বাংলা ভাষা উদার। একই শব্দে সে আলো ধরে, আঁধারও। যেমন আনন্দ অশ্রু, জীবন্ত লাশ, নীরব চিৎকার, শীতল আগুন, খোলামেলা রহস্য। বাংলা ভাষায় এ ধরনের শব্দবন্ধকে ‘অক্সিমোরন’ বা ‘বিরোধাভাস’ বলা হয়। যেখানে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী শব্দ পাশাপাশি বসে একটি গভীর ও নতুন অর্থ তৈরি করে। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘বাংলা ভাষার এই এক মাধুর্য, আসছি বলে স্বচ্ছন্দে চলে যাওয়া যায়’। কিন্তু এই বিরোধাভাস মাত্রা ছাড়িয়ে মাঝেমধ্যে বিপদও তৈরি করে। কখনো কখনো শব্দের কাঁধে এমন বোঝা চাপানো হয়, যা তার স্বভাবের সঙ্গে যায় না। ‘চাঁদা’ তেমনই এক শব্দ, যার ভেতরে আছে অংশীদারত্বের আলো, স্বেচ্ছাসেবার উষ্ণতা, সমবায়ের সংস্কৃতি। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতার ছায়ায় জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের ঘটনাকে ‘চাঁদাবাজি’ বেলে বেশ শোরগোল পড়েছে দেশে।
বাংলাদেশের মূলধারার সব রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ জনপরিসরে পুরনো আলোচনার ইস্যু। এর মধ্যে ‘টেম্পো স্ট্যান্ড’ বলে নতুন করে আলোচনা এসেছে একটি দল। বিশেষ করে পরিবহন, বাজার, টেন্ডার, ফুটপাত ও স্থানীয় ব্যবসা খাতে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে, চাঁদা আদায়ের নানা অভিযোগ বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। এসব অভিযোগ শুধু বিরোধী দল বা সাধারণ মানুষের বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়; কখনো কখনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সুশীল সমাজ এবং সংবাদ অনুসন্ধানে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বারবার বলেছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ‘দলবাজি, দখলদারি ও চাঁদাবাজি’ দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও সুশাসনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতীয় গণমাধ্যমে আমরা হরহামেশা দেখি পরিবহন খাতে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে ধরা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে বাজার, ফুটপাত ও পরিবহন টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের ফ্রেমিংয়ে ‘চাঁদাবাজি’ বলতে আমরা এটিই বুঝি। এমনকি বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় সংকট হলো, দলীয় প্রভাবকে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। ফলে ক্ষমতাসীন দল যেই হোক না কেন, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও দখলদারির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে বলে সবাই জানে। কিন্তু আমরা ভেবে দেখেছি কী, ‘চাঁদা’ শব্দটি ঠিকভাবে প্রয়োগ করছি কি না? চাঁদা মানে কী? ইতিহাস বলছে, চাঁদা মানে অংশগ্রহণ। ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন, বন্যার ত্রাণ থেকে মসজিদ-মন্দির নির্মাণ, ক্লাবের বার্ষিক ক্রীড়া থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই সবখানে চাঁদা এসেছে হাত বাড়িয়ে, মাথা নত করে নয়। চাঁদা চাওয়া যায়, দেওয়া যায়; আবার না-ও দেওয়া যায়। ‘চাঁদা’ হলো ‘সম্মতির অর্থনীতি’। অন্যদিকে ‘তোলাবাজি’? ওটি সম্মতির বিপরীত শব্দ। সেখানে হাসিমুখ থাকে, কিন্তু হাসি স্বতঃস্ফূর্ত নয়। থাকে রসিদ, কিন্তু তার চেয়ে বড় থাকে ভয়। সেখানে অর্থ দেওয়া হয় না, অর্থ নেওয়া হয়। পথের দোকান থেকে বাজার ঘাট, নির্মাণ সাইট থেকে পরিবহন যেখানে ক্ষমতা ভাড়া খাটে, সেখানেই তোলাবাজির জন্ম।
