বজ্রপাত এখন আমাদের দেশে মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রতি বছর এ কারণে তিন শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়, যাদের ৭০ শতাংশই কৃষক। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৃক্ষশূন্যতার কারণে এর প্রকোপ বাড়ছে। ১৮ জুন দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দেশে বজ্রপাত এখন এক নীরব ঘাতক। গত ১১ জুন একদিনে দেশের ১১ জেলায় বজ্রপাতে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ২৭ এপ্রিল একদিনে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এই দুদিনের প্রাণহানিই দেশে বজ্রপাতের ভয়াবহতার চিত্র স্পষ্ট করে।’ আমরা জানি, এই দুর্যোগ বা ঝুঁকি মোকাবিলায় তালগাছ রোপণের পাশাপাশি সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, আগাম সতর্কতা এবং পরিবেশের ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের ওপর জোর দেওয়া হয়। কিন্তু এই কার্যক্রমের গতি একদিকে আশানুরূপ নয়, অন্যদিকে কিছু মানুষের অপরিণামদর্শী থাবা পড়ছে বজ্রনিরোধ বৃক্ষ ও প্রকৃতির ওপর।
বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। কিন্তু বজ্রপাত থেকে সুরক্ষার জন্য যে ব্যবস্থাগুলো নেওয়া হয়েছে বা হচ্ছে, সেগুলোর কার্যকারিতা এবং ব্যয় নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন উঠছে। বজ্রপাত ঠেকাতে খরচ বাড়লেও প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কেন কমছে না এরও রয়েছে নানা মত। উল্লেখ্য, বজ্রপাত থেকে মানুষের প্রাণরক্ষার জন্য প্রথমে নেওয়া হয়েছিল তালগাছ সৃজন প্রকল্প। ওই প্রকল্প পরিকল্পনায় ছিল, সারা দেশে ৪০ লাখ তালগাছ লাগানোর। তবে এ নিয়ে সমীক্ষা কিংবা অংশীজনদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করে প্রকল্প শুরুর শেষটা কাক্সিক্ষত রূপ পায়নি। উপরন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেল ব্যবস্থাপনায় তালগোলে। অভিযোগ উঠেছিল, প্রকল্পের বিপুল অর্থ খরচের হিসাবে অসংগতি-দুর্নীতির। সংবাদমাধ্যমে এও উঠে এসেছিল, তালগাছের চারা কোথাও মরে গেছে, কোথাও চারা না লাগিয়ে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে! একই সঙ্গে তালগাছ সৃজনের নামে ‘গায়েবি’ গাছের ছড়াছড়ির অভিযোগ ওঠে। শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটিই বাতিল হয়ে যায় ২০২২ সালে।
আমরা জানি, বর্ষা মৌসুমের পূর্বাপর দেশের কৃষিপ্রধান এলাকাগুলোয় বজ্রপাতে সর্বাধিক ক্ষতির শিকার হন কৃষক। ফসল কাটায় ব্যস্ত কৃষকদের জন্য বজ্রপাতের ঝুঁকি ক্রমেই মারাত্মকভাবে প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। একদিকে কৃষিজীবী মানুষের ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব এই দুই মিলে বজ্রপাত দেশের অন্যতম দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহও এর আরেকটি কারণ। আবহাওয়া ও পরিবেশবিদদের অভিমত, বজ্রপাত শুধু একটি প্রাকৃতিক বিষয় নয়, এটি জননিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
আমাদের বক্তব্য, শুধু সতর্কতা প্রচার করলেই দায়িত্বশীলদের দায় শেষ হয়ে যায় না, বজ্রনিরোধক অবকাঠামোর সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে পরিকল্পিত অব্যাহত কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচি লাগাতার করতে হবে। দরকার সমন্বিত ব্যবস্থা এবং পরিবেশ ঝুঁকিমুক্ত করা। প্রকৃতির ওপর বহুমুখী অভিঘাতের ফলে প্রকৃতি রুদ্র-রুষ্ট হয়ে উঠছে, বিরূপ আচরণ করছে, এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণ বাড়তি উপসর্গ সৃষ্টি করছে।
বজ্রপাত নিরোধে দেশে তেমন গবেষণা নেই। এর নিরোধে উদ্যোগের গতি আরও মন্থর। এতসব নেতিবাচকতা জিইয়ে রেখে প্রাণঘাতী বজ্রপাতের হারে রাশ টানা দুরূহ। ২০২২ সালে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন গবেষক একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছিলেন। তাতে জানা যায়, বিশে^ বজ্রপাতে যত মানুষ মারা যায়, এর এক-চতুর্থাংশই বাংলাদেশে। দেশে গত এক দশকে বজ্রপাত-দুর্যোগ ১৫ শতাংশ বেড়েছে। এ হিসাবে বজ্রপাতে মৃত্যুর হারে বাংলাদেশের নাম উঠে এসেছে এক নম্বরে। এমতাবস্থায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই। বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থার ব্যাপারেও উন্নত দেশের দিকে হাত বাড়ানো দরকার। গড়ে তুলতে হবে জবাবদিহি আর অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাও। উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও আধুনিক বজ্রপাত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থার ব্যাপারে তাদের সহযোগিতার বিষয়টিও ভাবা দরকার বলে মনে করি।