দুর্নীতির মামলায় বিচারের মুখে স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। দুর্নীতির অভিযোগে তার স্ত্রী বেগোনা গোমেজকে বিচারের মুখোমুখি করার নির্দেশ দিয়েছে মাদ্রিদের একটি আদালত। গতকাল শনিবার প্রকাশিত আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, গোমেজের বিরুদ্ধে বিচার পরিচালনার জন্য যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।

আদালতের এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন সানচেজ সরকারের একাধিক ঘনিষ্ঠ সহযোগীও বিভিন্ন দুর্নীতি তদন্তের আওতায় রয়েছেন।

মাদ্রিদের তদন্তকারী বিচারক হুয়ান কার্লোস পেইনাদো রায়ে বলেছেন, গোমেজের বিরুদ্ধে বিচার পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে। আদালত তাকে পাসপোর্ট জমা দিতে, স্পেন ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা মানতে এবং প্রতি মাসে দুবার আদালতে হাজিরা দিতে নির্দেশ দিয়েছে। এমনকি দেশের সীমান্ত চৌকি ও বেসামরিক এবং সামরিক বিমানবন্দরগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে তিনি দেশ ছাড়তে না পারেন।

অভিযোগের সূত্রপাত
বেগোনা গোমেজের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি প্রধানমন্ত্রী-পত্নী হিসেবে নিজের প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য সুবিধাজনক সরকারি চুক্তি আদায়ে ভূমিকা রেখেছেন। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মাদ্রিদের কমপ্লুতেন্সে বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সহ-পরিচালিত একটি একাডেমিক চেয়ার এবং ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থে সরকারি সম্পদ ও রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহারের বিষয়টি।

এই মামলার সূচনা হয় ২০২৪ সালের এপ্রিলে, যখন ‘মানোস লিম্পিয়াস’ (ক্লিন হ্যান্ডস) নামে একটি আইনি চাপ সৃষ্টিকারী সংগঠন অভিযোগ দায়ের করে। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে স্পেনের কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা যায়।

পরে গোমেজের বিরুদ্ধে তহবিল আত্মসাৎ, প্রভাব খাটানো, ব্যবসায়িক দুর্নীতি এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহারের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়। তবে তিনি শুরু থেকেই সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

সরকারের প্রতিক্রিয়া
সানচেজের সমাজতান্ত্রিক দল পিএসওই আদালতের সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে। দলটির বক্তব্য, গত দুই বছর ধরে বেগোনা গোমেজ বিচারিক ও রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত সেই প্রক্রিয়ারই আরেকটি ধাপ।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও বারবার অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি আগাম নির্বাচন ঘোষণার দাবি প্রত্যাখ্যান করে সরকারের মেয়াদ পূর্ণ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

একের পর এক কেলেঙ্কারিতে চাপে সরকার
শুধু বেগোনা গোমেজই নন, সানচেজের ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক সহযোগীও বর্তমানে তদন্তের মুখোমুখি। তাদের বিরুদ্ধে সরকারি অবকাঠামো প্রকল্প, জ্বালানি খাতের চুক্তি এবং কোভিড-১৯ মহামারির সময় মাস্ক ক্রয় সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

যদিও অভিযুক্ত সবাই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবুও এসব তদন্ত সরকারকে ক্রমেই অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলছে।

এদিকে স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হোসে লুইস রদ্রিগেজ জাপাতেরোকেও একটি পৃথক মামলায় তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এমন একটি লবিং নেটওয়ার্কের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সরকারি কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করে আর্থিক সুবিধা আদায় করত। জাপাতেরোও অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন।

রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন
২০১৮ সালে দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত রক্ষণশীল পপুলার পার্টিকে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতায় আসে পেদ্রো সানচেজের জোট সরকার। তখন তাদের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল স্পেনের রাজনীতিকে দুর্নীতিমুক্ত করা।

কিন্তু এখন একই ধরনের অভিযোগে সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর পরিবার ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা সানচেজের নৈতিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা উভয়কেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বেগোনা গোমেজের মামলার অগ্রগতি এবং সরকারের ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত স্পেনের রাজনৈতিক অঙ্গনে আগামী মাসগুলোতে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।

বর্তমানে বিচারের তারিখ নির্ধারণ না হলেও, এই মামলাকে ঘিরে স্পেনের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে।

সূত্র: ডয়চে ভেলে অনলাইন