এটি অনুদান নয়; বরং অনুদানের অনুকরণে আদায়। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, জোরপূর্বক আদায়কে ‘চাঁদাবাজি’ বলা কি নিছক ভাষাগত অলসতা, নাকি সচেতন শব্দ-রাজনীতি? ‘তোলাবাজি’ শব্দটি কানে কঠিন; ‘চাঁদাবাজি’ তুলনায় নরম। একটিতে আছে ছিনিয়ে নেওয়ার সুর, অন্যটিতে ঐতিহ্যের আবরণ। ফলে শব্দ বদলালে অর্থের দায়ও খানিক বদলে যায়। কঠোর বাস্তব নরম অভিধানে ঢুকে পড়ে। ভাষা এখানে নিরপেক্ষ দর্শক নয়; ভাষা ক্ষমতার সহযোগীও হতে পারে। ইতিহাসের ব্যঞ্জনাময় শব্দকে যদি জোরপূর্বক আদায়ের প্রতিশব্দ বানানো হয়, তবে তা শুধু রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক বিকৃতিও। চাঁদা যে সমবায়ের চিহ্ন, তাকে যদি দখলের প্রতীকে রূপান্তর করা হয়, তবে ভবিষ্যতে স্বেচ্ছা অনুদানও সন্দেহের চোখে দেখা হবে। এতে ক্ষতি কেবল শব্দের নয়, সমাজের আস্থারও।
তাই পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি। স্বেচ্ছায় দেওয়া অর্থ চাঁদা। জোরে আদায় করা অর্থ তোলা। একটি সম্মতি, অন্যটি শক্তি। একটিতে রয়েছে অংশগ্রহণ, অন্যটিতে আধিপত্য। শব্দের দায় আছে। ‘চাঁদাবাজি’ বলে যদি আমরা তোলাবাজিকে নরম করি, তবে ভাষা দিয়ে বাস্তব ঢাকার দায় আমাদের। ইতিহাসের আলোকে অন্ধকারের নাম দিলে অন্ধকার কমে না, শুধু আলো মøান হয়। একে আমরা তিন ভাগে দেখতে পারি। প্রথমত, শব্দের এই মিশ্রণ কেবল অভিধানের ভুল নয়, নৈতিকতারও বিভ্রান্তি। যখন জোরপূর্বক আদায়কে ‘চাঁদা’ বলা হয়, তখন অপরাধের চরিত্র আড়াল পায়। সমাজ ধীরে ধীরে মানিয়ে নেয়, যেন এও এক ধরনের স্বাভাবিক অর্থ সংগ্রহ। ভাষা যদি অন্যায়ের তীক্ষèতাকে ভোঁতা করে দেয়, তবে অন্যায়ও দৈনন্দিনে মিশে যায়। ফলে প্রতিবাদ ক্ষীণ হয়, প্রতিরোধ দুর্বল হয়। দ্বিতীয়ত, এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রকৃত চাঁদা সংস্কৃতি। যে সংগঠন স্বচ্ছতা ও আদর্শ নিয়ে সদস্যদের অনুদানে চলে, তাদেরও প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। ‘চাঁদা’ শব্দটি যদি ভয়ের প্রতিশব্দ হয়ে ওঠে, তবে স্বেচ্ছা অংশগ্রহণের ঐতিহ্য কলঙ্কিত হয়। সমাজে আস্থার যে সূক্ষ্ম সুতো আছে, সেটিই ছিঁড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। তৃতীয়ত, ভাষা শুদ্ধ করা মানে শুধু ব্যাকরণ ঠিক করা নয়, নৈতিক অবস্থানও স্প’ করা। জোর করে আদায় করলে তার নাম তোলাবাজি বলাই সৎ। কারণ শব্দের মধ্যেই দায়বদ্ধতার শুরু। যে সমাজ অন্যায়ের সঠিক নাম উচ্চারণ করতে পারে না, সে সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে পারে না। তাই চাঁদার চাঁদকে অন্ধকারে ঢেকে না রেখে, তোলার তলোয়ারকে প্রকৃত নামে ডাকাই ভাষা ও বিবেকের দায়িত্ব।
‘তোলাবাজি’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থের ভেতরেই তার চরিত্র লুকিয়ে আছে। ‘তোলা’ মানে উপরে তুলে নেওয়া। কিন্তু এখানে তা স্বেচ্ছা উত্তোলন নয়, ক্ষমতার ভর দিয়ে কেড়ে নেওয়া। ‘বাজি’ প্রত্যয়টি যোগ হয়ে একে পেশা বা প্রবণতার রূপ দেয়। অর্থাৎ নিয়মিত, কাঠামোবদ্ধ ও প্রাতিষ্ঠানিক এক আদায়-প্রক্রিয়া। ফলে তোলাবাজি কেবল বিচ্ছিন্ন অর্থদাবি নয়; এটি শক্তির প্রদর্শন, ভয়ের বিনিয়োগ এবং আধিপত্যের অনুশীলন। এতে লেনদেনের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণের বার্তা ‘আমি নিতে পারি, তাই নিচ্ছি।’ গুঢ়ার্থে তোলাবাজি অর্থনৈতিক ঘটনার চেয়ে বেশি একটি মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক সংকেত। এটি জানিয়ে দেয় যে, আইন বা ন্যায়ের চেয়ে শক্তির উপস্থিতিই এখানে চূড়ান্ত। তোলাবাজি তাই অর্থের পরিমাণে নয়, পরিবেশের ভয়ে মাপা যায়। যেখানে তোলাবাজি আছে, সেখানে বাজারের স্বাধীনতা সংকুচিত, নাগরিকের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ, এবং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা প্রশ্নবিদ্ধ। অর্থ কেবল হাতবদল হয় না, বদলে যায় ক্ষমতার ভারসাম্যও। বাংলা ভাষার রাজনৈতিক অভিধানে ‘মধুরতম প্রতারণা’ বহুদিন ধরে স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে ‘চাঁদাবাজি’ শব্দের ব্যবহারে। মিডিয়া, রাজনীতি, এমনকি সাধারণ মানুষও শব্দটি এমনভাবে ব্যবহার করেন যেন এটি নিছক কোনো প্রশাসনিক অপরাধ, সামান্য অনিয়ম বা রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ। অথচ ভাষাগতভাবে ‘চাঁদা’ শব্দটির ভেতরে আছে স্বেচ্ছা অংশগ্রহণ, সামাজিক সহমর্মিতা, সমন্বিত প্রয়োজনে অর্থসংগ্রহের ধারণা। স্কুলের পুনর্মিলনীতে চাঁদা হয়, মসজিদ-মন্দিরে চাঁদা হয়, বন্যার্তদের সহায়তায় চাঁদা হয়। চাঁদা মানে সম্মতিসূচক অবদান। কিন্তু যখন একজন সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক ক্যাডার বা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর লোক কাউকে ভয় দেখিয়ে টাকা নেয়, সেটা ‘চাঁদা’ নয় সেটা স্প’ভাবে তোলা। জবরদস্তিমূলক অর্থ আদায় ‘তোলাবাজি’। আমরা কেন ‘তোলাবাজি’ না বলে ‘চাঁদাবাজি’ বলছি? ভাষা শুধু তথ্য বহন করে না; ভাষা ক্ষমতার সেবা করে। শব্দ নির্বাচন হচ্ছে রাজনৈতিক কাজ। মিডিয়ার এই ফ্রেমিং কোনো নিরীহ ভুল নয়; এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক অপারেশন। যখন আপনি ‘তোলাবাজ’ না বলে ‘চাঁদাবাজ’ বলেন, তখন আপনি অপরাধটিকে সাংস্কৃতিকভাবে নরম করে দেন। শব্দের মধ্য থেকেই সহিংসতা মুছে ফেলেন। অপরাধীর চরিত্র বদলে দেন। সে আর ছিনতাইকারী থাকে না; হয়ে যায় যেন একটু বাড়াবাড়ি করা কোনো ‘সংগঠক’।
এটাই ভাষাগত কারসাজি। এই ভাষা অপরাধকে বৈধতা দেয়। আরও ভয়ংকর হলো, দীর্ঘদিন ধরে এই শব্দ শুনতে শুনতে মানুষের মনে, একটি বিকৃত স্বাভাবিকতা তৈরি হয়েছে। এখন ‘চাঁদাবাজি’ শুনলে মানুষ আতঙ্কিত হয় না। কারণ শব্দটি তার ধার হারিয়েছে। এটি মিডিয়ার নির্মিত এক ধরনের সামাজিক অবশতা, ভাষাগত অ্যানেসথেসিয়া। এখানে শুধু শব্দ নয়, শ্রেণিচরিত্রও কাজ করে। বাংলাদেশের সমাজ, গণমাধ্যম ও সংস্কৃতি ‘চাঁদাবাজি’ শব্দের মাধ্যমে ঠিক সেটাই করছে। তারা জবরদস্তিকে সামাজিক রুটিনে পরিণত করেছে। ‘চাঁদাবাজি’ নাকি ‘তোলাবাজি’ কোনটি বলা দরকার? সময় এসেছে, শব্দের প্রয়োগ নিয়ে ভাবার। কারণ ভাষা বদলালে, চিন্তা বদলায়।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক