বৃষ্টিভেজা রঙের গল্প

আষাঢ় মানেই বর্ষার আগমনী বার্তা। বর্ষার সঙ্গে নীল রঙের সম্পর্ক বহু পুরনো। প্রকৃতির রূপের সঙ্গে নীল রঙ দারুণভাবে মিলে যায়। তাই বর্ষাকালে আকাশি, ফিরোজা বা গাঢ় নীল রঙের পোশাক শুধু চোখে আরামই দেয় না, বরং ঋতুর সৌন্দর্যকেও আরও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলে। লিখেছেন মোহসীনা লাইজু

টানা বৃষ্টি, কাদা আর ভ্যাপসা গরমের এই সময়ে পোশাক নির্বাচনে বাড়তি খেয়াল রাখতে হয়। আরাম, দ্রুত শুকানোর সুবিধা এবং আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে চলার বিষয়টি গুরুত্ব পায় সবচেয়ে বেশি। বর্ষায় স্বাচ্ছন্দ্য ও ফ্যাশন বিবেচনা করে পোশাক বেছে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। সবচেয়ে বেশি ঝামেলা হয় বর্ষাকালে পোশাক আশাক নিয়ে। কোন ধরনের পোশাক পরবেন, তার রঙ কেমন হবে। ফেব্রিকস কতটা উপযোগী হবে এসব জানা থাকা দরকার। এসব বিবেচনায় রেখেই সাজগোজ করতে হবে সেটা অফিস, ক্লাস কিংবা বিয়েবাড়িই হোক না কেন। 

পোশাকে নীলের আধিপত্য

বর্ষাকালে পোশাক নির্বাচনে ফ্যাশনের চেয়ে আরাম ও ব্যবহারিক দিকটিই বেশি গুরুত্ব পায়। এ সময় মেয়েদের জন্য সুতি, কটন ব্লেন্ড, লিনেন কিংবা রেয়ন কাপড়ের সালোয়ার-কামিজ, কুর্তা ও টপস সবচেয়ে উপযোগী। এসব কাপড় হালকা, বাতাস চলাচল করে সহজে এবং ভিজে গেলেও দ্রুত শুকিয়ে যায়। বর্ষার মেঘলা আবহের সঙ্গে মিল রেখে আকাশি, সবুজ, ল্যাভেন্ডার, হালকা গোলাপি কিংবা অফ- হোয়াইট রঙের পোশাক যেমন প্রশান্তির অনুভূতি দেয়, তেমনি উজ্জ্বল হলুদ, কমলা বা ফুশিয়া রঙও এনে দিতে পারে প্রাণবন্ততা। ডিজাইনের ক্ষেত্রে ভারী কারুকাজ, অতিরিক্ত লেইস বা ঘেরযুক্ত পোশাকের পরিবর্তে সরল কাটের স্ট্রেইট কুর্তা, এ-লাইন কামিজ কিংবা ঢিলেঢালা টপস বেশি সুবিধাজনক। ছোট ফুলেল নকশা, প্রকৃতি-প্রাণিত প্রিন্ট, ব্লক প্রিন্ট বা মিনিমাল মোটিফ বর্ষার আবহের সঙ্গে দারুণ মানিয়ে যায়। পাশাপাশি ফ্রিকোয়াটার হাতা কিংবা হাতাকাটা নকশাও বেছে নিতে পারেন।

বর্ষায় শাড়ি হিসেবে শিফনের চাহিদা তুঙ্গে। অনেকেই জরি সুতা, চুমকির কাজ করা শাড়ি পছন্দ করেন। কিন্তু বর্ষাকাল এমন পোশাক পরার জন্য উপযুক্ত নয়। বৃষ্টিতেই শাড়ির কাজ নষ্ট হতে পারে। তাই জরি সুতা বা চুমকির কাজ ছাড়া শাড়ি পরতে চেষ্টা করুন। এক্ষেত্রে বেছে নিতে পারেন শিফনের গাঢ় রঙের শাড়ি। এই শাড়ির ট্রেন্ডও চলছে। একরঙা বা দুই শেডের শিফন পরতে পারেন। ইচ্ছা হলে প্রিন্টেড শাড়িও পরা যায়। পছন্দের ডিপ নেকের ব্লাউজ, কানে বড় ঝুমকা আর হালকা মেকআপ, খোঁপায় বেলির মালা পরে একদম পারফেক্ট লুক নিয়ে আসতে পারেন এই আষাঢ়ে।

বর্ষার সময় দাওয়াতে একটু গর্জিয়াস শাড়ি না হলেই নয়। এক্ষেত্রে বেছে নিতে পারেন জর্জেট বেনারসি। দেখতে ভারী লাগলেও এই শাড়ি ওজনে খুব হালকা। বর্ষায় সহজে সামলানো যায়। জর্জেট বেনারসি শাড়ির সঙ্গে ট্র্যাডিশনাল লুক কিন্তু বেশ মানিয়ে যাবে। সঙ্গে খোঁপা বা বেণীতে সেট করে নিন গাজরা বা শাড়ির সঙ্গে মেলানো গোলাপ।

হালফ্যাশনে অরগ্যাঞ্জা শাড়ির কদর অনেক। বর্ষায় বিয়েবাড়ি থাকলে এই শাড়িও রাখতে পারেন পছন্দের তালিকায়। খুব হালকা হয় এই শাড়ি। দেখতেও গর্জিয়াস লাগে। ফ্লোরাল মোটিফের অরগ্যাঞ্জা শাড়ির ট্রেন্ড এখন খুব চলছে। কনট্রাস্ট ব্লাউজ, একটু ভারী ওয়াটরপ্রুফ মেকআপ আর ছিমছাম গয়নার সঙ্গে এই শাড়ি মানাবে। বর্ষার উৎসব আয়োজনে শাড়ি পরতে চাইলে ভারী শাড়ি এড়িয়ে চলুন। হালকা শাড়ির সঙ্গে বেছে নিন ভারী নকশার ব্লাউজ। গয়নাগাটি পরুন সামঞ্জস্য রেখে। ভারী মেকআপ না করে নিজেকে মিনিম্যালিস্টিক মেকআপে তুলে ধরুন।

কেমন পোশাক বাছাই করবেন

বর্ষাকালে খুব ভারী নকশার সালোয়ার-কামিজ বা শাড়ি পরলে অনেক সময়ে ভিজে গিয়ে পায়ে জড়িয়ে যায়। শাড়ি যত হালকা হবে, বর্ষার সাজ ততই আরামদায়ক হবে। সুতির পোশাকে কাদার দাগ বসে যেতে সময় লাগে না, তাই তা এড়িয়ে চলাই ভালো। হালকা কিংবা প্যাস্টেল শেডের পোশাক কিংবা গাঢ় রঙের পোশাক বা শাড়ি বেছে নিন। দাগ লাগলেও বোঝা যাবে না। গোলাপি, বেগুনি, লাল, হলুদ, নীলের বিভিন্ন শেড বেছে নিতে পারেন। কারণ কাদা বা ময়লা লেগে গেলে সেটা বোঝা যাবে না যদি রঙ গাঢ় হয়।

বর্ষার পোশাক নিয়ে ফ্যাশন হাউজ বিশ্ব রঙের স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার বিপ্লব সাহা বলেন, ফ্যাশন সচেতন মানুষের দুর্বলতার একটা জায়গা হচ্ছে বর্ষা ঋতু। যখন অল্প বৃষ্টি থাকে তখন একটা গুমোট ভাব তৈরি হয়। একটানা বৃষ্টি হলে ঠান্ডা লাগে। এ ছাড়া বেশিরভাগ সময় গরমটা থেকেই যায় যদি পরিষ্কারভাবে বৃষ্টিটা না হয়। সকালে যখন কেউ বের হয় তখন একটা টেনশন থাকে, বৃষ্টি হবে কী হবে না তা নিয়ে। পোশাক নিয়েও তাই থাকে বাড়তি ভাবনা। বর্ষাকালে সুতি কাপড়টা এড়ানো ভালো। যদিও ভ্যাপসা গরমের মধ্যে সুতি কাপড়টা আরামদায়ক। ঝামেলা হচ্ছে সুতি কাপড়টা ভিজে গেলে শুকাতে দেরি হয়।

অনেকের সুতা, জরি, চুমকির কাজ করা পোশাক বা শাড়ি পছন্দ। কিন্তু বৃষ্টিতেও নষ্ট হয়ে যেতে পারে এর কারুকাজ। তাই এ সময়ে সুতা-জরির কাজ ছাড়া পোশাক বা  শাড়ি পরাই সুবিধাজনক। এ সময় বেশি ঘের দেওয়া কামিজ, ফ্রক যেমন পরা উচিত না তেমনি শাড়ি প্লিট করে পরাই ভালো। বিভিন্ন ধরনের ড্রেপিং স্টাইল ফ্যাশনে ভীষণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কেবল পোশাক পরলেই হলো না, এর সঙ্গে হিল পরতে ভালোবাসলেও বর্ষায় কিন্তু খুব বেশি উঁচু হিল না পরাই ভালো। ফ্ল্যাট জুতা কিংবা ব্যালেরিনা বর্ষার জন্য ভালো। হালকা ও দ্রুত শুকায় এমন সিন্থেটিক জর্জেট, শিফন, ক্রেপ উপযুক্ত ফেব্রিকস বর্ষার সময়ে আরামদায়ক। দ্রুত শুকায়, ভেজালেও ভারী হয় না। বর্ষায় একটা গরম থাকে। তাই কটন ব্লেন্ড বা মালাই কটন পরতে পারেন। বাতাস চলাচল করবে, আরামদায়ক হবে।

বর্ষায় কাদা বা পানি ছিটে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই গাঢ় রঙ যেমন নেভি ব্লু, বারগান্ডি, কালো, গাঢ় সবুজ এগুলো দাগ ঢেকে রাখে। ছোট ও হালকা প্রিন্ট বা সিম্পল ডিজাইন ভারী কাজ বা এমব্রয়ডারি বর্ষাকালে অসুবিধা তৈরি করতে পারে। বরং হালকা ডিজাইন বা ব্লক প্রিন্ট ভালো পছন্দ। শাড়ির নিচের প্রান্ত যেন মাটি বা কাদায় না লাগে সে জন্য একটু চটপটে করে ড্রেপ করা ভালো। বর্ষায় শাড়ির সঙ্গে একটু কনট্রাস্ট ব্লাউজ ব্যবহার করুন। ওয়াটারপ্রুফ ফেব্রিক বা স্লিভলেস ব্লাউজ আরামদায়ক। ছোট হ্যান্ডব্যাগ বা ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ রাখুন সঙ্গে। বৃষ্টিবান্ধব জুতা বেছে নিতে নিন।

কোথায় পাবেন

রাজধানীসহ দেশের যেকোনো শপিংমল ও ফ্যাশন হাউজে মিলবে বর্ষার বিশেষ পোশাক। পোশাকের ধরন ও কোয়ালিটি অনুযায়ী দাম কম-বেশি হতে পারে। স্থানীয় ডিজাইনার বা কাস্টম টেইলারদের কাছে থিমেটিক প্রিন্ট ও হ্যান্ডপেইন্ট করা শাড়ি পাওয়া যায় বর্ষা মেজাজে। ফ্যাশন হাউজগুলোতেও মিলছে বর্ষা-ভাবনার ভরপুর কালেকশন। বিশ্ব রঙের শোরুমগুলোতেও চলছে বর্ষা উপলক্ষে নীল উৎসব। এছাড়া অঞ্জনস, হরীতকী, গুটিপোকা, রঙ বাংলাদেশ, কে ক্রাফটে পেয়ে যাবেন আপনার পছন্দের নকশার পোশাক। অনলাইন পেজগুলো তো আছেই, যেখান থেকে আপনি ঘরে বসেই পছন্দের পোশাকটি কিনে নিতে পারবেন।