ডেঙ্গুর বিপদসংকেত

মশক নিধনের অভিযান নিষ্ফল কেন

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমে উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে এবং এই বর্ষা মৌসুমে এর প্রাদুর্ভাব আরও ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ১৬ জুন দেশ রূপান্তরে ‘টাকা গেল, মশা রইল’ শিরোনামে শীর্ষ প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে একদিকে যেমন প্রশ্নের পর প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, তেমনি ডেঙ্গু নিয়ে কপালে দুর্ভাবনার ভাঁজ আরও গাঢ় হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন নিজেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, গতবারের চেয়ে এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। দেশ রূপান্তরের ওই প্রতিবেদনের তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে সঙ্গতই আরও প্রশ্ন দাঁড়ায়, শত শত কোটি টাকার মশক নিধনের ওষুধ ব্যবহার করেও কেন নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি মশক ও এর প্রজনন? মৃত্যুহার কমাতে শুধু হাসপাতাল-ভিত্তিক চিকিৎসার পরিবর্তে কমিউনিটি পর্যায়ে জনসচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে বারবার, কিন্তু এই পথও সুগম করা যায়নি।

ওই প্রতিবেদনে প্রকাশ, গত ১০ বছরে মশার পেছনে অন্তত হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে দুই সিটি করপোরেশনের। কিন্তু টাকা খরচের কোনো কূলকিনারা করতে পারছে না সংস্থা দুটি। সরকার বদলায়, মেয়র বা প্রশাসক বদলায় শুধু বদলায় না ডেঙ্গু পরিস্থিতি। গত বছর মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন। এর মধ্যে মারা যান ৪১৩ জন, যার ৬৫ শতাংশই ঢাকা মহানগরীর। এ বছর গত ৭ জুন পর্যন্ত ৭১১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের, এর মধ্যে দুজন রাজধানীর। আরও বলা হয়েছে, একসময় অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনে মশক নিধনে খুবই সামান্য বাজেট থাকত। এই বাজেট বাড়তে বাড়তে ১০ বছরে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কিন্তু মশক নিধনের কোনো উন্নতি হয়নি। দুই সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বশীলদের বক্তব্য, ক্র্যাশ প্রোগ্রাম ছাড়াও সকাল-বিকেল পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পাশাপাশি মশক নিধনে প্রায় ২ হাজার কর্মী কাজ করছেন। মশার লার্ভা ধ্বংসে প্রতিদিন সকালে লিকুইড ওষুধ ছিটানো হয় এবং বিকেলে উড়ন্ত মশা মারতে ম্যালাথিয়ন নামের ওষুধ দিয়ে ফগিং করা হয়। প্রতি ওয়ার্ডে অন্তত ৬ জন করে মশককর্মী কাজ করার কথা। কিন্তু মেয়র-কাউন্সিলর না থাকা এবং ঘন ঘন প্রশাসক বদলের ফলে কর্মীদের মাঠে কাজ করতে দেখেন না বলে অভিযোগ নাগরিকদের।

এই যে দায়সারা গোছের কার্যক্রমের নামে অতিপ্রাকৃতিক, কাল্পনিক কিংবা জাদুকরী কথাবার্তা, এর ফলে সংকটের নিরসন তো হচ্ছেই না বরং উদাসীনতা-পরিকল্পহীনতা এবং মাঠকর্মীদের যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করার দায় সিটি করপোরেশনের কর্তারা এড়াতে পারেন না। জীবন-মরণ নিয়ে বছরের পর বছর ব্যর্থতার খতিয়ান দীর্ঘ হবে আর কোনো প্রতিবিধান হবে না, তা তো হতে পারে না। একই সঙ্গে আমরা নাগরিক সমাজের দায়িত্ব কিংবা ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রাখতে চাই। বাসা-বাড়ি কিংবা আশপাশে অনেকের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং হচ্ছে। মূল কথা হলো, কোন সংকটের ছায়ায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি আমরা তা জানতে চাই না, আমরা জানতে চাই ডেঙ্গুর কারণে জনস্বাস্থ্য আর কতটা সংকটাপন্ন হলে দায়িত্বশীলদের ব্যবস্থা কিংবা কাজের কাজ ‘হবে’, ‘হচ্ছে’র জটাজাল ছিন্ন হবে? 

মশানিধনে সিটি করপোরেশন ফলদায়ী কাজ কতটা কী করছে বিদ্যমান পরিস্থিতিই আর সাক্ষ্য দিচ্ছে। আমাদের স্মরণে আছে মশক নিধন কার্যক্রমে হেলাফেলা, ওষুধের গুণগত মান, ওষুধ কেনাকাটায় অনিয়ম-দুর্নীতির অনেক চিত্রই ইতিপূর্বে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছিল কিন্তু এর প্রতিকার-প্রতিবিধান কতটা কী হয়েছে, এই প্রশ্নের উত্তর প্রীতিকর নয়। আমরা দেখেছি, স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তরফেও কার্যকর সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঘাটতি। বলা বাঞ্ছনীয়, ডেঙ্গু এখন আর শুধু নগর-শহরের সংকট নয়, বরং তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। হামের প্রকোপের মধ্যেই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এ বছর ডেঙ্গুর প্রাণঘাতী রূপ জ¦রের সঙ্গে রক্তক্ষরণের (ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার) মাত্রাও বেশি হতে পারে। তাই আর কোনো সময়ক্ষেপণ না করে সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি পক্ষ এবং নাগরিক সমাজের সচেতনতা-সম্পৃক্ততাও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গু সীমানা মানে না ডেঙ্গু, তাই সীমানাহীন লড়াইয়ের বিকল্প নেই।