আইসিইউ আছে, সেবা নেই, বঞ্চিত ভোলার রোগীরা

ভোলায় অন্তত পাঁচ বছর ধরে অচল হয়ে পড়ে আছে আধুনিক আইসিইউ ইউনিট, এদিকে জনবল সংকটে কোটি টাকার সরঞ্জাম অব্যবহৃত, তাই গুরুতর রোগীদের ভরসা এখন বরিশাল-ঢাকা।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে গত ১৩ জুন ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন মনোয়ারা বেগম। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা দ্রুত আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। কিন্তু হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট চালু না থাকায় কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা না পেয়ে দুই দিন পর স্বজনরা তাকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়।

শুধু মনোয়ারা বেগম নন, প্রতিদিনই একই বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন ভোলার গুরুতর অসুস্থ রোগীরা। হৃদরোগ, স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট কিংবা দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হচ্ছে বরিশাল বা ঢাকায়। সময়মতো আইসিইউ সুবিধা না পাওয়ায় অনেক রোগীর জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

অথচ ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় পাঁচ বছর ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে আধুনিক আইসিইউ ইউনিট। করোনা মহামারির সময় কেন্দ্রীয় চিকিৎসা সরঞ্জামাগার (সিএমএসডি) থেকে দুটি আইসিইউ বেড, পাঁচটি ভেন্টিলেটর, সাতটি অক্সিজেন কনসেনট্রেটরসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হলেও জনবল সংকটের কারণে আজও চালু করা সম্ভব হয়নি ইউনিটটি।

সম্প্রতি সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, আইসিইউ ইউনিটের দরজা বন্ধ। ভেতরে থাকা বেড ও যন্ত্রপাতির ওপর জমেছে ধুলাবালি। নিয়মিত ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কোটি টাকার এসব আধুনিক সরঞ্জাম কার্যকারিতা হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজন মো. আরিফ বলেন, গত বছরের শেষ দিকে এক আত্মীয় হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাকে রাতের বেলা হাসপাতালে নিয়ে আসি। চিকিৎসকরা আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। কিন্তু এখানে সে ব্যবস্থা না থাকায় দ্রুত বরিশালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পথে রোগীর মৃত্যু হয়। হাসপাতালে আইসিইউ চালু থাকলে হয়তো তাকে বাঁচানো সম্ভব হতো।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান হৃদরোগী হাসিব রহমানের স্বজনরা। তারা বলেন, গুরুতর অসুস্থ রোগীদের দ্রুত অন্য জেলায় পাঠাতে গিয়ে সময় নষ্ট হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে রোগীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।

হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিনই আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন এমন রোগী হাসপাতালে আসেন। কিন্তু সেবা চালু না থাকায় তাদের বাধ্য হয়ে বরিশাল বা ঢাকায় রেফার করতে হয়। এতে যেমন রোগীর চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে, তেমনি সংকটাপন্ন অবস্থায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়াও হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ।

ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মো. কায়ছার আলম বলেন, প্রতিদিনই এমন রোগী আসে যাদের আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়। কিন্তু ইউনিট চালু না থাকায় আমরা তাদের অন্যত্র রেফার করতে বাধ্য হই। প্রয়োজনীয় জনবল পেলে আইসিইউ চালু হলে জেলার মানুষ অনেক উপকৃত হবে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. তৈয়বুর রহমান জানান, ২০২১ সালে আইসিইউ বেড ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পাওয়া গেছে। কিন্তু আইসিইউ পরিচালনার জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসক, অ্যানেসথেটিস্ট, প্রশিক্ষিত নার্স ও টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন। এসব জনবলের জন্য একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জনবল পাওয়া গেলে দ্রুত ইউনিট চালু করা সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে ভোলা জেলা ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর সভাপতি ডা. শরীফ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইসিইউ চালু না হওয়ার প্রধান কারণ জনবল সংকট। আইসিইউ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স ও কারিগরি কর্মী এখনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি। যদিও ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো রয়েছে, জনবলের অভাবে সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ভবিষ্যতে এখানে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই হাসপাতালটির অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় আইসিইউ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। ভোলাও এ কার্যক্রমের আওতায় আসবে বলে আমরা আশাবাদী। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে।

ভোলা জেলা ড্যাবের সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইসিইউ ইউনিট চালুর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সমন্বিত স্টাডি বা কারিগরি মূল্যায়ন করা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। আইসিইউ চালু করতে হলে শুধু যন্ত্রপাতি থাকলেই হবে না; এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পূর্ণাঙ্গ সেবা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এজন্য কার্ডিওলজি ইউনিট, সিসিইউ, প্রয়োজনীয় ওয়ার্ড, রেজিস্ট্রার, অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষিত নার্স ও অন্যান্য সহায়ক জনবল প্রয়োজন। বর্তমানে এসব পদে পর্যাপ্ত জনবল নেই এবং প্রয়োজনীয় পোস্টিংও দেওয়া হয়নি। ফলে আইসিইউ চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। ভোলা বাংলাদেশের বৃহত্তম দ্বীপ জেলা হওয়ায় সন্ধ্যার পর বা জরুরি পরিস্থিতিতে গুরুতর রোগীদের দ্রুত অন্য জেলায় স্থানান্তর করাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ভোলার মানুষের জন্য কার্ডিওলজি ও আইসিইউ সেবা অত্যন্ত জরুরি। আমি মনে করি, প্রয়োজনীয় জনবল, ইউটিলিটি ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করে দ্রুত আইসিইউ ইউনিট চালুর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া উচিত, যাতে জেলার রোগীরা কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা পেতে পারেন।

স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত ভোলার সচেতন নাগরিকদের মতে, প্রায় ২২ লাখ মানুষের জেলা ভোলায় একটি কার্যকর আইসিইউ ইউনিট এখন সময়ের দাবি। আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকার পরও জনবল সংকটে সেবা বন্ধ থাকাটা শুধু প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতাই নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় উদ্বেগের বিষয়।

ভোলার মানুষ এখন জানতে চায়- জীবন বাঁচানোর জন্য নির্মিত এই আইসিইউ ইউনিট আর কতদিন বন্ধ থাকবে? প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করে কবে চালু হবে বহু প্রতীক্ষিত এই সেবা? কারণ প্রতিটি বিলম্বিত সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হচ্ছে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা রোগীদের।