ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের সঙ্গে একটি দেশের পরিচয় অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে যায়। আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে সেই নামটি নিঃসন্দেহে লিওনেল মেসি। অনেকেই বলেন, মেসি মানেই আর্জেন্টিনা, আর আর্জেন্টিনা মানেই মেসি। কথাটি হয়তো আবেগের, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বাস্তবতারও বড় একটি অংশ। যার বড় প্রমাণ চলমান বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচে। অসাধারণ, অতুলনীয়, দুর্দান্ত, সুযোগ সন্ধানী এসব বিশ্লেষণেই বিশেষায়িত করা যায় মেসির হ্যাটট্রিক করা তিন গোলকে।
মাঠে মেসির উপস্থিতিই আর্জেন্টিনাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। মেসির পায়ে বল গেলেই প্রতিপক্ষের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়। কারণ তিনি এমন একজন খেলোয়াড়, যিনি মুহূর্তের মধ্যে ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারেন। অফসাইডের ফাঁদ ভেঙে, নিখুঁত পাসে কিংবা অসাধারণ ফিনিশিংয়ে প্রতিপক্ষকে বিপদে ফেলে দেওয়ার ক্ষমতা তার সহজাত। শুধু, গোলই করেন না মেসি, গোল করতে সতীর্থদের সহায়তাও করেন। এখানেই অনন্য মেসি।
মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ধারাবাহিকতা। দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত রেখেছেন তিনি। অনেক কিংবদন্তি ফুটবলার এসেছেন, গেছেন; কিন্তু মেসি এখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বয়স বাড়লেও তার খেলার বুদ্ধিমত্তা, বল নিয়ন্ত্রণ এবং ম্যাচ পড়ার ক্ষমতা তাকে আলাদা করে রেখেছে।
আর্জেন্টিনা দলটিও বর্তমানে বেশ পরিণত। গত বিশ্বকাপজয়ী দলের অনেক খেলোয়াড় এখনো স্কোয়াডে রয়েছেন। তারা এখন আরও অভিজ্ঞ, আরও আত্মবিশ্বাসী। কোচ লিওনেল স্কালোনি দলটিকে এমনভাবে গড়ে তুলেছেন, যেখানে তারকা নির্ভরতার পাশাপাশি দলগত সমন্বয়ও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাস্তবতা হলো, মেসি মাঠে থাকলে এই দলটি অন্যরকম শক্তি পায়। এ ছাড়া গত বিশ্বকাপজয়ী দলের ১৬ জন রয়েছেন এবারের আর্জেন্টাইন দলে। যারা আগের চেয়েও পরিপক্ব হয়েছেন।
গোলপোস্টের নিচে আছেন সময়ের অন্যতম সেরা গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। বড় ম্যাচে তার আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক দৃঢ়তা আর্জেন্টিনার জন্য বিশাল সম্পদ। রক্ষণ, মাঝমাঠ এবং আক্রমণভাগ সব জায়গায় ভারসাম্য থাকলেও দলের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার নাম এখনো মেসি।
বিশ্বকাপ কিংবা বড় কোনো টুর্নামেন্টে একটি বিষয় সবসময়ই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তারকা খেলোয়াড়দের ওপর প্রতিপক্ষের অতিরিক্ত শারীরিক চাপ। মেসির ক্ষেত্রেও সেই শঙ্কা রয়েছে। বয়সের কারণে তার শরীরে আগের তুলনায় কিছুটা ভঙ্গুরতা এসেছে। ফলে বাজে বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ট্যাকলের শিকার হলে শুধু আর্জেন্টিনাই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো টুর্নামেন্ট। এ ছাড়া মেসির বাম পায়ে কিছুটা ব্যথাও রয়েছে বলে মনে হয়। তাই প্রতিপক্ষরা সেই পায়ে বাজে ট্যাকেল করে মাঠ ছাড়তে বাধ্য করবে। সেই ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না ফুটবলের বরপুত্রকে। এ ছাড়া রেফারিরও উচিত তার দিকে বেশি নজর দেওয়া।
ফুটবলপ্রেমীদেরও তাই একটি প্রত্যাশা রয়েছে। তারা চান, মেসি মাঠে থাকুন, নিজের সেরাটা উপহার দিন। একইভাবে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা নেইমারের মতো তারকারাও যেন অপ্রয়োজনীয় আঘাতের শিকার না হন। কারণ এসব খেলোয়াড়ই বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। তাদের উপস্থিতিই কোটি কোটি দর্শককে টেলিভিশনের সামনে বসিয়ে রাখে।
এখানে রেফারিদের দায়িত্বও কম নয়। অবশ্যই খেলার স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা থাকবে, শক্ত লড়াইও থাকবে। কিন্তু ইচ্ছাকৃত বা বিপজ্জনক ট্যাকলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। আধুনিক ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন বেড়েছে, তেমনি খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সবশেষে বলা যায়, মেসি কেবল একজন ফুটবলার নন; তিনি একটি প্রজন্মের আবেগ, অনুপ্রেরণা এবং বিস্ময়ের নাম। তিনি মাঠে থাকলে আর্জেন্টিনার স্বপ্ন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আর ফুটবলপ্রেমীরাও বিশ্বাস করেন, যতক্ষণ মেসি খেলছেন, ততক্ষণ ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলোর একটি এখনো লেখা বাকি।