‘দেখুন তো হেঁটে চলে এলাম, মনে হচ্ছে না যে আমি বাংলাদেশি না। ...সবসময় আমি বলি একই আকাশ একই বাতাস...।’ ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বাংলাদেশে পা দেওয়ার পর স্বাগত বক্তব্য ছিল এটি। গত ১২ জুন শুক্রবার যশোরের বেনাপোল ইমিগ্রেশন দিয়ে বাংলাদেশে আসেন, ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও ব্যারাকপুরের প্রাক্তন এই এমপি। সঙ্গে স্ত্রী মৃণাল ত্রিবেদী। বর্ষীয়ান রাজনীতিক দীনেশ ত্রিবেদী আরও বলেছেন ‘আমি একটাই কথা বলতে পারি; আমাদের যা পপুলেশন আছে ১৪০ কোটি, আর আমি কুড়ি কোটি অ্যাড করি, তাহলে ১৬০; ...তাহলে যা হবে, একসঙ্গে হবে। আলাদাভাবে আমি ভাবছি, আমার মনে ওইটা ঢুকছেই না।’ ভারতের নতুন এই হাইপ্রোফাইল হাইকমিশনারের স্বাগত বক্তব্য নিয়ে রাজনীতির অন্দর-বাইরে আলোচনা আছে। তবে সবচেয়ে আশার কথা, ঠিক ৪৫ বছর আগে এ-রকম বৃহৎ আকাক্সক্ষা থেকেই মে মাসে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য তৎকালীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২ মে সাতটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠান দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) শীর্ষ সংগঠন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে। ওই চিঠিতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই সেনাপতি উল্লেখ করেছিলেন, ‘‘দ্বিপাক্ষিক রাজনৈতিক বিরোধ দূরে রেখে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সম্মিলিত স্বার্থে ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন’ বা ‘আসিয়ান’-এর আদলে একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।’’
জিয়াউর রহমানের সেই দূরদর্শী ধারণার ভিত্তিতেই পরবর্তী সময়ে ‘সার্ক’ গঠিত হয়। তার চিঠির মূল প্রতিপাদ্য ও দর্শন ছিল আঞ্চলিক সহযোগিতা। তিনি বিশ্বাস করতেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য একত্রে কাজ করলে তা ফলপ্রসূ হবে। চিঠিতে জিয়াউর রহমান প্রস্তাব দেন, রাজনৈতিক বা দ্বিপাক্ষিক সমস্যাগুলো এড়িয়ে গিয়ে কৃষি, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও বাণিজ্যের মতো অরাজনৈতিক বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করা উচিত। এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং আত্মনির্ভরশীলতা জোরদার করাই ছিল তার চিঠির মূল লক্ষ্য।
জিয়াউর রহমান তার ক্ষমতাকালে যে কয়টি দেশে সফর করেছেন তার পেছনেও তৎকালীন অশান্ত বিশ্ব, আঞ্চলিক অস্থিরতা হ্রাস, বাংলাদেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করার উদ্যোগ ছিল লক্ষণীয়। সে জন্য তিনি বিশ্বনেতৃত্বের সম্মানও অর্জন করেছেন দারুণভাবে।
১৯৮০ সালের ২৫-২৭ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যক্তিগত সফরে গিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। তাকে হোয়াইট হাউজে স্বাগত জানান তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিমি কার্টার। জিয়াউর রহমানকে ‘মহান নেতা’ হিসেবে উল্লেখ করে হোয়াইট হাউজের দক্ষিণ লনে দাঁড়িয়ে জিমি কার্টারের ভাষ্য ছিল, ‘আমরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার গণতান্ত্রিকীকরণের সুবিধাও আলোচনা করেছি। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নির্বাচনের ফলে উন্মুক্ত এবং স্বাধীন নির্বাচনী প্রক্রিয়া বিশ্বকে অনুপ্রাণিত করেছে। আমরা মুসলিম জাতিগুলোসহ সার্বিক বিশ্বসম্প্রদায় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের জন্য অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।’ যার ফলে ভারতের নতুন হাইকমিশনারের বক্তব্য একটি অনস্বীকার্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা। বাংলাদেশে এসেও তার কণ্ঠে এই প্রত্যাশাও ছিল, “‘ডেমোক্রেসিতে অনেক ইসু্যু’ থাকে। আপনার একটা বাংলাদেশের স্ট্রং ডেমোক্রেসি, আমাদেরও স্ট্রং ডেমোক্রেসি; দুই ডেমোক্রেসি মিলে গেলে একটা ওয়ার্ল্ড পাওয়ার হয়ে যায়, একটা পুরো ইকোনমিক ওয়ার্ল্ড পাওয়ার হয়ে যায়।” রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং যদি সত্যিকার অর্থেই আন্তরিক বার্তা দিয়ে থাকেন দীনেশ ত্রিবেদী, তাহলে তার এই কূটনৈতিক ভাষার উদার দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মান করব। পাশাপাশি উল্লেখ্য, দীনেশ ত্রিবেদীর হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগের খবরের পর আমার সঙ্গে তার ফোনালাপ হয়। গত ২০ এপ্রিল সেই আলাপে ‘বাংলাদেশের মানুষের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা’ জানান দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ‘দুই দেশের মানুষের মধ্যে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আগামীতে আরও সুদৃঢ় হবে।’
সাধারণত দুদেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে যৌথ শক্তি বা নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়। তবে ভারত সরকারের যেকোনো কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের মানুষ খুব সহজে গ্রহণ করতে চায় না। কারণ, দেশটি বিগত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারকে একতরফাভাবে সহযোগিতা করেছিল, যা এখনো মানুষের চোখের সামনে স্পষ্ট এবং ঘটনাগুলোর দাগ ও ক্ষত বাংলাদেশ বয়ে বেড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এখন ভারতের আশ্রয়ে রয়েছেন। যে কারণে দীনেশ ত্রিবেদীর ‘আঞ্চলিক উন্নয়নের কথা’ যদি সত্যিকার অর্থে ভারতের আন্তরিক ইচ্ছা হয়ে থাকে, তাহলে অকার্যকর হয়ে পড়া দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক কার্যকর করে তুলতে ভারতের এগিয়ে আসাই প্রধান দায়িত্ব।
