন যাতে একই দিনে সবার কাছে টাকা পৌঁছানো যায়। কোনো ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী কিংবা দালালরা যাতে অপকর্ম করতে না পারে তাই সংশ্লিষ্ট সকলের ব্যাংক হিসাবে এই টাকা পাঠানো হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যে একটা টিম গঠন করে দেওয়া হয়েছে যারা যাচার করে দেখছে সবার ব্যাংক হিসাব নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্র ঠিক আছে কি না। যাদের তথ্যের ঘাটতি রয়েছে তাদের কাছ থেকে ফোন দিয়ে ব্যাংকের হিসাব নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর নেওয়া হচ্ছে। তবে এবার একসঙ্গে পুরো টাকা দেওয়া হবে না, আংশিক টাকা দেওয়া হবে। আবেদনের সময় ও প্রয়োজনীয়তা যাচার করে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে কে কত টাকা করে পাবেন। 

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অবসরে গিয়েছিলেন সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার মাদ্রাসা শিক্ষক আসলাম আলী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবসর ও কল্যাণের টাকা পেতে মন্ত্রণালয় ব্যানবেইজ ও বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরছি। কিন্তু কোনো উপায় হয়নি, এখন সরকার যদি সত্যিই আমাদের অবসর ও কল্যাণের টাকা পরিশোধ করে তাহলে বেঁচে যাই। তবে এই শিক্ষক আশঙ্কা প্রকাশ করেন শুক্রবার (৭ আগস্ট) দুপুর পর্যন্ত তার কাছ থেকে ব্যাংকের হিসাব নম্বর কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্র বিষয়ক তথ্য কেউ জানতে চায়নি। তিনি আবেদন করার সময় অনলাইনে ব্যাংক এর নম্বর উল্লেখ করেছিলেন কি না তা মনে করতে পারছিলেন না। শুধু আসলাম আলী একা নয় দেশ রূপান্তরের সাথে আলাপকালে একাধিক শিক্ষক এই উদ্বেগের কথা জানান। 

সার্বিক বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকের সঙ্গে শুক্রবার বিকেলে কথা হয় দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদকের। শিক্ষা সচিব বলেন, এবার কমপক্ষে অবসর ও কল্যাণ মিলিয়ে ৫ লাখ টাকা করে পাবেন আবেদনকারীরা। তবে এটা বাড়তে বা কমতে পারে। যদি এক সাথে সব টাকা দেওয়া হত তাহলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার আবেদনকারীকে পুরো টাকা দেওয়া সম্ভব হত। একসাথে আংশিক টাকা দেওয়া হচ্ছে যাতে সবাই উপকৃত হন। 

শিক্ষাসচিব আরও বলেন, ইতিমধ্যে অবসরে যাওয়া অনেকেই মারা গিয়েছেন, কেউ কেউ টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না, তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন ২০২১ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত যারা আবেদন করেছেন সবাইকে টাকা দিতে। মানুষের উপকারের কথা মাথায় রেখেই এত বড় কর্মযজ্ঞ হাতে নেওয়া হয়েছে। 

অনেক শিক্ষক তথ্যের ঘাটতির জন্য টাকা না পাওয়ার শঙ্কা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে শিক্ষাসচিব বলেন, আমরা এ বিষয়টি চিহ্নিত করে কাজ শুরু করেছি। ইতিমধ্যে যাচাই করে দেখা হচ্ছে। যাদের তথ্যের ঘাটতি আছে তাদের সরাসরি কল দেওয়া হচ্ছে, জেলা ও উপজেলার দায়িত্বশীলদের চিঠি পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ বহুমুখী ততপরতা হাতে নেওয়া হয়েছে। ফলে টাকা না পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এরপরও যাদের তথ্য পাওয়া যাবে না তারা জেলা প্রশাসক অফিস থেকে টাকা সংগ্রহ করতে পারবেন। 

১৫ আগস্টের প্রোগ্রামে ৬৪ জেলা প্রশাসককে অনলাইনে উপস্থিত থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অবসর ও কল্যাণ সুবিধার আওতায় থাকা ব্যক্তিদের তালিকা জেলা প্রশাসককে দেওয়া হবে। যাতে কেউ টাকা না পেয়ে থাকলে জেলা প্রশাসক অফিসে যোগাযোগ করেন। এরপরও যদি কোথাও ভুল হয়ে থাকে কিংবা যান্ত্রিক ত্রুটি হয়ে থাকে তাহলে আমাদের সাথে পরবর্তীতে যোগাযোগ করলে আমরা ঠিক করে দেব। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত