পুষ্টি ও বাস্তুসংস্থানের সুরক্ষা

আপডেট : ১৬ জুন ২০২৬, ১১:৫৫ পিএম

ঋতুর যেমন বদল ঘটছে, তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে কুড়িয়ে পাওয়া খাদ্যের বৈচিত্র্য। অচাষকৃত কুড়িয়ে পাওয়া খাদ্যভান্ডার গ্রামীণ জনগণের দুর্দিন ও দুর্যোগের সাথি। বলা হয়ে থাকে অভাব, দুর্দিন, মঙ্গা, নিদান ও দুর্ভিক্ষের কাল পাড়ি দেয় গরিব মানুষ পথেঘাটের কচু-ঘেচু খেয়ে। সত্যি হলেও এসব অবহেলিত কচু-ঘেচুই বাংলাদেশের অভাব ও দুর্যোগ পাড়ি দিতে শক্তি, আহার ও পুষ্টি জোগায়, আয়রনের অভাব পূরণ করে। অসুখে চিকিৎসায় কাজে লাগে। হাওর জলাভূমি থেকে শালুক, কুঁই কুড়িয়ে পুড়িয়ে খায় অনেকেই।

প্রাকৃতিক  খাদ্যসম্পদ আছে বলেই জীবন সংগ্রামে টিকে আছে গেন্দুর মা ও জরিনারা। এই বুনোশাক কুড়িয়ে বাজারে, বাসাবাড়িতে বিক্রি করে জীবন চালাচ্ছেন গেন্দুর মা, জরিনা, শুক্কুরী, আয়শা, আমেনা, আলেহা, মরিয়ম, চায়না, ময়না, নুরজাহান, বিলাসী, কাজলীসহ ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা অঞ্চলের ২১ জন নারী। ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা অঞ্চলের এসব নারীরা বনজঙ্গলে, ডোবা খানাখন্দ পারি দিয়ে, খালবিলের জলে, নদী পেরিয়ে বিপদসংকুল জায়গা বিচরণ করে কুড়িয়ে আনেন এসব বিষমুক্ত পুষ্টিকর খাদ্যসম্পদ। অধিকাংশ নারীর বাড়ি ব্রহ্মপুত্র নদের আশপাশে বিদ্যাগঞ্জ, মুক্তাগাছা, চরকালীবাড়ী, দাপুনিয়া, বাড়েরা, চরনিলক্ষ্মীয়া, নেত্রকোনার মৌগাতি, সাকুয়ার অধিবাসী। এসব শাকের মধ্যে কলমি শাক, হেলেঞ্চা শাক, গোল  হেলেঞ্চা শাক, আগ্রা শাক, কচু শাক, গিমাই শাক, কচুর লতি, থানকুনি পাতা, কলার মোচা, দলকচু, সাঞ্চি, বেতশাক, কলার মোচা, ডুমুর, বউটুনি, শাপলা, ঘ্যাটকল, পেপুল, তেলাকচু, সনচি, কাটানটি, ব্রাহ্মী, তিত বেগুন, কাটাকচু, বন কচু, ডুমুর, কলার মোচা বন আলু। বনকলার থোড় ও মোচা, কলমি,

থানকুনি, বাঁশের কোড়ল, তেলাকুচা, ডেফল, ডেওয়া, গিমা, ঘৃতকাঞ্চন, কালমেঘ, শতমূলির মতো বনজ খাদ্য-ফল-ঔষধিগাছ বিক্রি হতে দেখা যায় ময়মনসিংহ শহরের এই জরিনাদের কাছে। বাংলাদেশের খাল-বিল, নদী-নালা, পতিত জমি, বাড়ির আশপাশেই রয়েছে এসব নাইল্যা-গিমা-কলমি নানান জাতের তিতা শাক। তা খাওয়ার ভেতর দিয়ে বৈশাখ মাসে শুরু করেন মৌসুমি শাক বিক্রি।

বর্ষার দিনে হাওরে মেলে শালুক, পানিফল, ঢ্যাপ, কইর‌্যালি আর মাতুক। চৈত্র মাসের সংক্রান্তিতে তিতা স্বাদের শাক খাওয়ার নিয়ম। প্রতিটি ঋতুর সঙ্গে কুড়িয়ে পাওয়া খাদ্য জগতের সম্পর্কটি দিনে দিনে আর ঠিক থাকছে না। খনা হাজার বছর আগে বচনের মাধ্যমে বলে গিয়েছিলেন ঋতু অনুযায়ী ফল, সবজি, খাদ্য প্রকৃতিতে জন্ম নেয়। আমরা বেশি লাভ ও লোভের কারণে আমাদের প্রাকৃতিক খাদ্য সম্পদকে নষ্ট করছি। খনার বচনে পাওয়া যায় চৈতে গিমা তিতা, বৈশাখে নালিতা মিঠা,/ জ্যৈষ্ঠে অমৃতফল আষাঢ়ে খৈ,/ শাওনে দৈ।/ভাদরে তালের পিঠা, /আশ্বিনে শসা মিঠা,/কার্তিকে খৈলসার ঝোল, /অঘ্রানে ওল।/ পৌষে কাঞ্ছি,/ মাঘে তেল, /ফাল্গুনে পাকা বেল।

 নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে এখনো অনেক বৈচিত্র্যময় বনোশাক, খাদ্য পাওয়া যায়। যেমন : মোরগ শাক,  ইছা শাক,  তেলাকুচা,  খুইরা কাটা,  হেঞ্চি শাক,  বতুয়া শাক,  দুধলি শাক, ন্যাটাপেটা শাক,  কানাই শাক, হেলেঞ্চা, গিমা শাক,  দুরমা পাতা,  চিনতন পাতা,  পুঁইশাক,  কলমি শাক,  সেঞ্চি,  ঢেঁকি শাক,  পিপুল শাক,  শান্তি শাক,  নটেশাক,  চিরকুটি,  ক্যাথাপাটা,  থানকুনি,  কচু শাক,  খুড়েকাটা (কাটানটে),  নুনিয়া শাক, গিন নারিস,  খারকোন,  নুন খুরিয়া (বুলখুরিয়া), গন্ধভাদালি,  শুশনি শাক, তেলাকুচা শাক,  নিলিচি,  মুনসি শাক,  হরি শাক,  থ্যানথ্যানে,  খ্যাটখ্যাটি, বনঝুড়ি , হাগড়া,  চিনিগুড়ি, মরিচপাতা, বনপাট,  হুটকা, মিষ্টি আলু শাক, কলার থোর, শাপলা,  বনতুলসী, কুমাইরা ডোগা, শাজনা পাতা,  মোরগ শাক,  শালুক, কেউরালি, বাঁশের ক্যারল,  হিজগাডু।

খাদ্য, পানীয়, চিকিৎসা বা গৃহস্থালি উপকরণ হিসেবে নয়; কুড়িয়ে পাওয়া উদ্ভিদবৈচিত্র্য ঘিরে রচিত হয় প্রতিদিন আমাদের সংস্কৃতি, পার্বণ ও সামাজিক বন্ধনগুলো। ভাদ্র মাসে ওঁরাও, মু-া, সাঁওতাল আদিবাসীরা আয়োজন করে কারাম বা করম উৎস। কারাম পূজার দিন উপবাসী কিশোরী ও ছোট ছেলেরা মিলে আশপাশের গ্রামীণ বন থেকে ধানের পাতা, কাদোফুল, দুপুর ফুল, সন্ধ্যামালতী ফুল, ঠুরো ফুল (সাদা শাপলা), জবা ফুল, গোলাচি ফুল, তুলসী পাতা, দূর্বা পাতা, বেলপাতা সংগ্রহ করে আনে। এগুলো দিয়ে ‘ফুলঝাড়ি’ তৈরি করা হয়। পূজার সময় অঞ্জলি নিতে এই ফুলপাতা ব্যবহৃত হয়। গ্রামীণ জনগণ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় প্রজাতিগুলো আলাদা করেছেন, নাম দিয়েছেন। অনেকেই শুশনি বা ব্রাহ্মী শাকের সঙ্গে আমরুল শাককে গুলিয়ে ফেলেন।

হাওর জলাভূমি থেকে শালুক কুড়িয়ে পুড়িয়ে খায় অনেকেই।  হেমন্তকালে খাল-বিল-হাওর-বাঁওড় জলাভূমি শুকিয়ে গেলে গ্রামীণ জনপদে নামে দেশি মাছ ধরার ঢল। এখনো দেশি ছোট মাছ হেমন্তাকালেই গ্রামীণ জীবনে কিছুটা হলেও জোটায় পারিবারিক খাদ্য ও পুষ্টিচাহিদা। রাষ্ট্রীয় প্রচার-প্রচারণায় ‘বেশি করে মলা-ঢেলা মাছ খান, রাতকানা রোগ কমান ও চোখের জ্যোতি বাড়ান’ বিজ্ঞাপন দিলেও দেশজুড়ে গড়ে ওঠা মৎস্যপ্রকল্পগুলো কোনোভাবেই দেশীয় মাছবৈচিত্র্য সংরক্ষণে উদ্যোগী নয়। নতুন প্রজন্ম দেশীয় ছোট মাছ খেতে পারে না বলেই তারা দিনে দিনে চোখের সমস্যা, হাড়ের সমস্যা, রিকেটসহ নানান ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে বলে অনেকে মত দেন। গ্রামীণ জনগণের পুষ্টির জন্য কুড়িয়ে পাওয়া সব খাদ্য উৎসের বৈচিত্র্যকে উদ্ভিদ বৈচিত্র্যগুলো, যা মানুষের খাদ্যদ্রব্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আবার যেগুলো মানুষ খায় না সেগুলো পশুখাদ্য হিসেবেও স্বীকৃত। শুক্কুরী বেগম বলেন, আগে আছিল গরিরের খাওন, এখন হইছে ধনীর খাওন। ধনী লোহেরা এহন এই হাগ (শাক) কিইন্যা নেয়। জানা যায়, প্রতিজন দিনে তিনশ থেকে সাড়ে তিনশ টাকার বিক্রি করে থাকেন। প্রতি মাসে আয় করেন নয় হাজার টাকার মতো।

কিন্তু দিন দিন বনাঞ্চল কমে যাচ্ছে, ভরাট হয়ে যাচ্ছে পুকুর ডোবা নালা,  হাওর, নদী, দিন দিন বাড়ছে বসতি, উজার হচ্ছে বনাঞ্চল। এখন আর আগের মতো বুনোশাক পাওয়া যায় না। তারপরও যে জমিতে যতটুকু শাক পাওয়া যায় তার অনেকটিই ছাগল, ভেড়া, গরু-মহিষে খেয়ে ফেলে। কারণ প্রাকৃতিক এসব খাদ্যে আছে পুষ্টি, আমাদের রোগবালাইয়ের সমাধান, পুষ্টির সমাধান ও অর্থনৈতিক মুক্তি।

লেখক : পরিবেশকর্মী ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী, বারসিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত