২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই ডিআর কঙ্গোর সাথে ১-১ গোলে ড্র করে পয়েন্ট হারিয়েছে পর্তুগাল। তবে এই ড্রয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে ঘিরে তৈরি হওয়া এক দমবন্ধ পরিস্থিতি। বৃটিশ দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর খ্যাতনামা ফুটবল বিশ্লেষক রিচার্ড জলি এই ম্যাচটিকে পর্তুগালের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা উল্লেখ করে লিখেছেন— 'পর্তুগাল আজ খেলেছে ১০ জন খেলোয়াড় আর একটা মূর্তি নিয়ে! রোনালদোর ইগোকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে পর্তুগাল আরও একটি বিশ্বকাপ বিসর্জন দেওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।'
ম্যাচের ঠিক আগের দিন আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে লিওনেল মেসি প্রমাণ করেছেন তাঁর জাদু এখনো অমলিন। বিশ্বকাপে মেসির গোল এখন ১৬টি, যা রোনালদোর দ্বিগুণ। আর্জেন্টিনা যেখানে একজন বয়স্ক কিংবদন্তিকে কেন্দ্র করে পুরো গতিময় দল গড়ে তুলেছে, সেখানে পর্তুগালের কৌশল যেন রোনালদোর কারণে থমকে গেছে।
টানা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নেমেও বিশ্বমঞ্চে টানা ১০ ম্যাচ বা ৮০১ মিনিট গোলহীন রইলেন ৪১ বছর বয়সী রোনালদো। পুরো ম্যাচে ৮০ শতাংশ সময় বল দখলে রাখলেও পর্তুগালের প্রত্যাশিত গোল ছিল মাত্র ০.৬৯। এর প্রধান কারণ, বক্সে রোনালদোর অনড় উপস্থিতি। ডিফেন্ডারদের পেছনে ফেলে গতিতে ছুটে যাওয়ার বা ড্রিবলিং করে জায়গা তৈরি করার ক্ষমতা তিনি হারিয়েছেন। ফলে তিনি কেবল মাঠের প্রান্তে দাঁড়িয়ে রইলেন, যা পর্তুগালের আক্রমণভাগকে পুরোপুরি অচল করে দেয়।
পর্তুগাল দলে রোনালদোকে এক ধরণের অন্ধ ‘বিশেষ সুবিধা’ দেওয়া হচ্ছে। ম্যাচের পারফরম্যান্সের বিচারে আক্রমণভাগের দুই তারকা বার্নার্দো সিলভা এবং পেদ্রো নেতোকে তুলে নেওয়া হলেও পুরো ৯০ মিনিট মাঠে রেখে দেওয়া হয় অফ-ফর্মে থাকা রোনালদোকে। এমনকি ম্যাচের একপর্যায়ে ব্রুনো ফার্নান্দেজ পেছনে ফাঁকা জায়গায় বলের জন্য দাঁড়িয়ে থাকলেও রোনালদো নিজেই গোলমুখে দুর্বল শট নেন, যা নিয়ে ব্রুনোকে প্রকাশ্যে মাঠে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়।
ইউরো ২০২৪-এর মতোই কোচ রবার্তো মার্তিনেস রোনালদোকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার সাহস দেখাতে পারছেন না। সাবেক ফুটবলার ও পণ্ডিতদের মতে, মার্তিনেস আসলে এই দলের ম্যানেজার নন, তিনি রোনালদোর নামের ওপর সিদ্ধান্ত চাপাতে ভয় পাচ্ছেন।
আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বাছাই পর্বের ম্যাচে লাল কার্ড দেখার কারণে এই ম্যাচে রোনালদোর নিষিদ্ধ থাকার কথা ছিল। কিন্তু ফিফা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের "বিখ্যাত তারকাদের প্রতি অতি-আগ্রহের" কারণে তাঁর সেই শাস্তি স্থগিত করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, রোনালদো এই ম্যাচে না খেললে পর্তুগাল বাধ্য হতো তাঁকে ছাড়া বিকল্প কোনো ছকে খেলতে, এবং রাফায়েল লেয়াও ও ফ্রান্সিসকো কনসেইসাওদের গতিকে ব্যবহার করে হয়তো কঙ্গোকে সহজেই হারিয়ে দিত।
শুধু সংবাদমাধ্যমই নয়, বিবিসির এক আলোচনায় ফ্রান্সের সাবেক ডিফেন্ডার গায়েল ক্লিশি এবং ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার ক্রিস সাটনও মার্তিনেসের কৌশলের কড়া সমালোচনা করেছেন। ক্লিশি বলেন, "রোনালদোর মতো অতি-মানবিক চরিত্রের উপস্থিতি অনেক সময় দলের বাকি তরুণদের স্বাভাবিক সহজাত খেলা কেড়ে নেয়। তাঁর জন্য দল বারবার উইং দিয়ে ক্রস করার চেষ্টা করছিল, যা খেলাকে একঘেয়ে করে তুলেছে।" অন্যদিকে সাটন পর্তুগালের এই পারফরম্যান্সকে 'প্রাণহীন' ও 'কষ্টদায়ক' বলে মন্তব্য করেন।
তবে রোনালদোর সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড সতীর্থ ওয়েন রুনি তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে বলেছেন, "দোষ রোনালদোর নয়, পর্তুগালের খেলায় আজ কোনো গতি ছিল না। রোনালদোকে বক্সে সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে, সুযোগ পেলে তিনি এখনো গোল করবেন।"
সৌদি প্রো লিগ বা নেশনস লিগের গোল যে বিশ্বকাপের মতো এলিট টুর্নামেন্টে কোনো প্রভাব ফেলে না, কঙ্গো ম্যাচটি তা আবারও প্রমাণ করল। এখন দেখার বিষয়, আগামী ম্যাচে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে কোচ রবার্তো মার্তিনেস কোনো সাহসী সিদ্ধান্ত নেন, নাকি রোনালদোর নামের আড়ালেই ঢাকা পড়ে থাকবে পর্তুগালের সোনালী প্রজন্মের বিশ্বকাপ স্বপ্ন।