জিভাগোর ইতিকথা

রাশিয়ার জার আমলের শেষ বছরগুলো থেকে শুরু করে ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব, গৃহযুদ্ধ এবং একনায়ক স্তালিনের উত্থানের মহাকাব্যিক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত বরিস পাস্তেরনাকের ডক্টর জিভাগো উপন্যাসটি রুশ সাহিত্যের অসামান্য সম্পদ। উপন্যাস হিসেবে প্রচ- শক্তিশালী হওয়ার কারণে এটি সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের কাছে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

জিভাগোর গল্প

এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ইউরি আন্দ্রেয়েভিচ জিভাগো। বেড়ে ওঠেন মস্কোর শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী পরিবারে। তিনি চিকিৎসক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন এবং বিয়ে করেন পালক বাবা-মায়ের মেয়ে তনিয়াকে। তাদের একটি সন্তান হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জিভাগো সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে বাধ্য হলে তাদের জীবন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। উপন্যাসটিতে যেমন ভবিষ্যতের নির্মম পরিণতি সম্পর্কে ইঙ্গিত করা হয়েছে, তেমনি অগ্নিগর্ভ অতীতের কথাও রয়েছে।

সেনাবাহিনীতে কাজ করার সময় জিভাগোর পরিচয় হয় লারিসা ফিওদোরোভনা আন্তিপোভা লারার সঙ্গে। পরে প্রেম। নার্স লারা তার স্বামী পাভেল পাভলোভিচ আন্তিপভ পাশাকে খুঁজছিলেন, যিনি যুদ্ধে আহত বা নিহত হয়েছেন বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। জিভাগো মস্কোতে ফিরে এসে চরম বিশৃঙ্খলা এবং বিষন্নতায় আচ্ছন্ন একটা শহরকে দেখতে পান আর বিচ্ছিন্ন অনুভব করতে থাকেন।

এক ভয়াবহ শীতঋতুর পর জিভাগো মস্কো ছেড়ে ভ্যারিকিনোতে তনিয়ার দাদার জমিদারিতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এই সিদ্ধান্তটি ছিল ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। ট্রেনের দীর্ঘ যাত্রাপথ ছিল বিপদসংকুল; এতে তাদের বারবার তল্লাশির মুখে পড়তে হয়। এখানেই তার দেখা হয় রেড আর্মির কট্টরপন্থি অফিসার লারার স্বামীর সঙ্গে।

জিভাগোর পরিবারে নানা বিপর্যয় নেমে আসে। লারার সঙ্গে নিজের প্রেমকে তিনি স্ত্রী তনিয়ার প্রতি এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা মনে করে যন্ত্রণায় ভুগতে থাকেন। বন্দুকের মুখে তাকে সরকারি বাহিনী অপহরণ করে। জিভাগোর এই বন্দিদশা এক বছরেরও বেশি সময় স্থায়ী হয়। তিনি চারবারের চেষ্টায় সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হন। জিভাগো ও লারার পথ আলাদা হয়ে যায়। জিভাগো মস্কোতে ফিরে যান।

মস্কোতে ফিরে জিভাগো শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। জিভাগোর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় লারা উপস্থিত ছিলেন। একদিন তিনি বাইরে গিয়ে আর ফিরলেন না। সম্ভবত সে সময় রাস্তা থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সম্ভবত উত্তরের কোনো এক বন্দিশিবিরে একদিন নামগোত্রহীন একটি সংখ্যা হয়ে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গিয়ে প্রাণ হারান।

রুশ সমাজের এই কাহিনির মাধ্যমে পাস্তেরনাক ব্যক্তিগত ও সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনাকে সেই সময়ের ঐতিহাসিক ও মানবিক প্রেক্ষাপটে মূর্ত করে তুলেছেন। এতে দেখানো হয়েছে যুদ্ধপূর্ব ও বিপ্লবপূর্ব সময়ের উচ্চবিত্ত সমাজের জৌলুস ও আভিজাত্যের সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণির দুর্দশার বৈপরীত্য, যা তখন বহমান ছিল। একদিকে অভিজাতদের সংগীত সন্ধ্যা, ক্রিসমাস পার্টি ও তাস খেলার ঘটনা; অন্যদিকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের রেল ধর্মঘট এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে কসাক সেনাদের নৃশংস হত্যাকা-কে তুলে ধরেছেন তিনি। দেখা গেল হোয়াইট ও রেড আর্মির লড়াইয়ের মধ্যে পড়ে সবকিছু ছারখার হয়ে যাচ্ছে। কৃষকরা চরম দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, তাদের সন্তানদের জোর করে যুদ্ধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিপ্লবীদের খাবার না দেওয়ায় একটি গ্রামকে পুড়িয়ে দেওয়া হলো। অথচ সেই খাদ্য গ্রামবাসীদের নিজেদেরই দরকার ছিল।

নিষিদ্ধের পটভূমি

বিপ্লব সম্পর্কে জিভাগোর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল ইতিবাচক। বিপ্লবকে তিনি ‘নতুন বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি’ হিসেবে দেখেছেন, যা ১৯০৫ এবং ১৯১২-১৪ সালের আদর্শিক বিপ্লবী চিন্তা হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছিল। তিনি জারশাসিত রাশিয়ার শাসন-শোষণ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। পরে তিনি বলশেভিকদের নেতৃত্বে পরিচালিত নৃশংস নির্মম যুদ্ধের বাস্তবতা থেকে উদ্ভূত অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে বিচলিত বোধ করেছেন।

ডক্টর জিভাগো উপন্যাসে বিপ্লবের দ্বিতীয় পর্বকে সন্দেহ এবং ষড়যন্ত্রের কাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এক জায়গায় মার্কসবাদ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে : ‘মার্কসবাদ কি বিজ্ঞান?... মার্কসবাদ যে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পাবে, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই। বিজ্ঞান অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ এবং বস্তুনিষ্ঠ হয়ে থাকে। মার্কসবাদের চেয়ে আত্মকেন্দ্রিক এবং বাস্তবতা থেকে দূরবর্তী কোনো আন্দোলনের কথা আমার জানা নেই। পাস্তেরনাক ভেবেছেন, যা কিছু ব্যক্তিগত, তাই জীবনের ভিত্তি। এই ব্যক্তিগত জীবনকে রক্ষা করার জন্য তিনি সংগ্রাম করেছেন।

নিষিদ্ধের ইতিবৃত্ত

স্তালিনের মৃত্যুর পর ১৯৫৩ সালে ক্রেমলিন যখন সেন্সরশিপ নীতি শিথিল করে, তখন বরিস পাস্তেরনাক ডক্টর জিভাগো লেখা শুরু করেন। স্তালিনবাদের যুগে তিনি ছিলেন একেবারেই নীরব। স্তালিনের শাসনামল তার সৃষ্টিশীল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। সে সময় শাসকগোষ্ঠী সব লেখকের কাছ থেকে চাইছিল দলীয় আনুগত্য।

১৯৫৬ সালে পাস্তেরনাক ডক্টর জিভাগো উপন্যাসটি প্রকাশের জন্য ‘নভি মির’ নামের একটি সাহিত্য পত্রিকায় পাঠান। তিনি আশা করেছিলেন উপন্যাসটি তারা প্রকাশ করবে। প্রয়োজনে আপত্তিকর অংশগুলো বাদ দিতেও প্রস্তুত ছিলেন পাস্তেরনাক। কিন্তু মাসের পর মাস কেটে গেল। পত্রিকাটির পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। এরই মধ্যে ইতালির মিলানের প্রকাশক জিয়ানজিয়াকোমো ফেলত্রিনেল্লি পাস্তেরনাকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তারা পা-ুলিপির অনুবাদস্বত্ব কিনে নিতে চান। পাস্তেরনাক অনেকটা আবেগবশে পা-ুলিপির টাইপ করা একটি কপি তাদের কাছে পাঠিয়ে দেন।

পাস্তেরনাকের অজান্তেই তার উপন্যাস সোভিয়েত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহলে ঝড় তোলে। কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির একটি প্রতিবেদনে একে ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের বিরুদ্ধে ‘জঘন্য অপবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। নভি মিরের সম্পাদকরা উপন্যাসটিকে বুর্জোয়া ব্যক্তিমানুষের আখ্যান হিসেবে চিহ্নিত করে পাস্তেরনাককে চিঠি দেন।

ব্যাপক প্রচারের মধ্যে ১৯৫৭ সালের নভেম্বরে ডক্টর জিভাগো ইতালীয় ভাষায় অনূদিত হয়ে মিলান থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়। মাত্র একদিনের মধ্যে ৬,০০০ কপি বিক্রি হয়ে যায়। এরপর উপন্যাসটি ইংরেজি, ফরাসি এবং অন্যান্য ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হতে থাকে। নেদারল্যান্ডস থেকে এর রুশ সংস্করণও বের হয়। পরে জানা যায়, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এতে অর্থায়ন করেছিল। সিআইএ এবং ব্রিটেনের এমআইসিক্স রুশবিরোধী প্রোপাগান্ডার জন্য উপন্যাসটি লুফে নেয়।

পশ্চিমে উপন্যাসটির এই সাফল্য সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ করে। সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ জিভাগোর জনপ্রিয়তাকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি অপমান হিসেবে দেখেছিল। এর অনেক পরে ১৯৮৮ সালে মিখাইল গর্বাচেভ ক্ষমতায় এলে সেই নভি মিরই প্রথমবারের মতো রাশিয়ায় উপন্যাসটি প্রকাশ করে।

১৯৫৮ সালের ২৩ অক্টোবর সুইডিশ একাডেমি পাস্তেরনাককে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে। সোভিয়েত রাইটার্স ইউনিয়নের এক কর্মকর্তা পাস্তেরনাকের কাছে গিয়ে পুরস্কারটি প্রত্যাখ্যান করার দাবি জানান। যুক্তি হিসেবে তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষ এটিকে সোভিয়েত-বিরোধী রাজনৈতিক চাল হিসেবে দেখছে। পাস্তেরনাক এই দাবি মেনে নিতে অস্বীকার করলে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে বিষাক্ত প্রচারণা শুরু করে এবং ২৭ অক্টোবর তাকে রাইটার্স ইউনিয়ন থেকে বহিষ্কার করা হয়। উপন্যাসটির প্রকাশনাও নিষিদ্ধ করা হয়। এর দুদিন পর, প্রায় আত্মহত্যার মুখোমুখি হওয়া বিপর্যস্ত পাস্তেরনাক সুইডিশ একাডেমিতে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে ‘এই অযাচিত পুরস্কার’ গ্রহণ করার সম্মতি প্রত্যাহার করে নেন।

১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সোভিয়েত ইউনিয়নে গর্বাচেভ প্রবর্তিত রাজনৈতিক ও সামাজিক উদারীকরণ নীতি সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে লেখকদের স্বাধীনতা, সেন্সরশিপ, আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ নিয়ে সোভিয়েত লেখকদের অষ্টম কংগ্রেসে বিতর্ক দেখা দেয়। এই সম্মেলনে লেখক সংঘের সংস্কারপন্থি প্রধান ঘোষণা করেন, রাষ্ট্রীয় প্রকাশনা সংস্থা ডক্টর জিভাগো প্রকাশের কথা ভাবছে। এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৮ সালে উপন্যাসটি সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রকাশিত হয়। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার প্রকাশকরা ১১ খ-ে পাস্তেরনাকের রচনাবলি প্রকাশের ঘোষণা দেন। এর অনেক আগে ১৯১২ থেকে ১৯৫৯ সালের মধ্যে পাস্তেরনাকের লেখা কবিতাসংগ্রহের দুটি খ- বেরিয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের একটা প্রচলিত রীতি হচ্ছে, রাশিয়ার শ্রেষ্ঠ লেখকদের রচনা স্কুল-কলেজে পাঠ্য করা হয়। কিন্তু ডক্টর জিভাগো পাঠ্য করা হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছিল। রুশ শিক্ষা মন্ত্রণালয় কয়েক বছর আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কমিউনিস্ট মতাদর্শের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ভিন্নমতাবলম্বী লেখকদের বইও পাঠ্যবই হিসেবে থাকবে।