হোসেন জিল্লুর বললেন

প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা দুর্নীতির মতোই ক্ষতিকর

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও কার্যক্রমের দুর্বলতা রাষ্ট্রীয় সম্পদের বড় ধরনের অপচয়ের কারণ হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেছেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, দুর্নীতির মতোই বাস্তবায়ন ব্যর্থতাও সমান ক্ষতিকর। কারণ উভয় ক্ষেত্রেই জনগণের অর্থের কার্যকারিতা নষ্ট হয় এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।

গতকাল বুধবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে পিপিআরসি কার্যালয়ে আয়োজিত ‘ওয়াশ পোস্ট বাজেট’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

ওয়াশ খাতে বাজেট বিশ্লেষণ নিয়ে হোসেন জিল্লুর বলেন, কার্যকর মনিটরিংয়ের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য কাঠামো অপরিহার্য। কিন্তু এ খাতের জন্য আলাদা বাজেট কোড না থাকায় প্রকৃত বরাদ্দ ও ব্যয়ের চিত্র স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় না। ফলে প্রকল্পভিত্তিক নথি ঘেঁটে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম চিহ্নিত করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ এবং বিশ্লেষণকে জটিল করে তোলে। এ ক্ষেত্রে আলাদা বাজেট কোড থাকলে শুধু তথ্যপ্রাপ্তিই সহজ হতো না, বরং সরকারের অগ্রাধিকার নির্ধারণও পরিষ্কারভাবে প্রতিফলিত হতো এবং জবাবদিহিতা জোরদার করা যেত। বর্তমান ব্যবস্থায় সেই স্বচ্ছতা অনুপস্থিত থাকায় নীতিনির্ধারণ ও পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়াও দুর্বল হয়ে পড়ে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি করার প্রবণতা উল্লেখ করে জিল্লুর রহমান বলেন, অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ না হয়ে বছরের পর বছর পিছিয়ে যাচ্ছে। ২০২০ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্প ২০২৬ সাল পর্যন্ত গড়ানোর উদাহরণ এখন অস্বাভাবিক নয়। এই ‘ওভারডিউ প্রজেক্ট’ প্রবণতা উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় একটি কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়, যা আরও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আনা প্রয়োজন। তিনি বলেন, দুর্নীতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা থাকলেও কাজে ব্যর্থতার বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়। অথচ একটি প্রকল্পে দুর্নীতি না থাকলেও যদি দক্ষতার অভাব, সমন্বয়হীনতা বা দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং সময় নষ্ট হয়, তাহলে তার আর্থিক প্রভাব দুর্নীতির মতোই হয়ে দাঁড়ায়।

প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থতার দুটি কারণ উল্লেখ করে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান জানান, একটি বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং অন্যটি অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হলেও তা কার্যকরভাবে পরিচালিত হয় না। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে এ সমস্যা বেশি, যেখানে স্থাপনা থাকলেও সেবা নিশ্চিত করা যায় না।

খাল খনন কর্মসূচির প্রসঙ্গে জিল্লুর রহমান বলেন, এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও একে বৃহত্তর পানি ব্যবস্থাপনার কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভূপৃষ্ঠস্থ পানির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে কৃষি ও সুপেয় পানির চাহিদা পূরণে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি হিসেবে না দেখে এটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হওয়া উচিত।

পাবলিক টয়লেট ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তিনি বলেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না, এর টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। শহরের শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনো নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অনেক ক্ষেত্রে পাবলিক টয়লেট নির্মাণের পর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়ে। তাই এসব উদ্যোগকে কেবল বিনিয়োগ হিসেবে না দেখে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির জন্য কার্যকর মডেল তৈরি না হলে অবকাঠামোর সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয় না। উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হলে দুর্নীতি প্রতিরোধের পাশাপাশি বাস্তবায়নের গুণগত মান, সময়ানুবর্তিতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।