বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে ক্রান্তিকাল চলছে। গত ১১ জুন, ২০২৬ ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট তারই প্রত্যক্ষ প্রতিফলন। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা যা মোট বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশের বেশি। সরকারকে যা মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি, ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ করবে। অথচ সরকারের পুঞ্জীভূত ঋণের পরিসংখ্যান, আগে থেকেই বিপজ্জনক পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত সরকারের দেশি-বিদেশি ঋণ প্রথমবারের মতো প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকার (২৩ লাখ ৯৪ হাজার ৭১০ কোটি টাকা) মাইলফলক ছুঁয়েছে। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১৩ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ বা দেশি ঋণ ১০ লাখ ২৬ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে রেকর্ড ৩.৪১ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নতুন সরকার আরও ৫ বিলিয়ন চাইছে। কিন্তু সামষ্টিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি ও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদদের তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে প্রশ্ন জাগে এই বিপুল ঋণ কি সত্যিই অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করবে, নাকি দেশকে অন্তহীন ঋণনির্ভরতা ও চরম বৈষম্যের অন্ধকার ফাঁদে নিক্ষেপ করবে? পরিসংখ্যান এই সংকটের ভয়াবহতাই তুলে ধরে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণ প্রায় ৪৬ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০২০-২১ অর্থবছরের ৫০.৮৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে বর্তমানে ৭৪.৩৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অভ্যন্তরীণ ঋণও গত অর্থবছরের ১০.৭৬ ট্রিলিয়ন টাকা থেকে বেড়ে ১১.৯৫ ট্রিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে। ঋণের এই পাহাড়সম বোঝা মেটাতে গত অর্থবছরে সরকার কেবল সুদ হিসেবেই পরিশোধ করেছে ১ লাখ ৩২ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা, যা এক বছরের ব্যবধানে ১৭ শতাংশ বেশি। বৈদেশিক ঋণের সুদের অর্থ পরিশোধ ২১ শতাংশ এবং দেশীয় ঋণের সুদ ১৬ শতাংশ বেড়েছে। ঋণনির্ভরতার মূল চালিকাশক্তি হলো, রাজস্ব আহরণে চরম ব্যর্থতা। এটি অর্থনীতির বিখ্যাত ‘যমজ ঘাটতি তত্ত্বের’ বাস্তব উদাহরণ। দুর্বল ও এলিট-নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতিতে বৈদেশিক ঋণের সিংহভাগই উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না হয়ে অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হয়। মেগা প্রকল্পগুলোর অসারতা যেখানে স্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ পদ্মা রেল সেতু থেকে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা আয়ের কথা বলা হলেও, আয় হয়েছে মাত্র ২৬ কোটি টাকা। বলা হয়েছিল, এর ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশ বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। কারণ রেল যোগাযোগের সুবিধা লাভকারী অঞ্চলে বার্ষিক বাজেটে আঞ্চলিক বরাদ্দে ধারাবাহিক বৈষম্যের ফলে অর্থ উপার্জন সক্ষম খাতের চরম ঘাটতি রয়েছে। এই অর্থ যদি ওই অঞ্চলের কৃষি, সেচ ও সারের মতো উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হতো, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি দায় তৈরি হতো না। শুধু পদ্মা রেল সেতু নয়, নিবিড় গবেষণা করলে হয়তো দেখা