সুইস ব্যাংকগুলোয় ২০২৫ সালে বাংলাদেশি-সংশ্লিষ্ট আমানত আগের বছরের তুলনায় ৪১ শতাংশ বেড়ে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ হয়েছে। যা মোট প্রায় ১২ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা। এটি গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রায় প্রতি বছর সংবাদপত্রে এমন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। নাগরিকরা আগ্রহী হন জানতে কে বা কারা ইউরোপের এই বিশেষ দেশের ব্যাংকে টাকা জমা রাখে? কে কত টাকা রাখলেন? অধিকাংশ ক্ষেত্রে নাগরিকদের এমন জিজ্ঞাসার জবাব মেলে না।
সুইস ব্যাংকগুলোয় বিভিন্ন ধরনের অ্যাকাউন্ট রয়েছে যার মধ্যে ব্যবসার জন্য পরিচালিত অ্যাকাউন্ট, প্রবাসীদের আমানত এবং বৈধ-অবৈধ উপায়ে নেওয়া অর্থে পরিচালিত অ্যাকাউন্ট। অ্যাকাউন্টগুলো কী উদ্দেশ্যে কারা চালায়, সে বিষয়ে ঐতিহাসিকভাবেই সুইস ব্যাংকগুলো বেশ গোপনীয়তা বজায় রাখে। এ কারণে, বাংলাদেশ থেকে শুধু পাচার হওয়া অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে সুইস ব্যাংকগুলোয় আমানত বেড়েছে, এমন দাবি করা বেশ কঠিন। তবে জমা অর্থ গত বছর বাড়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিকও নয়। কারণ একই সময়ে ওই ব্যাংকগুলোতেই ভারত ও পাকিস্তানসহ অনেক দেশের আমানত কমেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত শে^তপত্র অনুসারে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশ থেকে মোট ২৩ হাজার ৪০০ কোটি (২৩৪ বিলিয়ন) ডলার পাচার হয়েছে। এই অর্থ প্রধানত সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, হংকং, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারত ও কয়েকটি ট্যাক্স- হেভেন ভূখ-ে গেছে। দেশে দেশে অর্থ পাচারে উদ্বেগ দেখা দেওয়ায় নাগরিকদের দাবির মুখে সুইস ব্যাংকগুলো স্বচ্ছতার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক তদন্তের আওতায় আসছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সেখানকার ব্যাংকগুলোর কাছে তথ্য চাইতে পারে। এ ক্ষেত্রে নজিরও আছে। যেমন ভারতের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের চুক্তি আছে; সে অনুযায়ী তারা যেকোনো সময় প্রয়োজনীয় তথ্য চায়। এমন সহযোগিতা কাজে লাগিয়ে এর আগে ভারত অর্থ পাচারের অভিযোগে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তিকে আইনের আওতায় এনেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন, বর্তমানে অবৈধ অর্থ রাখতে দুবাই ও সিঙ্গাপুর বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে ছদ্মবেশী কোম্পানি তৈরি করে শেষ সুবিধাভোগীর অ্যাকাউন্টে অর্থ নেওয়ার আগে তিন-চারবার হাতবদল করানো যায়। এ কারণে, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে পড়ে।
আমরা মনে করি, তথ্য পাওয়ার প্রক্রিয়া যতই জটিল হোক, পাচার হওয়া অর্থ রাখার সম্ভাব্য ঘাঁটিগুলোয় খোঁজখবর নেওয়ার প্রক্রিয়ায় গতি আনতে হবে। এতে অন্ততপক্ষে পাচারে জড়িত ব্যক্তিদের ওপর চাপ তৈরি হবে। সুইজারল্যান্ড যদি বৈধ ও অবৈধভাবে বিদেশে অর্থ জমা রাখার একটি গন্তব্য হয়, অন্য গন্তব্যগুলোর তথ্য তেমন না থাকলেও, সেসব গন্তব্যে অর্থ জমা হওয়া বাড়েনি, এটা ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই।
বাংলাদেশ সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত অর্থ পাচার ও বিদেশে অবৈধভাবে সম্পদ স্থানান্তর রোধ করতে আর্থিক গোয়েন্দা ও দুর্নীতি দমন কর্তৃপক্ষের প্রয়োগিক ক্ষমতা জোরদার করা, রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক সংযোগের কারণে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি বাড়ানো এবং আন্তঃসীমান্ত লেনদেন পর্যবেক্ষণ উন্নত করা। প্রকৃত মালিকানায় পরিচালিত ব্যবসার ক্ষেত্রে অধিকতর স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা, অঘোষিত সম্পদের তথ্য সংগ্রহ, বাণিজ্যিক চালানের ওপর নজরদারি বাড়ানো এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম প্রসারের মাধ্যমে সন্দেহজনক আর্থিক কার্যকলাপ শনাক্ত করা। সুইজারল্যান্ডসহ বিদেশি বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সহযোগিতা গভীর করা যেতে পারে।
দেশে সুশাসনের উন্নতি, নীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ আরও আকর্ষণীয় করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা গেলে অর্থ ও পুঁজি পাচারের আগ্রহ কমবে। ব্যক্তি পাচারকারীরাও তাদের সম্পদ দেশের অভ্যন্তরে রাখতে উৎসাহিত হবে। আমাদের প্রত্যাশা, এসব বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।