দুনিয়ার মর্যাদা তুচ্ছ। অবস্থান নগণ্য। এর দুঃখ-কষ্ট বারবার ফিরে আসে। বেদনার শেষ নেই। এর নির্মলতা কলুষতার সঙ্গে মিশ্রিত। মাধুর্যের সঙ্গে তিক্ততা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর শুরু কষ্টে। আর শেষ ধ্বংসে। এর আগমন প্রতারণাময়। আর বিদায় বেদনাময়। এর ভোগ-বিলাস ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু এর দায়দায়িত্ব স্থায়ী। এর হালাল ভোগের হিসাব দিতে হবে। আর হারাম ভোগের জন্য রয়েছে শাস্তি।
এটাই সেই দুনিয়া, যা দ্রুত বিলীন হয়ে যাবে। অচিরেই যার অবসান ঘটবে। এর জনপদ ধ্বংস হয়ে যাবে। এর সৌন্দর্য মøান হবে। আনন্দ-উল্লাস ছিন্নভিন্ন হবে। সবুজ-শ্যামলিমা নিশ্চিহ্ন হবে। তবুও কত মানুষ এর প্রতি আকৃষ্ট হয়! কত মানুষ এর প্রেমে পড়ে! কত মানুষ এর সন্তুষ্টির জন্য নিজের জীবন বিকিয়ে দেয়! কত মানুষ প্রবৃত্তির সাগরে ডুবে গিয়ে শুধু দুনিয়ার জন্যই বেঁচে থাকে এবং এর পরের জীবনের কথা চিন্তা করে না! ফলে সে স্থায়ী দুশ্চিন্তা ও অবিরাম ক্লান্তির মধ্যে জীবন কাটায়।
হে আল্লাহর বান্দারা! পবিত্র কোরআন ও নবীজি (সা.)-এর বাণী আমাদের সামনে এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার প্রকৃত স্বরূপ স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। মহান আল্লাহ এর তুচ্ছতা বর্ণনা করে বলেন, ‘তোমরা জেনে রাখো, পার্থিব জীবন তো কেবল খেল-তামাশা, আনন্দ-উপভোগ, সাজসজ্জা, পারস্পরিক গর্ব, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি নিয়ে প্রতিযোগিতা মাত্র। এর দৃষ্টান্ত সেই বৃষ্টির মতো, যার উৎপন্ন ফসল কৃষকদের মুগ্ধ করে। তারপর তা শুকিয়ে যায়, তখন তুমি তা হলুদ বর্ণের দেখতে পাও, এরপর তা খড়কুটোয় পরিণত হয়। আর আখেরাতে রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। পার্থিব জীবন তো প্রতারণার সামগ্রী ছাড়া কিছুই নয়।’ (সুরা হাদিদ ২০)
মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে আরও বলেন, ‘হে মানুষ! নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। অতএব পার্থিব জীবন যেন তোমাদের প্রতারিত না করে এবং প্রতারক শয়তান যেন আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদের বিভ্রান্ত না করে।’ (সুরা ফাতির ৫)
হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহর কাছে যদি দুনিয়ার মূল্য একটি মশার পাখার সমানও হতো, তাহলে তিনি কোনো কাফেরকে এর এক ঢোক পানিও পান করাতেন না।’ (জামে তিরমিজি ২৩২০)
একদা রাসুল (সা.) একটি মৃত ছাগলের বাচ্চার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যার কান ছিল ছোট অথবা কাটা। তিনি সেটির কান ধরে সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের কেউ কি এক দিরহামের বিনিময়ে এটি নিতে চাও?’ তারা বললেন, ‘আমরা তো এটি কোনো কিছুর বিনিময়েও নিতে চাই না। এটি দিয়ে আমরা কী করব?’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘তোমরা কি চাও এটি তোমাদের হোক?’ তারা বললেন, ‘আল্লাহর কসম! যদি এটি জীবিতও হতো, তবুও এর কাটা কান থাকার কারণে এটি ত্রুটিপূর্ণ গণ্য হতো। আর এখন তো এটি মৃত!’ তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আল্লাহর কাছে দুনিয়া এর চেয়েও বেশি তুচ্ছ, যেমন তোমাদের কাছে এই মৃত প্রাণীটি তুচ্ছ।’ (সহিহ মুসলিম)
হে ইমানদার ভাইয়েরা! জ্ঞানী ব্যক্তি সেই, যে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন হয়। সে দুনিয়ার চাকচিক্যে প্রতারিত হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করে এবং অন্যদেরও এ ফেতনা থেকে সতর্ক করে।
ফিরআউনের পরিবারের সেই মুমিন ব্যক্তি বলেছিলেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! এ পার্থিব জীবন তো সাময়িক ভোগমাত্র, আর আখেরাতই হলো স্থায়ী আবাস।’ (সুরা গাফির ৩৯) আর হেদায়েতের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়া নিয়ে প্রতিযোগিতার ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের জন্য দারিদ্র্যের ভয় করি না। বরং আমি ভয় করি, তোমাদের জন্য দুনিয়া উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল। তখন তোমরাও তাদের মতো এর জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে এবং তা তোমাদেরও ধ্বংস করবে, যেমন তাদের ধ্বংস করেছিল।’ (সহিহ বুখারি ৩১৫৮)
হজরত ওসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, ‘দুনিয়া সবুজ-শ্যামল ও আকর্ষণীয় করে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। অনেক মানুষ এর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। অতএব, তোমরা দুনিয়ার ওপর ভরসা করো না এবং এর প্রতি নির্ভরশীল হয়ো না।’
