গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে করতোয়া নদীর দক্ষিণমুখী প্রবাহের মুখে নির্মিত একটি স্লুইচগেট যুগ যুগ ধরে বন্ধ রয়েছে। গেটের কারণেই বগুড়ামুখী অংশে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। উৎসমুখে পানির পথ সংকুচিত হয়ে পড়ায় একসময় উত্তরবঙ্গের জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত করতোয়া এখন দখল, দূষণ ও ভরাটের চাপে মৃতপ্রায়। নদীর প্রবাহ ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগও নেই।
এদিকে সম্প্রতি করতোয়া পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নের নামে ১ হাজার ১২২ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প অনুমোদনের প্রস্তুতি চলছে। তবে পরিবেশ আন্দোলনকারীদের দাবি পানি প্রবাহ নিশ্চিত না করলে কোনো প্রকল্পই টিকবে না
গোবিন্দগঞ্জের করতোয়ার উৎসমুখ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, স্লুইচগেটের উত্তর পাশে এখনো নদীর অস্তিত্ব স্পষ্ট। সেখানে পানির প্রবল প্রবাহ রয়েছে। কিন্তু গেটের দক্ষিণ পাশে বগুড়ামুখী অংশে নামতেই দৃশ্যপট বদলে যায়। কোথাও নদীর তলদেশ জেগে উঠেছে, কোথাও চর পড়েছে। আবার কোথাও নদীর জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন স্থাপনা।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রবেশমুখে থাকা স্লুইচগেট কয়েক যুগ ধরে বন্ধ থাকায় ভাটির দিকে ১২৩ কিলোমিটার এলাকায় পর্যাপ্ত পানি পৌঁছায় না। ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়ে গেছে। প্রবাহ না থাকায় নদীতে পলি জমেছে, কমেছে গভীরতা, বেড়েছে দখল।
গোবিন্দগঞ্জের প্রবীণ শিক্ষক আলিম উদ্দিন জানান, ‘কয়েক দশক আগেও শুকিয়ে যাওয়া করতোয়া নদীতে বড় বড় নৌকা চলত। আর এখন হেঁটেই পার হওয়া যায়। স্লুইজ গেট পারের বাসিন্দা আকরাম হোসেন বলেন, একসময় এই নদীপথে খুলনা থেকে নৌকায় নারকেলসহ বিভিন্ন পণ্য আসত। নদী ঘিরে জেলেদের জীবিকাও গড়ে উঠেছিল। কিন্তু আশির দশকে বন্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে উৎসমুখ এলাকায় বাঁধ ও স্লুইচগেট নির্মাণের পর নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ধীরে ধীরে নদীটির শীর্ণ দশা শুরু হয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীন পুন্ড্রবর্ধন জনপদের বিকাশে এ নদীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল সরকারিভাবেও এই তথ্যের প্রমাণ মিলেছে। নতুন করে হাতে নেওয়া পুনঃখনন প্রকল্পের প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে—করতোয়া মূলত পূর্ব তিস্তা নদীর তিনটি প্রধান শাখার একটি। ১৭৮৭ সালের ভয়াবহ বন্যার পর তিস্তার গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে করতোয়ার মূল উৎস তিস্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, উৎস পরিবর্তনের পরও করতোয়া মৌসুমি বৃষ্টি, আঞ্চলিক জলপ্রবাহ ও প্রাকৃতিক সংযোগের মাধ্যমে টিকে আছে। কিন্তু বিভিন্ন স্থানে পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, ভরাট, দখল ও দূষণের কারণে নদীটির সংকট তীব্র হয়
পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার পর সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে নদীর জমিতে। উপজেলার চাপড়ীগঞ্জসহ পাশ্ববর্তী বগুড়ার শিবগঞ্জ, মহাস্থান, শাজাহানপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় নদীর তীর ও তলদেশ দখল করে গড়ে উঠেছে দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা ও নানা অবকাঠামো। বহু স্থানে নদীর প্রস্থ সংকুচিত হয়ে গেছে। নদী শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে নদীর জায়গা দখলের প্রতিযোগিতা। একসময় যে জমি নদীর অংশ ছিল, এখন তার অনেকটাই ব্যক্তিগত ব্যবহার ও স্থাপনার আওতায় চলে গেছে।
সূত্র মতে, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বিভিন্ন সময়ে করতোয়া দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিলেও এখনও নদীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ বেদখল অবস্থায় রয়েছে। দখলের পাশাপাশি দূষণ এখন করতোয়ার আরেক বড় সংকট। গোবিন্দগঞ্জের চাপড়ীগঞ্জ পেপার মিল ও বগুড়া শহরের বিভিন্ন এলাকার ড্রেনের ময়লা সরাসরি গিয়ে পড়ছে নদীতে। বাজারের বর্জ্য, প্লাস্টিক ও গৃহস্থালি আবর্জনাও নিয়মিতভাবে ফেলা হচ্ছে নদীতে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর অনেক অংশে কালো পানি ও পচা বর্জ্যের স্তর দেখা যায়।
পরিবেশবাদীদের ভাষ্য, নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় স্বাভাবিক আত্মশোধন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে দূষণ জমে থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
স্থানীয় গষমাধ্যম কর্মী জাহিদুর রহমান জানান, আশির দশকে এই স্লুইচগেটের কারণে নদীর উৎসমুখ বালুতে ভরাট হয়ে যায়। এরপর ধীরে ধীরে প্রবাহ কমতে থাকে। এখন আবার শহরের প্রায় সব ড্রেন গিয়ে পড়ছে নদীতে। দুর্গন্ধের কারণে অনেক জায়গায় নদীর পাড়ে দাঁড়ানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। এর কারণে প্রবাহ কমেছে, দখল বেড়েছে, দূষণ জমেছে। এই তিন সংকট একে অপরকে আরও তীব্র করছে
করতোয়া পুনরুদ্ধারে গত এক যুগে একাধিক প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড করতোয়া, ইছামতি ও গজারিয়া নদী উন্নয়নে প্রায় ২ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করে। পরে সংশোধিত আকারে প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার নতুন প্রস্তাব তৈরি হয়। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতায় সেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। এরপর ২০২৪ সালে জেলা প্রশাসক অফিস সংলগ্ন এলাকায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে পুনঃখনন, তীর সংরক্ষণ, ওয়াকওয়ে নির্মাণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করে পাউবো। ১৭ কিলোমিটার নদী খননের পাশাপাশি নদীতীরে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়। কিন্তু নদীর প্রবাহ ফেরেনি।
এদিকে বর্তমান সরকার করতোয়া পুনঃখননের জন্য ১ হাজার ১২২ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়। এটি যাচাই বাছাইয়ের জন্য একটি কমিটি কাজ করছে। অনুমোদন হলে ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করা হবে। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৩০ কিলোমিটার গতিপথ পুনঃখনন করা হবে। এরসঙ্গে ইছামতি ও গজারিয়া নদীর পানিপ্রবাহ উন্নয়নের উদ্যোগও রয়েছে।
প্রকল্পের জন্য ২৪ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ, ছয় কিলোমিটার স্লোপ প্রটেকশন, সাড়ে তিন কিলোমিটার নদীতীর রক্ষা এবং প্রায় এক কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৩ সালে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে বগুড়ার শিবগঞ্জ, সদর, শাজাহানপুর, দুপচাঁচিয়া, আদমদীঘি, গাবতলী, ধুনট, শেরপুর এবং গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায়।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব এস এম শাকিল আখতার জানান, মরা নদীটি থেকে এখন দুর্গন্ধ ছড়ায়। এতে এলাকার মানুষের শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। তাই মানুষের উপকারের জন্য প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় নদীটি পুনঃখনন করে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা হবে। নদীর দুই পাশে পাড় বেঁধে কিছু জায়গায় শিশুদের খেলার মাঠও তৈরি করা হবে।