অভিনয়েই বাঁচতে চান দিলারা জামান

‘বয়স নিয়ে কখনো চিন্তা করি না, মনের জোর থাকলে সবই সম্ভব’ এই জীবনদর্শনকে সঙ্গী করে আজ ৮৩ বছরে পা রাখলেন বরেণ্য অভিনেত্রী দিলারা জামান। ১৯৪৩ সালের ১৯ জুন পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে জন্ম নেওয়া এই গুণী শিল্পী আজও এ দেশের অভিনয় অঙ্গনের এক বড় অনুপ্রেরণা। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বৈচিত্র্যময় ও কালজয়ী সব চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নাট্য ও চলচ্চিত্র জগতের এক মায়াবী অভিভাবক হিসেবে।

ইঞ্জিনিয়ার পিতা রফিকউদ্দিন আহমদ ও মাতা সিতারা বেগমের এই সন্তান শৈশবের আসানসোল পেরিয়ে একসময় চলে আসেন যশোরে। সেখানকার মোমিন গার্লস স্কুলে পড়ার সময় আম কুড়ানো, পেয়ারা চুরির দুরন্ত শৈশব কাটানো দিলারা ১৯৫৪ সালে পা রাখেন ঢাকায়। বাংলাবাজার স্কুলে পড়ার সময়ই রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ গল্প অবলম্বনে ফটিকের মা সেজে নাট্যচর্চার শুরু। ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমির এক সাহিত্য আসরের সুবাদে পরিচয় ও পরে ভালোবেসে ঘর বাঁধেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ফখরুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে। ২০১৪ সালে ৫১ বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি টেনে ফখরুজ্জামান চলে গেলেও দুই মেয়ে তানিয়া ও যুবায়রা এবং উত্তরার বাসায় সঙ্গে থাকা পালকপুত্র আশফাককে নিয়ে কাটছে তার জীবন।

শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও ১৯৬৬ সালে ‘ত্রিধারা’ নাটকের মাধ্যমে ক্যামেরার সামনে তার অভিষেক ঘটে। এরপর বিটিভির কালজয়ী সব নাটকে তার অভিনয় দর্শক হৃদয়ে চিরস্থায়ী দাগ কাটে। বিশেষ করে ৪০ বছর আগে ১৯৮৫ সালে হুমায়ূন আহমেদের লেখা ‘এইসব দিনরাত্রি’ ধারাবাহিকে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে নিজের চেয়ে বড় বুলবুল আহমেদ আর আসাদুজ্জামান নূরের রাগী মায়ের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি অসম্ভব জনপ্রিয়তা পান। অভিনয়ের সার্থকতা নিয়ে স্বয়ং হুমায়ূন আহমেদও তার প্রশংসা করেছিলেন।

চলচ্চিত্রের রুপালি পর্দায় তার যাত্রা শুরু ১৯৯৩ সালে ‘চাকা’ দিয়ে। এরপর ‘আগুনের পরশমণি’, ‘মনপুরা’, ‘হালদা’, ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’,  ‘মুজিব : একটি জাতির রূপকার’ প্রমুখ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। ২০০৮ সালে ‘চন্দ্রগ্রহণ’ ছবিতে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। শিল্পকলায় অনন্য অবদান ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৩ সালেই তাকে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করা হয়।

বর্তমানে কিছুটা অবসর জীবন পার করলেও শারীরিক সক্ষমতা থাকা পর্যন্ত ক্যামেরার সামনেই থাকতে চান এই অবিনশ্বর শিল্পী। আজকের নাটকে পারিবারিক বন্ধনের অভাববোধ করলেও এ দেশের তরুণদের প্রতি তিনি ভীষণ আশাবাদী। তরুণদের হাত ধরে দেশে সুন্দর দিন আসবে, এই স্বপ্ন বুকে নিয়ে আরও বহু বছর আমাদের মধ্যে শিল্পের সাধনা করে যেতে চান এই গুণী মানুষটি, জন্মদিনে তাকে নিরন্তর শুভেচ্ছা।