খরা-তাপপ্রবাহে ঝুঁকিতে ১৮০ কোটি শিশু: ইউনিসেফ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্বজুড়ে ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। আর এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠছে শিশুরা। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রায় সব শিশুই অন্তত একটি জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মুখোমুখি। খরা, তাপপ্রবাহ, বন্যা, ঝড় ও রোগব্যাধির মতো বিপদের কারণে কোটি কোটি শিশুর জীবন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা হুমকির মুখে পড়েছে।

১৮০ কোটির বেশি শিশু খরার ঝুঁকিতে

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ১৮০ কোটি শিশু খরার ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সঙ্গে ১২০ কোটির বেশি শিশু চরম তাপপ্রবাহের প্রভাবের মধ্যে বসবাস করছে। এছাড়া ৬৬ কোটি ২০ লাখ শিশু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়, ৩৩ কোটি ৭০ লাখ শিশু নদীবাহিত বন্যা এবং ৩ কোটি ৩০ লাখ শিশু উপকূলীয় বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।

ইউনিসেফের পরিসংখ্যান ব্যবস্থাপক ও প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক রোহিনী সম্পূর্ণম স্বামীনাথন বলেন, শিশুদের জন্য শুধু একটি জলবায়ুজনিত দুর্যোগ নয়, বরং একাধিক ঝুঁকির সম্মিলিত প্রভাব আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ম্যালেরিয়ার মতো রোগের বিস্তারও বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রায় ১০০ কোটি শিশু ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যার বেশিরভাগই আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বসবাস করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি তাদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে।

শিক্ষাজীবনে বড় ধাক্কা

২০২৪ সালে বিশ্বের ৮৫টি দেশে প্রায় ২৪ কোটি ২০ লাখ শিশুর শিক্ষাজীবন জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে ব্যাহত হয়েছে। স্কুল বন্ধ, অবকাঠামোগত ক্ষতি এবং বাস্তুচ্যুত হওয়ার কারণে লাখো শিশু নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

ইউনিসেফ বলছে, শিশুদের সুরক্ষায় সরকারগুলোকে দ্রুত জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং অভিযোজন সক্ষমতায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাস উত্তোলন কার্যক্রমের ঝুঁকিতেও শিশুরা

জলবায়ু সংকটের পাশাপাশি শিল্পায়ন ও জ্বালানি উৎপাদনের পরিবেশগত প্রভাবও শিশুদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের আর্লিংটনে একটি তেল ও গ্যাস কোম্পানি কয়েকটি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কাছাকাছি নতুন গ্যাস কূপ স্থাপনের অনুমতি পেয়েছে। পরিবেশকর্মীরা বলছেন, এসব স্থাপনা থেকে নির্গত দূষণ শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

স্থানীয় সংগঠন ‘লিভএবল আর্লিংটন’-এর নেতৃত্বে থাকা রঞ্জনা ভান্ডারি জানান, নতুন গ্যাস কূপগুলোর একটি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র থেকে মাত্র এক হাজার ফুট দূরে অবস্থিত।

তিনি ২০২২ সালের একটি গবেষণার উল্লেখ করে বলেন, ফ্র্যাকিং কার্যক্রমের কাছাকাছি জন্ম নেওয়া শিশুদের মধ্যে রক্তের ক্যানসার অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়ার ঝুঁকি দুই থেকে তিন গুণ বেশি হতে পারে।

ইউরোপে তাপপ্রবাহ, স্পেনে দাবানলের শঙ্কা

এদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ তীব্র তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হয়েছে। ফ্রান্সে ৫৩টি প্রশাসনিক অঞ্চলে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, আগামী সপ্তাহে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে।

স্পেনেও মৌসুমের প্রথম বড় তাপপ্রবাহ শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশটির উত্তরাঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

নতুন এল নিনোর আশঙ্কা

আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করছেন, আগামী সময়ে শক্তিশালী এল নিনো বৈশ্বিক আবহাওয়া ব্যবস্থাকে আবারও অস্থির করে তুলতে পারে। অতীতে এল নিনোর কারণে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, বন্যা এবং খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।

তবে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদনের ফলে বৈশ্বিক খাদ্য মজুত তুলনামূলক ভালো অবস্থায় রয়েছে, যা সম্ভাব্য সংকটের কিছুটা চাপ কমাতে পারে।

জলবায়ু সংকটের কেন্দ্রে শিশুরা

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী হওয়া সত্ত্বেও এর সবচেয়ে গুরুতর পরিণতি ভোগ করছে শিশুরা। নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে শিশুদের কেন্দ্র করে জলবায়ু নীতি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই।

কারণ আজকের শিশুরাই আগামী দিনের পৃথিবীর উত্তরাধিকারী। আর তাদের জন্য একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়াই এখন বৈশ্বিক নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্র: রয়টার্স, ইউনিসেফ