একবার ইমাম হাসান বসরি (রহ.)-এর কাছে দুনিয়ার কথা উল্লেখ করা হলে তিনি বলেন, ‘দুনিয়া ঘুমন্ত মানুষের স্বপ্নের মতো অথবা বিলীন হয়ে যাওয়া ছায়ার মতো। বুদ্ধিমান ব্যক্তি কখনো এর দ্বারা প্রতারিত হয় না।’
হে আল্লাহর বান্দারা! কিছু মানুষের অন্তরে দুনিয়া এমনভাবে প্রোথিত হয়ে যায় এবং তাদের অনুভূতি ও বিবেককে এমনভাবে গ্রাস করে, তারা এর কামনা-বাসনায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের পথে চলে যায়। তাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তারা পার্থিব জীবন নিয়ে আনন্দে মেতে উঠেছে।’ (সুরা রাদ ২৬)
উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়, মানুষের উদ্দেশ্য, আকাক্সক্ষা ও পরিণতির দিক থেকে তারা দুই শ্রেণির। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে আখেরাতের ফসল কামনা করে, আমি তার ফসলে প্রবৃদ্ধি দান করি। আর যে দুনিয়ার ফসল কামনা করে, আমি তাকে তা থেকে কিছু দিই, কিন্তু আখেরাতে তার কোনো অংশ থাকবে না।’ (সুরা শুরা ২০)
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘দুনিয়ায় এমনভাবে বসবাস করো, যেন তুমি একজন অপরিচিত পথিক অথবা মুসাফির।’ (সহিহ বুখারি ৬৪১৬)
হে আল্লাহর বান্দারা! একজন মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। দুনিয়ার প্রকৃত বাস্তবতা উপলব্ধি করে এর প্রতি অনাসক্ত হওয়া মানে এই নয় যে, সে সন্ন্যাসবাদের পথ গ্রহণ করবে, জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, কাজকর্ম ছেড়ে দেবে কিংবা আল্লাহ যে বস্তুগুলো হালাল করেছেন, সেগুলো নিজের জন্য হারাম করে নেবে। বরং একজন মুমিন পৃথিবীকে আবাদ করার জন্য আদিষ্ট। তাকে পবিত্র জীবিকা ভোগ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তাকে হালাল উপার্জনের চেষ্টা করতে বলা হয়েছে এবং শরিয়তের সীমারেখার মধ্যে থেকে অপচয় ও অহংকার ছাড়া তা ভোগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে, একজন মুমিনের দুনিয়াবিমুখতা তাকে সমাজ সংস্কারের দিকে আহ্বান করে। সে তাওহিদ, ইমান ও সুন্নাহর প্রচার করে এবং শিরক, অনাচার ও ফেতনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। দুনিয়ার নিন্দা সম্পর্কিত যেসব আয়াত ও হাদিস এসেছে, সেগুলোর উদ্দেশ্য পৃথিবী, জীবন বা সময়ের নিন্দা করা নয়। বরং উদ্দেশ্য হলো দুনিয়ার মধ্যে সংঘটিত পাপাচার, অবাধ্যতা এবং আল্লাহর আনুগত্য থেকে মানুষকে গাফেল করে দেওয়া বিষয়গুলোর নিন্দা করা।
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, ‘বাস্তবে দুনিয়া নিজে নিন্দিত নয়। নিন্দা প্রযোজ্য হয় মানুষের কর্মকাণ্ডের ওপর। দুনিয়াই আখেরাতের ভিত্তি এবং এর শস্যক্ষেত্র। এখানেই মানুষ ইমান অর্জন করে, আল্লাহর পরিচয় লাভ করে, তার ভালোবাসা ও স্মরণে মগ্ন হয় এবং তার সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করে। জান্নাতবাসীরা জান্নাতে যে উত্তম জীবন লাভ করবে, তা এই দুনিয়াতেই বপন করা আমলের ফল। দুনিয়ার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য এটুকুই যথেষ্ট।’
হে মুসলিম জাতি! রাত-দিনের আবর্তন এবং মাস-বর্ষ অতিবাহিত হওয়ার বিষয়টি বোধসম্পন্ন মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় উপদেশ। এক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছেন, ‘যে মানুষের একটি দিন তার এক মাসকে ধ্বংস করে, এক মাস তার এক বছরকে ধ্বংস করে এবং এক বছর তার সমগ্র আয়ুকে ক্ষয় করে, সে কীভাবে দুনিয়া নিয়ে আনন্দিত হতে পারে? যে মানুষের আয়ু তাকে মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এবং জীবন তাকে কবরের দিকে এগিয়ে দিচ্ছে, সে কীভাবে দুনিয়ার মোহে মত্ত হতে পারে?’
মুহাম্মাদ (সা.) দুনিয়াবিমুখতার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘দুনিয়ার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক? আমার এবং দুনিয়ার উদাহরণ সেই আরোহীর মতো, যে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়, অতঃপর তা ছেড়ে চলে যায়।’ (জামে তিরমিজি ২৩৭৭) কত মহান ছিল তার দুনিয়াবিমুখতা! আপনারাও তার পদাঙ্ক অনুসরণ করুন, তার হেদায়েতের পথ অবলম্বন করুন।
হে আল্লাহ! ফিলিস্তিনে এবং পৃথিবীর সর্বত্র আমাদের মুসলিম ভাইদের সাহায্য করুন। তাদের দুঃখ দূর করুন, কষ্ট লাঘব করুন, পারস্পরিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করুন, তাদের দায়িত্বভার গ্রহণ করুন, তাদের ক্ষুধা দূর করুন, ভয়-ভীতি থেকে নিরাপত্তা দান করুন, তাদের বিচ্ছিন্নতা দূর করে ঐক্যবদ্ধ করুন এবং তাদের পক্ষে কৌশল অবলম্বন করুন।
১২ জুন শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান