বিশ্বরাজনীতিতে যখন ওয়াশিংটন আর তেহরানের মধ্যে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তখন চায়ের কাপে ঝড় ওঠে। বহু বছর ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা, কূটনীতির দড়ি-টানাটানি আর পারমাণবিক কর্মসূচির জটিল ধাঁধাকে পেছনে ফেলে, এই চুক্তি যেন এক মহাকাব্যিক নাটকের ক্লাইম্যাক্স। মনে হয়, এই রেষারেষির খেলায় শেষ পর্যন্ত ইরানের জয় হয়েছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে, চুক্তির হাত ধরে। বিশ্ববাসী অবাক হয়ে দেখল, প্রবল মার্কিন নমনীয়তা কীভাবে মাথা ঝুঁকিয়েছে। এটি শুধু কাগুজে স্বাক্ষর নয়, বরং বিশ্ব পরাশক্তির বিরুদ্ধে একা লড়াই করে টিকে থাকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বহু বছর ধরে আটকে থাকা, ইরানের কোটি কোটি ডলারের অর্থ পুনরুদ্ধার হবে এই চুক্তি বিজয়ের অন্যতম বড় ভিত্তি। বিপুল অর্থ পুনরুদ্ধার ইরানের অভ্যন্তরীণ বাজারকে চাঙ্গা করবে। পাশাপাশি সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা হলো, অবরোধ প্রত্যাহার এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলতা। বছরের পর বছর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে শ্বাসরোধ করতে চেয়েছিল। কিন্তু পারস্যের মানুষ দমেনি, বরং তারা সেই জাঁতাকল থেকে নিজেদের মুক্ত করার পথে। বিশ্ববাজারে ইরানের বাণিজ্যিক দ্বার এখন অনেকটা উন্মুক্ত। নিষেধাজ্ঞা শিথিলের এই সুফল সরাসরি গিয়ে পড়বে দেশটির উৎপাদন ও সেবা খাতে।
তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে ইরানের পুরনো গৌরব ফিরে আসায় ভূ-রাজনীতিতে বিরাট লাভ হয়েছে। পারস্য উপসাগরের বুক চিরে জাহাজগুলো এখন বাধা ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে চলবে। তেলের বাজার পুনর্দখল করার অর্থ হলো দেশের কোষাগার শক্তিশালী হওয়া। ওয়াশিংটন যেখানে ইরানের তেল বিক্রি শূন্যে নামাতে চেয়েছিল, সেখানে ইরানের তেল ট্যাংকারগুলো সমুদ্রে বুক ফুলিয়ে চলছে। কূটনীতির দাবা খেলায়, তেহরান নিজের শর্ত মানাতে বাধ্য করেছে প্রতিপক্ষকে। আত্মসমর্পণ ছাড়া, নিজস্ব পরমাণু কর্মসূচিকে সম্মানজনক অবস্থানে রেখে চুক্তি করা কম কথা নয়। কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব তখনই রক্ষা পায়, যখন সে বহিঃশত্রুর হুমকি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারে। ইরান এই চুক্তির মাধ্যমে তার সামরিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও আঞ্চলিক শক্তি অক্ষুন্ন রেখেছে। হোরাস ও হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ইরানের কৌশলগত অবস্থান আরও মজবুত হয়েছে। এটি বিশ্ববাণিজ্যের এক লাইফলাইন, যার চাবিকাঠি তেহরানের হাতে। জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকার কারণে, বিশ্বশক্তিগুলো ইরানকে সমীহ করতে বাধ্য হবে।
ইরান এখন মধ্যপ্রাচ্যে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি। সিরিয়া, ইয়েমেন কিংবা লেবানন সবখানে তেহরানের রাজনৈতিক ও কৌশলগত অক্ষ সুসংহত হয়েছে। চুক্তির ফলে আন্তর্জাতিক মহল মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে যে, ইরানকে বাদ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি অসম্ভব। বিশ্বমঞ্চে ইরানের এই চুক্তি প্রমাণ করে, সঠিক কৌশল ও আত্মবিশ্বাস থাকলে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তিকেও আলোচনার টেবিলে নমনীয় হতে