আমরা জানি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ে আদালতে হাজির করার জন্য বিচারিক আদালত কর্র্তৃক ইস্যুকৃত লিখিত, স্বাক্ষরিত ও সিলমোহরকৃত নির্দেশনাই হলো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। কিন্তু আমরা দেখছি, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যুর পরও অনেকেই থেকে যান অধরা। গত শনিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে তা একদিকে উদ্বেগজনক, অন্যদিকে প্রশ্নবোধকও বটে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে প্রায় ৮০ হাজার আসামির বিরুদ্ধে পরোয়ানা-হুলিয়া জারি করেছে আদালত। আসামিদের মধ্যে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নারী-শিশু নির্যাতন, দস্যুতা, ছিনতাইসহ বিভিন্ন মামলা রয়েছে। তা ছাড়া ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দায়ের হওয়া রাজনৈতিক মামলার আসামিও আছে এ তালিকায়। কিন্তু পরোয়ানাভুক্ত এসব আসামিকে গ্রেপ্তার না করার পেছনে আসামিদের স্থান পরিবর্তন, নাম-পরিচয় ভুল এবং থানা পুলিশ ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের উদাসীনতার অভিযোগ আছে। আবার অনেক আসামি তদবির ও অর্থের বিনিময়েও গ্রেপ্তার এড়াতে পারছেন।
পরোয়ানা কার্যকর করার মুখ্যত দায় পুলিশের। কিন্তু বহুল কথিত যে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়েও যারা গ্রেপ্তার এড়িয়ে চলতে সক্ষম হন এর পেছনে রয়েছে নানা রকম কদর্য সমীকরণ। পুলিশের অসাধু দায়িত্বশীলদের ‘ম্যানেজ’ করে, রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে অনেকেই অস্পর্শিত থাকেন। বিভিন্ন সময়ে চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা, দুর্নীতি বা রাজনৈতিক মামলায় আদালত কর্র্তৃক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কিংবা ওয়ারেন্ট জারির খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর কখনো কখনো দায়িত্বশীলদের তরফে যে ব্যাখ্যা মিলে তা হাস্যকর মনে হয়। আমরা এও জানি, আইন হলো সেই আলোর মতো, যা অন্ধকারে সত্যকে পথ দেখায় এবং যেখানে আইনের স্বাভাবিক গতি মন্থর হয়ে পরে কিংবা থেমে থাকে সেখানে অপরাধের বিস্তৃতি ঘটে। ইংরেজ দার্শনিক জন লক তার ‘টু ট্রিটিজেস অব গভর্নমেন্ট’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘যেখানে আইন শেষ হয়, সেখান থেকেই অত্যাচার বা স্বৈরতন্ত্র শুরু হয়’। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এমন অনভিপ্রেত নজির আমাদের সমাজে কম নেই।
আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু হওয়ার পর তা যথাযথভাবে সংশ্লিষ্ট থানা ও পুলিশের হাতে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, এরও নজির আছে অনেক। এর সুযোগ নেন আসামিরা এবং এমন প্রেক্ষাপটে তারা আত্মগোপনে চলে যান বা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ান। পাশাপাশি অভিযোগ আছে, পরোয়ানা নিয়ে জালিয়াতির ঘটনাও। এসবই আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পথে বড় অন্তরায়। আমাদের সমাজে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি নতুন নয়। একটি সভ্য ও মানবিক সমাজের মূল ভিত্তি হলো আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। আইন যখন কার্যকারিতা হারায় অথবা ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু হয়, তখন ন্যায়বিচার ও সমতার পরিবর্তে স্বেচ্ছাচারিতা ও বহুমাত্রিক অনাচার-দুরাচারের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হয়। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, ন্যায়বিচার হলো একটি সমতাভিত্তিক ও শান্তিময় সমাজের ভিত্তি। সমাজের প্রতিটি মানুষের অধিকার রক্ষা করে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সঠিক পদক্ষেপ নিশ্চিত করাই আইনি সংস্থাগুলোর দায়িত্ব-কর্তব্য। প্রতিটি সমাজের নিজস্ব বিচারব্যবস্থা রয়েছে, যার মাধ্যমে নাগরিকদের ন্যায়বিচার প্রদানের কাজ করা হয়। আমাদের সমাজ তা অনেক ক্ষেত্রে কীভাবে ব্যাহত হচ্ছে, এরই খণ্ডিত দৃষ্টান্ত দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি। প্রতিবেদনে এও বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশ সদর দপ্তর সবকটি ইউনিট প্রধানদের বিশেষ বার্তা দিয়েছে। যেসব আসামির বিরুদ্ধে পরোয়ানা বা হুলিয়া আছে, তাদের গ্রেপ্তার করতে না পারলে কারণসহ লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে। এর পাশাপাশি পুলিশের কোনো সদস্য বা কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের অবহেলার তথ্য পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও পুলিশ সদর দপ্তরের বার্তায় বলা হয়েছে। ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে যে তথ্য মিলেছে তা অনাকাক্সিক্ষত। দীর্ঘদিন ধরে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কার্যকারিতা, অপব্যবহার ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির যেসব অভিযোগ রয়েছে এর দায় দায়িত্বশীলদের এড়ানোর অবকাশ নেই। প্রযুক্তির বিকাশের এই যুগে পুলিশ ও আদালতের মধ্যে পরোয়ানা তামিল বা কার্যকর করার ক্ষেত্রে সমন্বিত ও স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল পদ্ধতির মধ্যে যে দুর্বলতা বিদ্যমান তা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। অনিয়ম-দীর্ঘসূত্রতা দূর করার পাশাপাশি দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি নিশ্চিত করে আইনের স্বাভাবিকভাবে চলার পথ কণ্টকমুক্ত করতেই হবে।