আদালতে সেই কিশোরী

শৈশব থেকে যাদের মা-বাবা হিসেবে জেনে বড় হয়েছেন, একদিন হঠাৎ জানতে পারলেন তারা তার বাবা-মা নন। এরপর পরিবর্তন করা হয় তার জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ ও অন্যান্য সরকারি নথিতে থাকা বাবা-মায়ের পরিচয়। অভিযোগ রয়েছে, পরে তাকে বাড়ি থেকেও বের করে দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে নিজের প্রকৃত পরিচয়ের সন্ধানে থাকা ক্লাউডিয়া চৌধুরী এবার আইনের আশ্রয় নিয়েছেন। গতকাল বুধবার রাজশাহীর আদালতে ক্লাউডিয়া চৌধুরী বাদী হয়ে চিকিৎসক ডা. শিপ্রা চৌধুরী এবং তার সহযোগী নাজমুলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রতারণা, জালিয়াতি, মিথ্যা তথ্য প্রদান, অবৈধভাবে পরিচয় পরিবর্তন, জোরপূর্বক হলফনামা করানো, ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলা দায়েরের পর বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. হযরত আলী সাংবাদিকদের জানান, আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়েছে এবং ঘটনার বিস্তারিত তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দিয়েছে। ক্লাউডিয়া চৌধুরীকে শিশুকালে অজ্ঞাত স্থান থেকে নিয়ে এসে ডা. শিপ্রা চৌধুরী নিজের সন্তান পরিচয়ে লালন-পালন করেন। তবে এ ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে অভিভাবকত্ব গ্রহণ বা সমাজসেবা অধিদপ্তরের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, জন্মনিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদ, স্কুলের নথিপত্র সবক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ডা. ওবায়দুর রহমান চৌধুরী ও ডা. শিপ্রা চৌধুরীকে ক্লাউডিয়ার বাবা-মা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে হঠাৎ করে জন্মনিবন্ধনে বাবা-মায়ের নাম পরিবর্তন করে ‘মো. বাবুল’ ও ‘মোসা. টগরী বেগম’ নাম যুক্ত করা হয়, যাদের ক্লাউডিয়া কখনো দেখেননি কিংবা চিনতেন না।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের জুন মাসে ক্লাউডিয়াকে জোরপূর্বক আদালতে নিয়ে গিয়ে একটি হলফনামায় স্বাক্ষর করানো হয়। পরদিন তাকে জানানো হয়, ক্লাউডিয়া তাদের জৈবিক সন্তান নন এবং নির্যাতনের মাধ্যমে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। তার পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্রও ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। ফলে পরিচয় জটিলতার কারণে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি, কলেজে ভর্তি ও অন্যান্য সরকারি কার্যক্রমে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এমনকি তার শিক্ষাজীবনের একটি বছরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৮ সালে জন্মনিবন্ধন করার সময় ক্লাউডিয়ার নাম, জন্মতারিখ এবং বাবা-মায়ের পরিচয় নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়েছিল। পরে ২০২৩ সালে আবার নতুন তথ্য সংযোজন করে জন্মনিবন্ধন সংশোধন করা হয়। শিক্ষা বোর্ডের নথি, এসএসসি রেজিস্ট্রেশন ও প্রবেশপত্রেও একইভাবে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসব পরিবর্তন ক্লাউডিয়ার অগোচরে এবং তার সম্মতি ছাড়া করা হয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

আইনজীবী হযরত আলী দাবি করেন, মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে ক্লাউডিয়ার পাসপোর্টও তৈরি করা হয়েছিল। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর আওতায় আসামিদের বিরুদ্ধে গুরুতর শাস্তির বিধান রয়েছে। নিজের প্রকৃত জন্মপরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য না থাকায় ক্লাউডিয়া চরম মানসিক কষ্টে আছেন। ক্লাউডিয়া বর্তমানে পরিচয় সংকট, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন। বাদীপক্ষের দাবি, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয় বিবেচনায় সম্প্রতি ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক ক্লাউডিয়ার বিয়ে সম্পন্ন করা হয়েছে।

মামলায় বর্তমানে দুজনকে আসামি করা হলেও তদন্তের মাধ্যমে অন্য কোনো ব্যক্তি, কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী। অভিযোগের বিষয়ে ডা. শিপ্রা চৌধুরীর বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি ফোন কেটে দেন। এর আগে বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাব দিতেও তিনি অনাগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।