বাধ্য করা যায়। এই চুক্তি কেবল দুই দেশের বিষয় নয়, বরং পুরো বিশ্বের এক বড় বিজয়। কারণ, এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে একটি সম্ভাব্য যুদ্ধের অবসান ঘটেছে। ওয়াশিংটন আর তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ লাগলে, পৃথিবীর অর্থনীতি ধসে পড়ত। যুদ্ধের কালো মেঘ কেটে গিয়ে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। এটি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের জন্য নয়, বরং বিশ্ববাসীর জন্য ¯স্বস্তির।
‘কূটনীতি হলো যুদ্ধের অন্য রূপ, যেখানে অস্ত্রের বদলে শব্দ ব্যবহৃত হয়।’ ইরান সেই শব্দের যুদ্ধে জিতেছে। তারা বিশ্ববাসীকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে, তারা শান্তিপ্রিয় কিন্তু আত্মমর্যাদাবোধে বলীয়ান। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ইরানের পাসপোর্ট ও সাংস্কৃতিক মর্যাদা বিশ্বদরবারে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে যা কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন যুগের সূচনা করেছে। ভূ-রাজনীতিতে লাভের অঙ্ক কষলে দেখা যায়, চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা যখন শিথিল হবে, তখন পূর্বের দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের বাণিজ্য আরও নতুন মাত্রা পাবে। এই চুক্তির ফলে বিশ্বরাজনীতিতে মার্কিন একক আধিপত্যের পতন এবং বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার উত্থান ত্বরান্বিত হয়েছে।
সমালোচকরা হয়তো বলবেন, এটি স্থায়ী সমাধান নয়। কিন্তু রাজনীতির মাঠে চিরস্থায়ী বলে কিছু নেই। ইরান বর্তমানের সেরা সমীকরণ নিজের পক্ষে টেনেছে। তারা অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সামরিক নিরাপত্তার এক অপূর্ব ভারসাম্য তৈরি করেছে চুক্তির মাধ্যমে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য শিক্ষণীয় উদাহরণ।
এটি স্পষ্ট যে, যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানকে কাবু করার মার্কিন নীতি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ওয়াশিংটন বুঝতে পেরেছে, শক্তির দাপট দেখিয়ে পারস্যের ঐতিহ্যকে দমন করা অসম্ভব। এই ঐতিহাসিক ঘটনা প্রমাণ করে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ কীভাবে সফল হতে পারে। ইরান তার লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়েছে এবং তাদের এই অবস্থান আগামী দিনে অন্যান্য দেশের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
মার্কিন নমনীয়তা বা সুর নরম করার এই দৃশ্যটি ছিল সারা বিশ্বের মজলুম মানুষের জন্য এক বিরাট অনুপ্রেরণা। যে দেশটিকে সবসময় উদ্ধত ও আক্রমণাত্মক ভূমিকায় দেখা যেত, তাদের পিছু হটা বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন বার্তা দিচ্ছে।
এটি মূলত বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থার এক বিরাট জয়, যেখানে মার্কিন একাধিপত্যের অবসান ঘটছে। বিশ্বের শোষিত, বঞ্চিত ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মানুষ ইরানের এই সফল প্রতিরোধকে নিজেদের বিজয় বলে মনে করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই চুক্তি বিশ্বইতিহাসের পাতায় এক নতুন অধ্যায়। এটি কেবল এক টুকরো কাগজে স্বাক্ষর নয়, বরং এক পরাশক্তির দম্ভের বিরুদ্ধে একটি প্রাচীন সভ্যতার আত্মমর্যাদার জয়।
লেখক : কলাম লেখক ও প্রাবন্ধিক