যাবে, স্বাধীনতাপরবর্তী ৫৩ বছরে (১৯৭২/৭৩-২০২৫/২৬ অর্থবছর) উন্নয়ন বাজেটের আওতায় বরাদ্দকৃত মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ১৬৫টি প্রকল্প-কর্মসূচির মধ্যে ১ লাখই দেশের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশের প্রতিনিধিত্বকারী আয়-দরিদ্র, ক্ষুধা-দরিদ্র, কর্মসংস্থানহীন, স্বল্প মজুর, কৃষি-শিল্প-সেবাখাতের শ্রমিক, আবাসনহীন,দরিদ্র-বিত্তহীন-নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার, চর-হাওর-বাঁওড়-মঙ্গা-ঘূর্ণিঝড় সাইক্লোন-নদীভাঙন-বন্যাপ্রবণ-খরা-উপকূলীয় এলাকার মানুষ, নারীপ্রধান খানা, প্রতিবন্ধী, ভাসমান মানুষ, ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষক, বস্তিবাসী এবং স্বল্প আয়ী সেটেলমেন্ট, জলবায়ু ও পরিবেশ বিপর্যস্ত মানুষ, অনানুষ্ঠানিক সেক্টরের মানুষ, ধর্মীয় সংখ্যাস্বল্প সম্প্রদায়, আদিবাসী, তৃতীয় লিঙ্গ, দলিত, পশ্চাৎপদ, গৃহকর্মী, অভিবাসিত, রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বাস্থ্য-শিক্ষা সুযোগ-বঞ্চিত, বিচারহীনতার শিকার, সহিংসতার শিকার নারী-শিশু-প্রবীণসহ আরও অনেক মানুষ পেটে-ভাতে টিকে থাকা ছাড়া কাজে আসেনি ।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ ঋণ স্থায়িত্ব বিশ্লেষণে (ডিএসএ) বাংলাদেশকে ‘মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর প্রধান কারণ হলো, রপ্তানি ও রাজস্বের তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপ ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পাওয়া। ডিএসএ অনুসারে, বাংলাদেশের ঋণ-রপ্তানি অনুপাত ১৬২.৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা আইএমএফের পূর্ববর্তী অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিটজ সতর্ক করেছেন, অভ্যন্তরীণ সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া ঋণনির্ভর নীতি, দীর্ঘমেয়াদে বৈষম্য সৃষ্টি করে। রাজস্ব বাড়াতে গিয়ে সরকার যখন ভ্যাটের মতো পরোক্ষ করের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়, তখন তা নিম্নবিত্তের ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণ চাপ ফেলে। এটি নোবেলজয়ী থমাস পিকেটির বৈষম্য তত্ত্বের বাস্তব প্রতিফলন; যেখানে প্রবৃদ্ধির চেয়ে মূলধনের রিটার্ন বেশি এবং সম্পদ ধনিক শ্রেণির হাতে পুঞ্জীভূত হয়।
আগামীতে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হবে, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের পাহাড়সম চাপ। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ১৫ বছরে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে প্রায় ৪৪.৬৯ বিলিয়ন ডলার এখনো পাইপলাইনে আছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে এসব ঋণ ছাড় হলে, আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যাবে। এই ঋণ পরিশোধের চাপ সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর আঘাত হানছে। অর্থনীতিবিদ হাইম্যান মিনস্কির ‘আর্থিক অস্থিতিশীলতা তত্ত্ব’ দিয়ে এ চিত্রটি নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। যখন অর্থনীতি পুরনো ঋণের আসল ও সুদ মেটাতে বাধ্য হয়ে বিশ্বব্যাংক বা এডিবি থেকে রেকর্ড পরিমাণ বাজেট সহায়তা গ্রহণ করে, তখন তা অনিবার্যভাবে ভয়াবহ বিপর্যয় বা ‘মিনস্কি মোমেন্টের’ দিকে ধাবিত হয়। বাংলাদেশ যদি রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি না করে, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অর্থনীতি এমন এক মিনস্কি মোমেন্টের মুখোমুখি হবে, যেখান থেকে উত্তরণ প্রায় অসম্ভব।
বিশাল আকারের বাজেট বাস্তবায়নের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা (৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা) ছোঁয়া হবে দুঃসাধ্য এক কাজ, কারণ তা নির্ভর করছে ভঙ্গুর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর। বিগত ১০ মাসেই ইতিহাসের সর্বোচ্চ ঘাটতির রেকর্ড করেছে এনবিআর। কোনো কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এনবিআর এখনো পরোক্ষ করনির্ভর; ফলে ধনীদের ওপর চাপ না পড়ে ভ্যাট ও শুল্কের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। অধ্যাপক ড্যারন অ্যাসমোগ্লু তত্ত্ব এখানে আবারও প্রাসঙ্গিক ‘আহরণমূলক প্রতিষ্ঠান’ বিদ্যমান থাকলে রাষ্ট্র কখনোই অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহে সফল হয় না। একই চিত্র দেখা যায়, সরকারি ব্যয় কাঠামোতেও। রাজস্বের একটি বড় অংশ চলে যায়, সরকারি কর্মচারী ও আমলাদের বেতন-ভাতায়। উল্লেখ্য, প্রাচীন রোমের দার্শনিক সিসেরোর সেই প্রশ্ন ‘কুই বোনো’ অর্থাৎ ‘লাভটা কার?’ এখানে গভীরভাবে প্রযোজ্য। মনে রাখা প্রয়োজন, সংস্কারবিহীন এই ঋণ-ব্যয় উত্তরোত্তর নিম্নবিত্তের ওপর করের বোঝা বাড়াবে এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতার পথ রুদ্ধ করবে, যার পরিণতি হয়তো ‘গণরোষের মুখে আবার ক্ষমতা ত্যাগ’ যা গণতান্ত্রিক শক্তির কাম্য নয়।
শুধু তত্ত্ব নয়, বাস্তব ইতিহাসও ঋণনির্ভর অর্থনীতির ভয়াবহ পরিণতির সাক্ষী। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর ১৯৮০-এর দশকের ‘হারানো দশক’ হলো তার জ্বলন্ত উদাহরণ। অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণের চাপে পড়ে একসময়ের উদীয়মান অর্থনীতির দেশ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা মহামন্দা ও হাইপার-ইনফ্লেশনের কবলে পড়ে। আর্জেন্টিনার আর্থিক শাসনক্ষমতা এখন আইএমএফের হাতে। শ্রীলঙ্কা ২০২২ সালে রাজস্ব সংস্কারে ব্যর্থ হয়ে ও বৈদেশিক ঋণের কিস্তি শোধ করতে না পেরে প্রথমে দেউলিয়া, তারপর রাষ্ট্রপ্রধানের দেশ থেকে পলায়ন। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিটজ এই প্রসঙ্গে সতর্ক করেছেন, ‘শ্রীলঙ্কা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; ঋণদাতাদের চাপিয়ে দেওয়া নীতির কাছে সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়ার এটি একটি বৈশ্বিক সংকেত।’ গ্রিসের ঋণ সংকটও (২০০৯-২০১৮) প্রমাণ করেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো জোটেও ট্রয়কার (আইএমএফ-ইসিবি-ইসি) চাপিয়ে দেওয়া বাজেট কাটছাঁট বা ‘অস্টারিটি’ সমাজে কী ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
সার্বিক বিশ্লেষণে এটি নির্দ্বিধায় বলা যায়, বর্তমান এই বাজেট ও ঋণের পাহাড় কেবল অর্থের অভাব নয় বরং এটি উৎপাদনশীলতা, সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা এবং অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের গভীর কাঠামোগত সংকটের প্রতিচ্ছবি। কী করা উচিত, তা সরকারের রাজপথে রাজপথে মিছিল-মিটিং করে ঝানু রাজনীতিবিদ আর প্রশাসনের ব্রিটিশ আমলের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ বিষয়ের পণ্ডিত নীতিনির্ধারকরা ভালোই জানেন। কিন্তু করবেন না কিছুই। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) ২০২৫ সালেই ‘এ ওয়ার্ল্ড অব ডেট’ গবেষণা সমীক্ষায় বলেছিল বিশ^ব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, চড়া সুদের হার এবং অসমতাসৃষ্ট কাঠামোগত ভঙ্গুরতার কারণে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো, বাংলাদেশও মারাত্মক ঋণের ফাঁদে পড়েছে।
লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
aynulku@gmail.com