২০১৬ সালে ইসলামাবাদে ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন স্থগিত হওয়ার পর থেকে সংস্থাটির শীর্ষ পর্যায়ের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ঐকমত্যের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সার্ক শীর্ষ সংগঠনকে দুর্বল বা বাদ দিয়ে ভারত বিমসটেককে বিকল্প হিসেবে বেছে নিতে চায়। কিন্তু ভারতের এ ধরনের সক্রিয় ইচ্ছা এই অঞ্চলের জন্য কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সার্কের বিকল্প বিমসটেক হতে পারে না। কারণ, সার্ক দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের মৌলিক সংগঠন, আর বিমসটেক সার্কের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ মাত্র। আসলে মৌলিক আর বিকল্পের মধ্যে অনেক তফাৎ। এই বিষয়টা পর্যবেক্ষণে রেখে ‘সার্ক’ সদস্য দেশগুলো এবং ‘বিমসটেক’ সদস্য দেশগুলোর বৈশিষ্ট্য নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা ও আলোচনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। বিমসটেক থেকে ভালো কিছু ফলাফল না হওয়ার উদাহরণও আছে। ২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই বৈঠক থেকে ন্যূনতম কার্যকর কোনো ফলাফল আসেনি। আমি মনে করি, এই সময়ে এসে দুই দেশকে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ এবং সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের সময়। প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির কারণে এটি ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ বা ‘বিশ্বগ্রাম’ হিসেবেও পরিচিত। দেশে দেশে ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, বর্তমান সময়টি কলিযুগ এবং সামগ্রিক ঐতিহাসিক কালানুক্রমিক হিসেবে এটিকে আধুনিক যুগও বলা যায়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মহাকাশ গবেষণা এবং ইন্টারনেট দুনিয়ায় প্রতিনিয়ত নতুন নতুন উদ্ভাবন হচ্ছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যুগে স্মার্টফোন এবং গ্লোবাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পুরো পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয় থাকায় এই প্রজন্ম দ্রুততার সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানসহ শক্তিশালী জনমত গঠনে একধাপ এগিয়ে আছে।
গত কয়েক বছরে আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপালে সরকার পরিচালনা ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন এসেছে, তার পূর্ণ পাঠের মধ্য দিয়ে আগামীর সম্ভাবনাকে খুঁজে বের করতে হবে সার্ক কার্যকর হবে? না বিমসটেক? না সার্ক ও বিমসটেক সমন্বয়ে, নতুন ধারার প্ল্যাটফর্ম? বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি আনম মুনীরুজ্জামানের ভাষায়, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরউত্তম বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত ভিত্তি নির্মাণ এবং স্বতন্ত্র গতিপথ নির্ধারণের তিনিই প্রধান স্থপতি।’ গত ১৪ জুন দৈনিক প্রথম আলোয় ‘জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি কেন আলাদা’ শীর্ষক মতামতে তিনি লিখেন, ‘আন্তর্জাতিক পরিম-লে যখন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ কিংবা ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখা হচ্ছিল, তখন দেশের পররাষ্ট্রনীতিও ছিল একটি সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ।’ সেই পরিপ্রেক্ষিতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক বাস্তববাদী ও বহুমাত্রিক কূটনৈতিক পুনর্গঠনের সূচনা করেন, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে সার্ক। আজকের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও তার বাস্তববাদী ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি সমানভাবে প্রাসঙ্গিকতা বহন করে। এই ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি আমাদের জন্য শাশ্বত পথপ্রদর্শক।
দেশে জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দলীয় সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায়। যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন তার রক্তের ও নীতির উত্তরাধিকারী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি তার পিতার রেখে যাওয়া ‘বন্ধুত্বপূর্ণ নীতি’কে অবলম্বন করে আগামীর বাংলাদেশকে উন্নতির উচ্চ শিখরে নিয়ে যাবেন। স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে সব আন্দোলন-সংগ্রামের সাফল্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, তার আকাক্সক্ষাকে ধারণ করতে হবে, ১৯৭১-এর চেতনার ভিত্তিতে এবং ভারতের আধিপত্যবাদী চিন্তার বিপরীতে। তবেই বাংলাদেশে নবনিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনারের আকাক্সক্ষার মর্যাদা পাবে এবং দুদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় ঐকমত্যের সঙ্গে আগামীর কল্যাণে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিককর্মী
bnppressmedia@gmail.com