একটি দেশের জাতীয় অর্থনীতিকে তুলনা করা যায়, বিশাল কোনো ভবনের সঙ্গে। বাইরে থেকে ভবন যতই আকর্ষণীয় দেখাক, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার ভিত। ভিত শক্ত হলে ভবন দুর্যোগ সামলাতে পারে, আর দুর্বল হলে সামান্য আঘাতে বিপর্যয় ঘটে। বাংলাদেশের অর্থনীতির বাস্তবতাও তেমন। বাজেটে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন, বিনিয়োগনির্ভর উন্নয়ন ও শিল্পায়নের উচ্চাশা থাকলেও অর্থনীতির ভিত্তি, ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও সুশাসনের সংকটে ভঙ্গুর হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত ব্যাংকনির্ভর। পুঁজিবাজারের গভীরতা কম, বন্ড মার্কেট এখনো অপরিণত আর দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস সীমিত। ফলে শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি, এসএমই, আমদানি-রপ্তানি এমনকি সরকারের বাজেট ঘাটতিও ব্যাংকব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। দেশের ব্যাংক খাতের সম্পদ জিডিপির প্রায় ৫০ শতাংশ এবং সরকারের বাজেট ঘাটতির বড় অংশও ব্যাংক থেকে অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়। তাই ব্যাংক খাত দুর্বল হলে, তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে। বর্তমানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। মূলধন পর্যাপ্ততার হার ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ইতিহাসের অন্যতম নিম্ন স্তর। জিডিপির তুলনায় বেসরকারি ঋণের অনুপাতও এক যুগের মধ্যে সর্বনিম্ন। ব্যাংক ব্যবস্থার প্রাণ হলো আস্থা। আমানতকারীরা তাদের সঞ্চয় ব্যাংকে রাখেন প্রতিষ্ঠানের সততা, দক্ষতা ও স্থিতিশীলতার ওপর বিশ্বাস রেখে। সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরলে, ব্যাংকে সংকট তৈরি হয়। বিশে^র অভিজ্ঞতা তাই বলে। জাপানের হারানো দশক, এশীয় আর্থিক সংকট এবং ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক বিপর্যয় দেখিয়েছে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাংক সংকট শুরু হলে উৎপাদন কমে যায় এবং তার খরচ শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বহন করতে হয়।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি হঠাৎ তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের দায়মুক্তি, দুর্বল তদারকি, অযোগ্য পরিচালনা পর্ষদ, ঋণ পুনঃতফসিলের অপব্যবহার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপ ব্যাংক খাতকে দুর্বল করেছে। সংকটের বড় উৎস রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক। সরকারি ব্যাংকগুলো ব্যাংকিং খাতের প্রায় ২৭ শতাংশ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করলেও, তাদের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৪৬ শতাংশ। সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। প্রায় ৩ কোটি গ্রাহক, বিপুল আমানত, ঋণ, আমদানি-রপ্তানি ও রেমিট্যান্স কার্যক্রমের কারণে এটি দেশের আর্থিকব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ প্রায় ৯৪ হাজার ৩২২ কোটি টাকা এবং এককভাবে এটি ব্যাংক খাতের ৮ দশমিক ৭ শতাংশ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে এই ব্যাংকটির অস্থিরতা শুধু একটি ব্যাংকের সমস্যা হিসেবে নয় বরং একটি সিস্টেমিক ঝুঁকি হিসেবে উত্থাপিত হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে আমানত উত্তোলন, মালিকানা ও পরিচালনা নিয়ে বিভ্রান্তি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে তারল্য সহায়তা চাওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে। এর ফলে কয়েকটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। প্রথমত, আস্থাহীনতা। ব্যাংক খাতে আতঙ্ক, যুক্তির চেয়ে দ্রুত ছড়ায়। একটি ব্যাংকের প্রতি ভীতি অন্য ব্যাংকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে, বিশেষ করে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রে। দ্বিতীয়ত, আন্তঃব্যাংক বাজারে চাপ। ব্যাংকগুলো পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। কোনো ব্যাংককে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে অন্য ব্যাংক তার সঙ্গে লেনদেন কমিয়ে দেয়, ফলে তারল্য সংকট আরও বাড়ে। তৃতীয়ত, পেমেন্ট ও সেটেলমেন্ট ব্যবস্থায় ঝুঁকি। ইসলামি ব্যাংক জাতীয় পেমেন্ট অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চেক ক্লিয়ারিং, ইএফটিএন, আরটিজিএস ও অন্যান্য লেনদেনে চাপ সৃষ্টি হলে পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যেতে পারে। চতুর্থত, রেমিট্যান্সে প্রভাব। প্রবাসীরা যদি ব্যাংকের স্থিতিশীলতা নিয়ে সন্দিহান হন, তবে বৈধ চ্যানেলের পরিবর্তে অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠাতে পারেন। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিময় হার ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়বে। পঞ্চমত, বাণিজ্য অর্থায়নে সমস্যা। এলসি, গ্যারান্টি ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমদানি-রপ্তানি ও শিল্প উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি হবে। ষষ্ঠত, ঋণ সংকোচন। তারল্য সংকটে থাকা ব্যাংক নতুন ঋণ দেওয়া কমিয়ে দেয়। এতে ব্যবসা, এসএমই, কৃষি ও ভোক্তা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমে যায়। সপ্তমত, নৈতিক বিপদ বা মোরাল হ্যাজার্ড। অনিয়ম ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের দায়মুক্তি অব্যাহত থাকলে ব্যাংক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে এবং সৎ ঋণগ্রহীতারা নিরুৎসাহিত হন।
এই সংকটের মূল প্রশ্ন তারল্য নয় মূল সমস্যা সুশাসনের অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব, পক্ষপাতদুষ্ট ঋণ বিতরণ, দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির ঘাটতি। তাই সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। প্রথমত, ব্যাংককে রাজনীতি ও গোষ্ঠীগত প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও পেশাদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক দ্রুত শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। চতুর্থত, আমানত সুরক্ষা কাঠামো শক্তিশালী করে সাধারণ আমানতকারীর আস্থা বজায় রাখতে হবে। পঞ্চমত, অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, আইনজ্ঞ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে শক্তিশালী ব্যাংক সংস্কার কমিশন গঠন জরুরি। ষষ্ঠত, খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার এনে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশ এখন একদিকে উচ্চাকাক্সক্ষী অর্থনৈতিক লক্ষ্য, অন্যদিকে ভঙ্গুর আর্থিক ভিত্তির মুখোমুখি। এক ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন এবং ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বাস্তবতা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। ইসলামি ব্যাংকের সংকট সেই বৃহত্তর সমস্যাকে সামনে এনেছে। এটি বাংলাদেশের আর্থিক স্থাপত্যের সতর্ক ঘণ্টা। এখন যদি স্বচ্ছ, পেশাদার ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তবে সংকটকে সংস্কারের সুযোগে পরিণত করা সম্ভব।
লেখক : ব্যাংকার ও কথাসাহিত্যিক