এক বছর ধরে কমিটিবিহীন

আপডেট : ১৮ জুন ২০২৬, ০৭:০২ এএম

দলের বিবদমান দুটি গ্রুপের সংঘাতের জেরে প্রায় এক বছর আগে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছিল চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির কমিটি। এরপর থেকেই কমিটিবিহীন অবস্থায় রয়েছে বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ এই ইউনিটটি। স্থবির হয়ে আছে সাংগঠনিক কার্যক্রমও। অন্যদিকে আধিপত্য বিস্তার ও ভবিষ্যতের জন্য এলাকা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। এমন পরিস্থিতিতে দলের সাংগঠনিক দায়িত্বশীলদের নীরবতায় ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির একাধিক সাবেক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, কমিটি না থাকায় জেলায় দলীয় কার্যক্রম নেই বললেই চলে। অন্যদিকে কর্মীদের একটি অংশ এখন দলীয় প্রভাবশালীদের নিজস্ব কর্মীতে পরিণত হচ্ছে। তারাই এখন এলাকায়  নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও বিভিন্ন আর্থিকভাবে লাভজনক ক্ষেত্রগুলোতে আধিপত্য বিস্তারে সক্রিয়। অর্থ ও ক্ষমতার মোহে অনেকটা অন্ধ হয়ে পরস্পরের বিরূদ্ধে প্রতিহিংসায় মেতে উঠছে তারা। সাংগঠনিকভাবে কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে তারা। এ অবস্থায় দ্রুত কমিটি গঠন করে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালু ও নেতাকর্মীদের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নেওয়া না হলে তা আগামীতে দলের জন্য বড় ধরনের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

প্রায় এক বছর ধরে উত্তর জেলা বিএনপির কমিটিবিহীন থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, মূলত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের দায়িত্বশীলদের ব্যস্ততার কারণে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এগোয়নি। যেহেতু চট্টগ্রাম উত্তর জেলা দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইউনিট। তাই সেখানে নতুন কমিটি গঠনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আশা করছি, শিগগির দলের চেয়ারম্যান এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।

দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির রাজনীতিতে সাবেক দুই সভাপতি গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও গোলাম আকবর খন্দকারের দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। দুইজনের নির্বাচনী আসন একই (রাউজান) হওয়ায় সেখানকার নেতাকর্মীরাও পুরোপুরি দ্বিধাবিভক্ত। মূলত ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর রাউজানে আধিপত্য বিস্তার করতে মরিয়া হয়ে ওঠে গিয়াস ও আকবর গ্রুপ। উভয় গ্রুপের দ্বন্দ্বে ঘটতে থাকে একের পর এক সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা। পড়তে থাকে একের পর এক লাশ।

২০২৫ সালের ২৯ জুলাই রাউজানের সাত্তার হাট এলাকায় তৎকালীন জেলা সভাপতি গোলাম আকবর খন্দকারের একটি মিছিলে সশস্ত্র হামলা চালায় প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা। এ নিয়ে দুই গ্রুপে ব্যাপক সংঘর্ষে গোলাম আকবর খন্দকারসহ অন্তত ২০ জন নেতাকর্মী আহত হয়। ওই দিনই কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে দলের তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর সব দলীয় পদ স্থগিত করে দেওয়া হয়।

মূলত এরপর থেকে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে। উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ে কিছু কিছু সাংগঠনিক কর্মসূচি পালন করা হলেও জেলা পর্যায়ে কোনো কার্যক্রম নেই। কমিটি বিলুপ্তির পর দলের যেসব নেতা নতুন কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক কিংবা আহ্বায়ক-সদস্য সচিব হওয়ার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে লবিং করেছিলেন তারাও ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ সংসদ সদস্য আবার কেউ কেউ সরকারের অনুকম্পায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পদ-পদবীর দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। আবার কেউ কেউ এখনো প্রহর গুনছেন কমিটির দায়িত্ব পাওয়ার আশায়।

কমিটি বিলুপ্ত হওয়ার অল্প কিছুদিন পর তোড়জোড় শুরু হয়েছিল নতুন কমিটি গঠনের। ওই সময় বিরোধ এড়াতে গোলাম আকবর-গিয়াস কাদেরের বাইরে নেতৃত্বের তৃতীয় ধারা সৃষ্টির কথাও শোনা গিয়েছিল। শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য তখন আলোচনায় এসেছিল বেশ কিছু নাম। এর মধ্যে আহ্বায়ক হিসেবে তৎকালীন দলীয় চেয়ারপারসনের দুই উপদেষ্টা অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী ও এস এম ফজলুল হকের পাশাপাশি ফটিকছড়ি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কর্নেল (অব.) আজিম উল্লাহ বাহার ও সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেনের নাম আলোচনায় ছিল।  সদস্যসচিব হিসেবে নাম উঠে এসেছিল রাঙ্গুনিয়া উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবু আহমেদ হাসনাত ও উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার আলমগীরের নাম। এদের মধ্যে আসলাম চৌধুরী ও সারোয়ার আলমগীর সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেনকে করা হয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান।

ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এভাবে দীর্ঘদিন একটা জেলা ইউনিট কমিটিবিহীন অবস্থায় থাকলে এর আওতাধীন উপজেলা ও পৌরসভা কমিটিগুলোতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এক্ষেত্রে সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সাংগঠনিক কাঠামোয় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এজন্যে দলের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করে দ্রুত কমিটি ঘোষণা করা প্রয়োজন।

ফটিকছড়ি উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবু আহমেদ হাসনাত এ প্রসঙ্গে দেশ রূপান্তরকে বলেন, বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে নেতৃত্বের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে; তবে সেটা হতে হবে সুস্থ প্রতিযোগিতা। মূলত দলীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গেলেই সেটা প্রতিযোগিতাকে ছাড়িয়ে প্রতিহিংসায় রূপ নেয়। এক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। আমরা আশা করছি, উত্তর জেলা কমিটির বিষয়ে সাংগঠনিক দায়িত্বশীলরা শিগগির ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত