দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আবারও নতুন করে অ্যাডহক কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই কমিটিগুলো কারা করছেন, কোথায় বসে করছেন কিংবা কোন প্রক্রিয়ায় করছেন, সেই বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য নেই সংশ্লিষ্ট অনেকের কাছেই। এমনকি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে অবগত নন বলে জানিয়েছেন।
সাধারণত জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশনগুলোতে অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয় স্বল্প সময়ের জন্য। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, এসব কমিটির মূল কাজ হলো সংশ্লিষ্ট ফেডারেশনের নির্বাচন আয়োজন এবং নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ধরনের কমিটির মেয়াদ তিন মাসের বেশি হয় না। কিন্তু দেশের অধিকাংশ ক্রীড়া ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশনে বর্তমানে যে অ্যাডহক কমিটিগুলো দায়িত্ব পালন করছে, তাদের মেয়াদ প্রায় দেড় বছর। এত দীর্ঘ সময় পার হলেও বেশিরভাগ ফেডারেশনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। সে সময় দেশের ক্রীড়াঙ্গনে সংস্কার আনার লক্ষ্যে একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। দীর্ঘ পর্যালোচনা শেষে ওই কমিটি বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশনে নতুন অ্যাডহক কমিটির রূপরেখা প্রণয়ন করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে সুপারিশ করে। সেই আলোকে ওই বছরের ১৫ নভেম্বর থেকে আরও সংস্কার এনে ফেডারেশনগুলোতে কমিটি দিতে শুরু করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ।
তবে শুরু থেকেই এসব কমিটি নিয়ে নানা বিতর্ক ছিল। সমালোচকদের একাংশের অভিযোগ ছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দায়িত্বে থাকা কিছু কর্মকর্তাকে নতুন করে পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করেন, ক্রীড়া সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন এমন ব্যক্তিদেরও দেওয়া হয়েছে দায়িত্ব। ফলে এসব কমিটি কতটা কার্যকরভাবে নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে, তা নিয়ে তখন থেকেই প্রশ্ন ছিল।
মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে ক্রীড়াঙ্গনে দুর্নীতি, অনিয়ম, দলীয়করণ এবং অযোগ্য ব্যক্তিদের বিভিন্ন ফেডারেশনে বসানোর অভিযোগ তুলে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই অধিকাংশ ফেডারেশনের পূর্ববর্তী কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। তবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা এর বাইরে ছিল, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। আন্তর্জাতিক সংস্থা ফিফা ও আইসিসির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারি হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ থাকায় সেখানে সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এরপর প্রায় দেড় বছর কেটে গেছে। এর মধ্যে দেশে নতুন সরকার এসেছে এবং ক্রীড়া ও ক্রীড়াবিদদের উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিবর্তে এখন আবার নতুন করে অ্যাডহক কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ক্রীড়াঙ্গনের স্থবিরতা নিরসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সার্চ কমিটির আদলে ১৯ সদস্য বিশিষ্ট নতুন একটি কমিটি গঠন করা হয়, যারা বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশনের জন্য নতুন অ্যাডহক কমিটির কাঠামো নির্ধারণ করছে বলে জানা গেছে। প্রস্তাবিত প্রতিটি কমিটি সাত সদস্যবিশিষ্ট হবে এবং সেখানে একজন ক্রীড়া সাংবাদিককেও অন্তর্ভুক্তির কথা ভাবছেন কর্মকর্তারা।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই কমিটি কোথায় বসে কাজ করছে? কাদেরই বা কমিটিতে আনছে কিংবা কমিটি গঠনই তাদের কাজ কি না এসব প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। ক্রীড়াঙ্গনের অনেক সংগঠক, কর্মকর্তা এমনকি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে পারছেন না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পরিচালক (ক্রীড়া) ও যুগ্ম সচিব আমিনুল এহসান বলেন, ‘ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর জন্য কমিটি কারা করছে বা কীভাবে হচ্ছে, সে বিষয়ে আমি অবগত নই।’
এই বক্তব্য ক্রীড়াঙ্গনের ভেতরে নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর অ্যাডহক কমিটি গঠনের প্রশাসনিক ও আইনগত এখতিয়ার মূলত জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানের একজন শীর্ষ কর্মকর্তাই যদি এ বিষয়ে অবগত না থাকেন, তাহলে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এদিকে আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি অনানুষ্ঠানিক কমিটিও নাকি কিছু ক্রীড়া ফেডারেশনে নতুন অ্যাডহক কমিটির রূপরেখা তৈরির চেষ্টা করছে। যদি এমনটি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে সেটি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।