রূপান্তরের পথ কেন অমসৃণ

ইতিহাসের অনেক অধ্যায় আছে, যা আমাদের বারবার অতীত মনে করিয়ে দেয়। অতীতের অনেক কিছু যেমন সুখকর, তেমনি আবার অনেক কিছু অপ্রীতিকরও। তবে এ সত্য অনস্বীকার্য যে, ইতিহাসের অনেক অধ্যায়ই আমাদের দিকে। আমাদের গর্ব করার মতো অধ্যায়গুলোর মধ্যে ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধ অন্যতম। কিন্তু আমাদের স্বপ্ন ভঙ্গের পেছনে রয়েছে অনেক কারণ। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের বাঙালিরা যেভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৪৭ সালে বাংলাভাগে তেমনটি ঘটেনি। কেননা তখন বাঙালি আর বাঙালি ছিল না। হিন্দু-মুসলমানে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। ধর্মীয় জাতীয়তার কাছে পরাজিত হয়েছিল ভাষাগত জাতীয়তা। সাম্প্রদায়িকতার ছোবলে হারিয়ে গিয়েছিল বাঙালির প্রতিজ্ঞার মণিবন্ধের রাখিবন্ধন। ভ্রাতৃপ্রতিম দুই সম্প্রদায়ে প্রবল সাম্প্রদায়িকতায় বাঙালি হিন্দু-মুসলিম পরস্পরের চরম শত্রুতুল্য হয়ে উঠেছিল। পরস্পর হিন্দু-মুসলমানে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। ধর্মীয় উন্মাদনায় চরম সাম্প্রদায়িকতায় বাঙালি জাতীয়তার ঐক্যের পতন ঘটে। সাম্প্রদায়িকতার কাছে পরাজিত হয় মানবতা, মনুষ্যত্বের।

বাংলাভাগের পেছনে রাজনৈতিক ভূমিকাকেও খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। বাংলার রাজনীতিকদের ভুলেই বাংলাভাগ চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করেছিল।

কৃষক প্রজা পার্টির একেএম ফজলুল হক যদি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার লোভ সংবরণ করতে পারতেন তাহলে মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বাংলায় বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি সম্ভব হতো না। ১৯৩৭ সালের নির্বাচন বাংলা ভাগে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল। সেই নির্বাচনে একক কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ না করার ফলে যৌথ সরকার গঠনের বিকল্প ছিল না। কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ পরস্পরের শত্রুতুল্য। ওই দুই দলের যৌথ সরকার গঠন ছিল অসম্ভব। কৃষক প্রজা পার্টি কংগ্রেস দলকে যৌথ সরকার গঠনের প্রস্তাব দিলে প্রাদেশিক কংগ্রেস প্রস্তাবে সম্মত হলেও, কারও কারও প্রবল আপত্তি ও বিরোধিতায় সেটি সম্ভব হয়নি। অগত্যা ফজলুল হক যৌথ সরকার গঠনে মুসলিম লীগকে প্রস্তাব দেওয়া মাত্র মুসলিম লীগ সেটি লুফে নেয়। বাংলায় গঠিত হয় কৃষক প্রজা পার্টি এবং মুসলিম লীগের যৌথ সরকার। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হন ফজলুল হক।

বাংলার প্রাদেশিক সরকারে যুক্ত মুসলিম লীগ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাতাবরণে পাকিস্তান আন্দোলনের পালে হাওয়া পেয়ে যায়। ফজলুল হকের মুসলিম লীগে যোগদান এবং অসাম্প্রদায়িক কৃষক প্রজা পার্টির বিলুপ্তির পর বাংলা প্রদেশ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চারণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। যা পাকিস্তান দাবির পথকে সুগম করে দেয়। জিন্নাহ কর্তৃক মুসলিম লীগ থেকে প্রত্যাখ্যাত ফজলুল হক তার অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিয়ে বাংলা ভাগ ঠেকাতে ভূমিকাই রাখতে পারেননি। ধর্মীয় বিভাজন তখন তুঙ্গে। হিন্দু-মুসলিম পৃথক দুই সম্প্রদায় তখন পরস্পরের মুখোমুখি। একে অপরের চরম শত্রুরূপে রণসাজে প্রস্তুত। সেই ভয়ানক সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আর কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না। চূড়ান্তে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, উচ্ছেদ, বিচ্ছেদ, উৎপাটনের নজিরবিহীন ১৯৪৭-এর বাংলা ভাগ, বাংলার ইতিহাসে ট্র্যাজেডিরূপে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। রাজনীতিকদের ক্ষমতার লিপ্সার বলি হতে হয়েছে নিরপরাধ দুই সম্প্রদায়ের অসহায় মানুষদের। রাজনীতির পাশা খেলায় অবিভক্ত বাংলা আর অখ-িত থাকেনি। খ-িতরূপে পূর্ব ও পশ্চিম বিভাজনে দুই পৃথক রাষ্ট্রের অধীন হয়ে যায়। বাংলাভাগ অনিবার্য হয়ে পড়েছিল, সেটা ঠেকানোর উপায়-অবলম্বনের শক্তি-সাহস, উপায় আর ছিল না।

সাতচল্লিশের স্বাধীনতা-পরবর্তী পূর্ববঙ্গের মানুষের মোহভঙ্গে বিলম্ব হয়নি। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান স্রষ্টা-গর্ভনর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা সফরে এসে পৃথক দুটি সমাবেশে ‘উর্দু, একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণার পরমুহূর্তে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ এবং আন্দোলনে মাতৃভাষার দাবির ভেতর দিয়েই উন্মেষ ঘটে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার। ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তিলে তিলে গড়ে ওঠে স্বাধিকার আন্দোলন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ এই সুদীর্ঘ সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের ভিত্তিমূলে ছিল জনগণের স্বপ্ন-আকাক্সক্ষা। সেই আকাক্সক্ষার মূলে ছিল মুক্তির স্বপ্ন-সাধ। জনগণের মুক্তির স্বপ্ন-আকাক্সক্ষার প্রবল গণআন্দোলন সীমাহীন দমন-পীড়নেও জনগণকে ঠেকানো সম্ভব হয়নি। চৌকষ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জন সম্ভব হয়েছিল, সেই স্বপ্ন-আকাক্সক্ষার কারণেই। স্বাধীনতা অর্জনের পর জনগণ তো মুক্তি পায়ইনি। উল্টো নতুন করে স্বদেশি শাসক শ্রেণির শৃঙ্খলে আটকে পড়েছে। অধিক ত্যাগ-আত্মত্যাগে অর্জিত স্বাধীনতা জনগণের ভাগ্যবদলে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। জনগণের স্বপ্ন-আকাক্সক্ষার অপমৃত্যুতে জনগণের সংগঠিত শক্তিও নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে। যার শতভাগ ফায়দা হাতিয়ে চলেছে আমাদের তথাকথিত শাসকশ্রেণি।

পূর্ব বাংলার বাঙালিরা পাকিস্তানি শাসন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পেরেছে। নানা পর্বের লড়াই সংগ্রামে এবং চূড়ান্তে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ে। স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের সামগ্রিক ভাগ্যবদল সম্ভব হয়নি। বিদেশি শাসনের বৃত্ত অতিক্রম করলেও; স্বদেশি শাসক শ্রেণির খপ্পর মুক্ত হতে পারিনি। আমরা তো দান-অনুদানের স্বাধীনতা পাইনি। আমাদের স্বাধীনতা বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জন। তবুও আমাদের স্বাধীনতা সবাইকে স্বাধীন করতে পারেনি। করেছে কতিপয়দের, যাদের হাতে সব ক্ষমতা এবং সম্পদ। পাকিস্তানের বাইশ পরিবারের দাসত্ব মুক্ত হলেও, স্বদেশি এবং বহুমাত্রিক পুঁজির দাসত্বের কবলে রয়েছি। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ সাম্রাজ্যবাদে অনুগত পুঁজিবাদী শোষণ যন্ত্রের তাঁবেদার আমাদের স্বাধীন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার। তাহলে আমরা অধীনতা মুক্ত কোথায়? স্বাধীনতার ৫২ বছর অতিক্রমে আলোর দিশা তো আমরা দেখছি না। কিন্তু আমরা আশাবাদী হতে চাই। আমাদের বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার বিপরীতে জনগণের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই। ক্ষমতার বদল হলেও প্রত্যাশানুযায়ী সমাজের রূপান্তর ঘটেনি। সমাজের রূপান্তরের জন্য যে রাজনৈতিক প্রত্যয়ের দরকার সে ক্ষেত্রে ব্যর্থতা আছে এই সত্য অস্বীকারের পথ নেই। রাজনীতিকদের এই দায় এড়ানোর অবকাশও নেই। রাজনীতিতে স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। বিদ্যমান ব্যবস্থা অটুট রেখে আমাদের মুক্তি তাই সর্বাগ্রে জরুরি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। বিদ্যমান ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন মানুষের অধিকার-সুযোগের সাম্য নিশ্চিত করবে। নিশ্চিত করবে জনগণের আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন এবং জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রও।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

mibabla71@gmail.com